বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির প্রায় ৪৫ শতাংশই প্রতিরোধ করা বা এর সূচনা বিলম্বিত করা সম্ভব। সংস্থাটির মতে, তামাক ব্যবহার, অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, বায়ুদূষণ এবং উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগসহ পরিবর্তনযোগ্য বিভিন্ন ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণে আনলে এ লক্ষ্য অর্জন করা যেতে পারে।
ডিমেনশিয়া বর্তমানে বিশ্বে মৃত্যুর সপ্তম প্রধান কারণ। একই সঙ্গে এটি বয়স্ক মানুষের অক্ষমতা ও অন্যের ওপর নির্ভরশীলতার অন্যতম বড় কারণ। এই রোগ মস্তিষ্কের বিভিন্ন রোগজনিত কারণে সৃষ্টি হয় এবং স্মৃতিশক্তি, চিন্তাশক্তি ও দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।
বিশ্বজুড়ে উদ্বেগজনক চিত্র
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে ৫ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত। প্রতি বছর প্রায় এক কোটি নতুন রোগী শনাক্ত হন। ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ ধরন হলো আলঝেইমার রোগ, যা মোট রোগীর প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের ক্ষেত্রে দেখা যায়।
ডব্লিউএইচওর অসংক্রামক রোগ ও মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক দেবোরা কেস্টেল বলেন, পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য ব্যক্তি, পরিবার ও সম্প্রদায়ের কঠিন বাস্তবতা। ডিমেনশিয়া শুধু স্বাস্থ্য নয়, মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সামগ্রিক সুস্থতার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। তাঁর ভাষায়, এটি কোনো দূরবর্তী সমস্যা নয়; বরং প্রত্যেকের জীবনেই কোনো না কোনোভাবে এর প্রভাব পড়তে পারে।
নতুন নির্দেশিকায় প্রতিরোধে জোর
ডব্লিউএইচও ২০১৯ সালে প্রথম ডিমেনশিয়া প্রতিরোধবিষয়ক নির্দেশিকা প্রকাশ করেছিল। তবে সংস্থাটি বলছে, এরপর থেকে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও গবেষণার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই হালনাগাদ নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়েছে।
নতুন নির্দেশিকার মূল লক্ষ্য হলো স্বাস্থ্যকর্মী ও নীতিনির্ধারকদের জন্য এমন কার্যকর সুপারিশ তুলে ধরা, যাতে ডিমেনশিয়া সম্পর্কে আগাম সচেতনতা বৃদ্ধি পায় এবং প্রাথমিক পর্যায়ে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ভবিষ্যতে রোগের সামগ্রিক বোঝা কমানো যায়।
ডব্লিউএইচও জোর দিয়ে বলেছে, ৬৫ বছরের বেশি বয়সে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়লেও এটি বার্ধক্যের অবশ্যম্ভাবী অংশ নয়।
জীবনযাত্রার পরিবর্তনই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল
ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস বলেন, বর্তমানে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির কারণ সম্পর্কে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি তথ্য জানা গেছে। নতুন নির্দেশিকায় সেই বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপে রূপ দেওয়া হয়েছে, যাতে দেশগুলো দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে এবং মানুষের মস্তিষ্কের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় কাজ করতে পারে।
সংস্থাটি বলছে, এখনো ডিমেনশিয়ার কোনো নিরাময় নেই এবং সবার জন্য সহজলভ্য কার্যকর চিকিৎসাও নেই। তাই প্রতিরোধই রোগের প্রকোপ কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ডব্লিউএইচও আরও সুপারিশ করেছে, যাদের হালকা মাত্রার জ্ঞানীয় সক্ষমতা হ্রাসের লক্ষণ রয়েছে, তাদের জন্য মানসিক অনুশীলন ও মস্তিষ্কের কার্যক্রম সক্রিয় রাখার প্রশিক্ষণ উপকারী হতে পারে। পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ কোলেস্টেরলের মতো রোগ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখলে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব। এ ছাড়া অসংক্রামক রোগ, মানসিক স্বাস্থ্য এবং মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যসেবাকে সমন্বিতভাবে পরিচালনার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
অর্থনৈতিক বোঝাও বিশাল
ডব্লিউএইচওর হিসাবে, ডিমেনশিয়ার কারণে প্রতি বছর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়। এর প্রায় অর্ধেকই পরিবার ও স্বজনদের বিনা পারিশ্রমিকের পরিচর্যা সেবার মাধ্যমে বহন করা হয়।
সংস্থাটির মতে, ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির কারণগুলো সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনমান উন্নত করতে পারে। এর ফলে মানুষ আরও দীর্ঘ সময় সুস্থ, স্বনির্ভর ও স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে সক্ষম হবে।
ডব্লিউএইচওর মতে, জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমানো শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষাই নয়, ভবিষ্যতে পরিবার, সমাজ এবং অর্থনীতির ওপর এই রোগের চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পারে।
ডব্লিউএইচও: পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে ডিমেনশিয়ার ৪৫ শতাংশ ঝুঁকি কমানো বা বিলম্ব করা সম্ভব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















