সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতিঝিল বিএনপির সভাপতিকে লাঞ্ছিত করার একটা ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে। ভদ্রলোক দেশের একজন সিনিয়র সিটিজেন। সত্তরোর্ধ্ব বা সত্তরের কাছাকাছি তাঁর বয়স হবেই।
রাস্তার মাঝখানে এ ধরনের ভদ্রলোকদের এভাবে লাঞ্ছিত হবার ভিডিও গত দুই বছরে দেখতে দেখতে এদেশের মানুষ অনেকখানি অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কারণ, বিএনপির এই মতিঝিল সভাপতির বয়সের মুক্তিযোদ্ধাকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে দেশের মানুষ এভাবে লাঞ্ছিত হতে দেখেছে, ঢাকার জিরো পয়েন্টেও এভাবেই এই বয়সের মুক্তিযোদ্ধাকে লাঞ্ছিত হতে দেখেছে। তাদের সমস্ত শরীরের কাপড় এভাবেই খুলে নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া সারাদেশে মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অনেক তরুণীকেও একই হাল করা হয়েছে। সাংবাদিকদেরও করা হয়েছে। আইনজীবী, বিচারক, রাজনীতিক সবার ওপর করা হয়েছে।
সমাজ ও রাষ্ট্রে এই দৈত্যদের এভাবে বোতল থেকে বের করে ছেড়ে দেবার কাজটি ছিল ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইনের একটি অংশ। সমাজের মানুষের মধ্যে এভাবে ভীতি ছড়ানো শুধু নয়, একটি অনিয়ন্ত্রিত শক্তি তৈরি করতে হয় মবের রাজত্ব কায়েম করতে হলে।
ইতিহাসের হাজার হাজার বছরে বহু ক্ষমতা দখলকারী এ কাজ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো এভাবে ভেঙে ফেলা সম্ভব হবে, বাংলা ভাষার মতো একটি পরিশীলিত ভাষাকে যেভাবে নষ্ট করা হয়েছে এভাবে নষ্ট করা সম্ভব হবে- এটা অনেকে ভাবতে পারেনি। কারণ, ১৯৭১ সালেও সমাজ কাঠামো ভাঙা সম্ভব হয়নি। এর পরেও বহু রাজনৈতিক উত্থান-পতন গেছে- কিন্তু এভাবে বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো ভাঙা সম্ভব হয়নি। বা কেউ ক্ষমতা দখল করে তা করার চেষ্টাও করেনি। কারণ, এর আগে যারা ক্ষমতা দখল করেছেন তারা হয় রাজনীতিক না হয় সামরিক বাহিনীর মানুষ।

ইউনূস প্রথম এনজিও শ্রেণী থেকে আসা মানুষ যে কিনা মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছে।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এদেশের জ্ঞানী রাজনীতিকদের একজন ছিলেন। এবং ১৯৮০’র দশক থেকে তিনিই একমাত্র রাজনীতিক যিনি এনজিও বিরোধী ছিলেন সব সময়ই। অনেকে মনে করতেন, হয়তো এনজিও যারা করে তারা দরিদ্র মানুষের উপকার করছে- এর ফলে বাম রাজনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাই তিনি এনজিও বিরোধী।
২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে সরকার বিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ এক পর্যায়ে “প্রশিকা” নামক একটি এনজিওকে সঙ্গে নেয়। উল্লেখ্য আওয়ামী লীগ পরে নিজেই প্রশিকাকে শেষ করে দিয়েছিল। সে প্রসঙ্গ এখানে নয়। যাহোক, এই সময়ে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ একদিন কথা প্রসঙ্গে বলেন, আওয়ামী লীগ একটা বড় ভুল করছে রাজনীতিতে এনজিওকে সঙ্গে নিয়ে। আমি তাঁকে পাল্টা বলি, আপনার সঙ্গেও একটা এনজিও আছে।
তিনি স্বীকার করে বলেন, যে তিনি এখন রাজনীতিতে প্রান্তিক শক্তি। তাকে টিকে থাকার জন্য কিছু কাজ করতে হচ্ছে। এবং তারপরে তাঁর স্বভাবসুলভ ভাষায় বলেন, শোনো আমি সেই মাপের ইঁদুর নিয়েছি যা বিড়াল হিসেবে প্রয়োজনে টুপ করে খেয়ে ফেলতে পারব। কিন্তু রাজনীতির মূলধারার সঙ্গে এনজিও জড়িয়ে গেলে তারা সমাজ ধ্বংস করে ফেলবে। তাঁকে পাল্টা প্রশ্ন করি কেন এনজিওরা এক কাজ করবে? তখন এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। তার সারসংক্ষেপ এক লাইনে বলা যায়, তাঁর মতে যারা এনজিও করে তাদেরকে সমাজে দেহজীবীদের যেভাবে ব্যবহার করা হয়- বিদেশীরা তাদেরকে ওইভাবেই ব্যবহার করে। আর ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এশিয়ান সমাজগুলো ভেঙে ফেলা পশ্চিমাদের একটি বড় কাজ হবে। দেখো ইতোমধ্যে ভারতে এনজিও ঢুকাতে না পেরে সেখানে তারা ধর্ম ঢুকিয়ে সমাজ ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে। তাকে এর বিপরীতে বলেছিলাম, আপনিও তো ধর্ম, কর্ম, সমাজতন্ত্র নীতি নিয়েছেন। তিনি যুক্তি দেন তিনি সেক্যুলার হিসেবে ধর্মকে রাজনীতিতে যতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন ধর্ম ব্যবসায়ীরা তা পারবে না।
অধিকাংশ এনজিওর যে আসলে নিজেদের ব্যবসা ছাড়া দেশের প্রতি দায় বা মানুষের প্রতি কোন দায় নেই এটা সাংবাদিক হিসেবে আমরা দেখেছি।
যাহোক, ওই আলোচনা এখানে নয়। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের কথা উল্লেখ করলাম একারণে যে, আজ মতিঝিলের বিএনপি সভাপতির ওপর এই ধরনের হামলা হয়েছে- যা গত দুই বছর ধরে দেশে চলছে – তা প্রমাণ করছে যে সমাজটি অনেকখানি ভেঙে ফেলতে সমর্থ হয়েছে ইউনূস ও তার সহযোগীরা।

এবং রাষ্ট্র ও সমাজের স্বার্থে যে বোতলগুলোতে দৈত্যগুলোকে রাখতে হয় সেই বোতলগুলোর মুখ খুলে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে এরা নানার রূপে নানান সময়ে আবির্ভূত হচ্ছে। আর ইউনূস এই বোতলের মুখ খোলার কাজকে বৈধ করার জন্য রাষ্ট্রের সকল অঙ্গ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিয়ে গেছে।
পৃথিবীর ইতিহাস বলে কোন রাষ্ট্র ও সমাজ কখনই দৈত্য রাখার বোতলের মুখ খোলে না। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালেও সেটা খোলা হয়নি। যারা খোলে তাদের অবস্থা কী হয় তার প্রমাণ একটু পৃথিবীর দিকে তাকালেই বোঝা যায়। যেমন আফগানিস্তান ওই বোতলের মুখ খুলেছে- তাই আমেরিকা খুলে দিক আর পাকিস্তান খুলে দিক।
এখন শুধু শান্ত মাথায় একবার ভেবে দেখা যেতে পারে যে কন্যা শিশুটি মালয়েশিয়ায় এমনকি দরিদ্র নেপালেও জন্ম নেবে আগামীকাল- আর যে আফগানিস্তানে জন্ম নেবে – কে জন্মগতভাবে অভিশাপগ্রস্ত হবে? একটি কন্যা শিশুর আফগানিস্তানে জন্ম নেওয়ার অর্থ হচ্ছে অভিশাপগ্রস্ত মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়া।
তাই বাংলাদেশকে এখন ভাবতে হবে, সে কি দেশটি আগামী শিশুদের জন্য অভিশাপের ক্ষেত্র তৈরি করবে না বসবাসযোগ্য তৈরি করবে? কাজটি বাংলাদেশের জন্য অনেক কঠিন করে দিয়ে গেছে ইউনূস।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.
স্বদেশ রায় 


















