বিশ্বের বাণিজ্যিক জীবাশ্ম বাজারে নতুন ইতিহাস গড়েছে একটি টাইরানোসরাস রেক্স (টি. রেক্স)-এর কঙ্কাল। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নিলাম প্রতিষ্ঠান সাদেবিজের (Sotheby’s) আয়োজিত নিলামে ‘গাস’ (Gus) নামে পরিচিত টি. রেক্সের জীবাশ্মটি ৫ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়েছে। নিলাম-ফিসহ এই মূল্য এখন পর্যন্ত বাণিজ্যিক বাজারে কোনো ডাইনোসরের জীবাশ্মের সর্বোচ্চ বিক্রিমূল্য।
প্রায় ১০ মিনিটের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দর হাঁকার পর সাতজন বিডারের অংশগ্রহণে এই বিক্রি সম্পন্ন হয়। তবে ক্রেতার পরিচয় বা অবস্থান প্রকাশ করেনি সাদেবিজ।
বিশ্বরেকর্ড ফিরে পেল টি. রেক্স
এই বিক্রির মাধ্যমে সবচেয়ে মূল্যবান ডাইনোসর জীবাশ্মের শিরোপা আবারও টি. রেক্সের দখলে ফিরেছে। ২০২৪ সালে ‘অ্যাপেক্স’ (Apex) নামে একটি স্টেগোসরাসের জীবাশ্ম ৪ কোটি ৪৬ লাখ ডলারে বিক্রি হয়ে আগের রেকর্ড গড়েছিল। এবার সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে ‘গাস’।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডাইনোসরের জীবাশ্মের মূল্য দ্রুত বেড়ে চলেছে। এতে বাণিজ্যিক জীবাশ্ম অনুসন্ধানকারীরা উৎসাহিত হলেও বিশ্ববিদ্যালয় ও জাদুঘরের গবেষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, এত উচ্চমূল্যের কারণে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক নিদর্শনগুলো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

দক্ষিণ ডাকোটা থেকে নিলামঘর
প্রায় সাড়ে ১২ ফুট উঁচু এই টি. রেক্সের জীবাশ্মটি যুক্তরাষ্ট্রের জীবাশ্মসমৃদ্ধ সাউথ ডাকোটার একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থেকে উদ্ধার করা হয়। ২০২১ সালে খননকাজ শুরু হয় এবং কয়েক বছর ধরে তা চলতে থাকে।
জীবাশ্মটির নাম রাখা হয় ‘গাস’, সেই জমির মালিক গ্যারি লিকিংয়ের ডাকনাম অনুসারে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিজের ৬,৫০০ একরের গবাদিপশুর খামারে ছোট ছোট হাড়ের টুকরো খুঁজে পেতেন। পরে একজন বাণিজ্যিক জীবাশ্ম বিশেষজ্ঞের সঙ্গে অংশীদার হয়ে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান শুরু করেন। ২০২২ সালে, খননকাজ চলাকালেই তার মৃত্যু হয়।
বাণিজ্যিক জীবাশ্ম বিশেষজ্ঞ থমাস হাইটক্যাম্প ও তার দল টানা তিন গ্রীষ্মে জীবাশ্মটি উত্তোলন করেন। এরপর পরীক্ষাগারে আরও কয়েক বছর ধরে শিলার স্তর থেকে হাড় আলাদা করে ৩৮ ফুট দীর্ঘ এই শিকারি ডাইনোসরের কঙ্কাল পুনর্গঠন করা হয়।
১৮৩টি হাড়ের অংশ উদ্ধার
সাদেবিজ জানিয়েছে, নমুনাটির ১৮৩টি হাড়ের উপাদান উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে টি. রেক্সের কোনো সম্পূর্ণ কঙ্কাল এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি, তাই অনুপস্থিত অংশগুলো পুনর্গঠন করতে হয়েছে।
প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে বিচরণকারী ‘গাস’-এর জীবাশ্মে সেরে যাওয়া পাঁজরের আঘাতের চিহ্ন এবং এমন একটি খুলিও রয়েছে, যা সম্ভবত মৃতভোজী প্রাণীর কামড়ের শিকার হয়েছিল। এ ধরনের আঘাত বা রোগের প্রমাণ সাধারণত জীবাশ্মের বাজারমূল্য আরও বাড়িয়ে দেয়।
গবেষকদের উদ্বেগ
বৈজ্ঞানিক মহলের অনেকের মতে, এমন গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্ম ব্যক্তিমালিকানায় চলে গেলে ভবিষ্যতের গবেষণা, শিক্ষা ও জনসাধারণের প্রদর্শনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
সোসাইটি অব ভার্টিব্রেট প্যালিওনটোলজি নিলামের আগে সতর্ক করে জানায়, ব্যক্তিগত সংগ্রহে চলে যাওয়া জীবাশ্ম ভবিষ্যতের বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও জনসম্পৃক্ততার সম্ভাবনাকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
উইসকনসিনের কার্থেজ কলেজের জীবাশ্মবিদ থমাস কার বলেন, নিলাম প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এখন সবচেয়ে দামি ডাইনোসরের জীবাশ্ম বিক্রির প্রতিযোগিতা চলছে। তার ভাষায়, এমন দামে কোনো জাদুঘরের পক্ষে জীবাশ্ম কেনা প্রায় অসম্ভব।
অন্যদিকে বাণিজ্যিক জীবাশ্মবিদ পিটার লারসনের মতে, একটি জীবাশ্ম উদ্ধার, সংরক্ষণ ও প্রদর্শনযোগ্য অবস্থায় আনতে বহু বছরের শ্রম ও বিপুল ব্যয় লাগে। তাই এসব জীবাশ্মের উচ্চমূল্যেরও বাস্তব ভিত্তি রয়েছে।
বিতর্কের মাঝেও বাড়ছে বাজার
২০২০ সালে ‘স্ট্যান’ (Stan) নামে আরেকটি টি. রেক্স ৩ কোটি ১৮ লাখ ডলারে বিক্রি হওয়ার পর থেকেই জীবাশ্ম বাজারে দাম বাড়ার ধারা শুরু হয়। পরে জানা যায়, সেটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘরের জন্য কেনা হয়েছিল।
এরপর ডেইনোনাইকাস, স্টেগোসরাস এবং কিশোর সেরাটোসরাসসহ একাধিক ডাইনোসরের জীবাশ্মও কোটি কোটি ডলারে বিক্রি হয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, এত বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে ব্যক্তিগত সংগ্রহ গড়ার পরিবর্তে একই অর্থের সামান্য অংশ ব্যয় করেও নতুন জীবাশ্ম অনুসন্ধান ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব।
টি. রেক্স ‘গাস’ ৫ কোটি ১০ লাখ ডলারে বিক্রি হয়ে বিশ্বের সবচেয়ে দামী ডাইনোসর জীবাশ্মের নতুন রেকর্ড গড়েছে। তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি জীবাশ্মের বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে নতুন করে বিতর্কও জোরালো হয়েছে।
টি. রেক্স ‘গাস’ ৫ কোটি ১০ লাখ ডলারে বিক্রি হয়ে বিশ্বের সবচেয়ে দামী ডাইনোসর জীবাশ্মের রেকর্ড গড়েছে। এতে গবেষণা ও ব্যক্তিগত মালিকানা নিয়ে বিতর্কও বেড়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















