কয়েক মাস আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীর উপস্থাপনা দেখে আমার মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি জন্মেছিল। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে এই অনুভূতির মুখোমুখি আগে কখনও হইনি। তাদের বিশ্লেষণ ছিল পরিণত, উপস্থাপনা ছিল পেশাদার মানের, আর কাজের গতি ছিল বিস্ময়কর। তারা এখনো অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ নয়, কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় এমন এক সক্ষমতা অর্জন করেছে, যা বহু বছরের অভিজ্ঞতার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। সেই মুহূর্তে উপলব্ধি করলাম, প্রযুক্তির এই যুগে দক্ষতার সংজ্ঞাই বদলে যাচ্ছে।
ইতিহাস বলছে, এমন পরিবর্তন নতুন নয়। সভ্যতার প্রতিটি বড় প্রযুক্তিগত বাঁকে মানুষ একই ধরনের উদ্বেগে আক্রান্ত হয়েছে। নতুন প্রযুক্তি এলেই একদল ভবিষ্যদ্বাণী করে সব শেষ হয়ে যাবে, আরেকদল মনে করে সামনে শুধু স্বর্ণযুগ। বাস্তবে ইতিহাস কখনোই এই দুই চরম অবস্থানের কোনোটিকে পুরোপুরি সত্য প্রমাণ করেনি। বরং প্রযুক্তি মানুষের কাজকে বিলুপ্ত করার চেয়ে তার চরিত্রকে বদলে দিয়েছে।
উনিশ শতকে আলোকচিত্রের আবির্ভাবের পর অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, চিত্রকলার যুগ শেষ। একজন চিত্রশিল্পী যে কাজ করতে বছরের পর বছর অনুশীলন করেন, একটি ক্যামেরা সেটি কয়েক মুহূর্তেই করে ফেলতে পারে। সেই সময় শিল্পজগতে আতঙ্ক ছিল বাস্তব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যা ঘটল, তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ফটোগ্রাফি চিত্রকলাকে হত্যা করেনি; বরং তাকে নতুন স্বাধীনতা দিয়েছিল। বাস্তবতার নিখুঁত অনুকরণ করার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত হয়ে শিল্পীরা মানুষের অনুভূতি, কল্পনা ও অভ্যন্তরীণ জগতকে প্রকাশের নতুন ভাষা খুঁজে পেলেন। ইমপ্রেশনিজম, কিউবিজম কিংবা আধুনিক শিল্পের বিস্তার সেই পরিবর্তনেরই ফল। অর্থাৎ প্রযুক্তি পুরোনো দক্ষতার মূল্য কমিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু একই সঙ্গে আরও উচ্চতর সৃজনশীলতার দরজা খুলে দিয়েছিল।
একই রকম ঘটনা ঘটেছে ডাক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও। ই-মেইল জনপ্রিয় হওয়ার পর বহু মানুষ ভেবেছিলেন ডাকঘরের আর কোনো প্রয়োজন থাকবে না। বাস্তবে ডাক বিভাগ হারিয়ে যায়নি। বরং বিশ্বব্যাপী ই-কমার্সের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এটি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। কাজের ধরন পাল্টেছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়নি।
আর চিঠির মূল্যও এক অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে। আগে চিঠি ছিল যোগাযোগের বাধ্যতামূলক মাধ্যম। এখন সেটি ব্যক্তিগত অনুভূতির এক বিশেষ প্রকাশ। প্রযুক্তি যেখানে সাধারণ যোগাযোগকে সহজ করেছে, সেখানে হাতে লেখা একটি চিঠি আগের চেয়ে আরও অর্থবহ হয়ে উঠেছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিবর্তন আরও গভীর। একসময় ধারণা করা হয়েছিল, উন্নত কম্পিউটার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিকিৎসকদের অপ্রয়োজনীয় করে তুলবে। সাম্প্রতিক সময়ে এমন এআই ব্যবস্থাও তৈরি হয়েছে, যা জটিল রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বহু সাধারণ চিকিৎসকের চেয়েও বেশি নির্ভুল ফল দেখিয়েছে। তবু মানুষ অসুস্থ হলে এখনো একজন ভালো চিকিৎসকের কাছেই যেতে চায়।
এর কারণ চিকিৎসা শুধু তথ্য বিশ্লেষণের বিষয় নয়। রোগীর চোখের ভাষা বোঝা, উদ্বেগ অনুভব করা, কঠিন সিদ্ধান্তের সময় পাশে দাঁড়ানো কিংবা বিশ্বাস তৈরি করা—এসব এখনো মানুষের কাজ। প্রযুক্তি চিকিৎসকের বিকল্প নয়; বরং দক্ষ চিকিৎসকের ক্ষমতাকে আরও বিস্তৃত করার একটি শক্তিশালী সহায়ক।
অস্ত্রোপচারে রোবটের ব্যবহার, কৃত্রিম অঙ্গ, ককলিয়ার ইমপ্লান্ট কিংবা স্নায়ুর সংকেতে পরিচালিত আধুনিক প্রস্থেটিক প্রযুক্তি দেখিয়ে দিয়েছে, আজ চিকিৎসাবিজ্ঞান আর একক কোনো শাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জীববিজ্ঞান, প্রকৌশল, তথ্যবিজ্ঞান ও চিকিৎসা একসঙ্গে মিশে নতুন জ্ঞানভিত্তিক ক্ষেত্র তৈরি করছে। ফলে পুরোনো দক্ষতা হারিয়ে যাচ্ছে না; বরং আরও জটিল ও সমন্বিত দক্ষতার চাহিদা তৈরি হচ্ছে।

এই ধারাবাহিকতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। প্রযুক্তি সাধারণত মানুষের বিশেষজ্ঞতাকে ধ্বংস করে না; বরং সেটিকে অন্য স্তরে স্থানান্তরিত করে। যেসব কাজ একসময় দীর্ঘ অনুশীলনের মাধ্যমে করতে হতো, সেগুলোর অনেকটাই এখন যন্ত্র করতে পারে। ফলে মানুষের সামনে আরও কঠিন, আরও সৃজনশীল এবং আরও মানবিক কাজের দায়িত্ব এসে পড়ে।
কিন্তু প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের এই দিকটি নিয়ে আমরা খুব কমই কথা বলি। আমরা আলোচনা করি কোন পেশা বিলুপ্ত হবে, কোন নতুন পেশা তৈরি হবে কিংবা উৎপাদনশীলতা কত বাড়বে। অথচ একজন মানুষের নিজের পেশাগত পরিচয় বারবার নতুন করে গড়ে তোলার মানসিক চাপ, আত্মপরিচয়ের সংকট কিংবা পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার নৈতিক মূল্য নিয়ে আলোচনা খুবই সীমিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের দিকে তাকালে আমি লক্ষ্য করি, প্রশ্নটি এখন আর শুধু “আমি কী জানি”—এখানে সীমাবদ্ধ নেই। বরং প্রশ্নটি হয়ে উঠছে, “আমি কে, এবং এমন কী আছে আমার মধ্যে, যা অন্যরা সত্যিই মূল্যবান বলে মনে করবে?”
এই প্রশ্ন কেবল দক্ষতার নয়; এটি চরিত্রের প্রশ্ন। এটি অর্থনীতিরও প্রশ্ন, আবার নৈতিকতারও প্রশ্ন। অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ যেমন বলেছিলেন, অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত গড়ে ওঠে সহমর্মিতা, নৈতিক কল্পনাশক্তি এবং অন্য মানুষের অবস্থান বুঝতে পারার ক্ষমতার ওপর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতেও এই সত্য বদলাবে না।
প্রযুক্তি আরও শক্তিশালী হবে। অ্যালগরিদম আরও দক্ষ হবে। উৎপাদনশীলতার নতুন রেকর্ড তৈরি হবে। কিন্তু একটি সভ্য সমাজের প্রকৃত ভিত্তি থাকবে মানুষের মধ্যকার সেই সম্পর্কগুলোতেই, যেগুলোকে কোনো সফটওয়্যার অনুকরণ করতে পারে, কিন্তু সত্যিকার অর্থে ধারণ করতে পারে না।
একজন চিকিৎসকের আশ্বাসবাণী, একজন শিক্ষকের উৎসাহব্যঞ্জক বাক্য, কোনো সহকর্মীর আন্তরিক খোঁজ নেওয়া কিংবা অন্যের কষ্ট উপলব্ধি করার ক্ষমতা—এসবকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে “সফট স্কিল” বলে অবহেলা করেছি। বাস্তবে এগুলোই একটি মানবিক সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।
২০৩০ সালের কর্মক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদধারীদের কাছ থেকে কী ধরনের দক্ষতা প্রত্যাশা করা হবে, তা আজ নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। অনেক দক্ষতা অচল হয়ে যাবে, আবার কিছু গুণ অপ্রত্যাশিতভাবে আরও মূল্যবান হয়ে উঠবে।
তবে একটি বিষয়ে আমার বিশ্বাস ক্রমেই দৃঢ় হচ্ছে। ভবিষ্যতের প্রকৃত সফল মানুষ সেই ব্যক্তি হবেন না, যিনি শুধু সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে জানেন। বরং তিনি হবেন সেই মানুষ, যিনি মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন, উপস্থিত থাকতে পারেন, নতুন কিছু দেখে বিস্মিত হতে পারেন, অন্যের সেবাকে গুরুত্ব দেন, নৈতিক মানদণ্ডে অটল থাকেন এবং কঠিন সময়েও নিজের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান না।
প্রযুক্তি মানুষের অনেক কাজ সহজ করে দিতে পারে। কিন্তু মানুষ হয়ে ওঠার এই মৌলিক গুণগুলোর কোনো বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। আর সম্ভবত ভবিষ্যতের পৃথিবীতেও সেগুলোর বিকল্প কখনো তৈরি হবে না।
লিম উং 


















