ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান নিট-ইউজি (NEET-UG) ২০২৬ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়মকে ঘিরে টানা ছাত্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেছেন। শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত এক চিঠিতে তিনি জানান, দেশের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ, জাতীয় ঐক্য এবং চলমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল হয়ে ওঠা থেকে রক্ষা করার স্বার্থেই তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। বিশেষ করে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে তাঁর পদত্যাগই ছিল প্রধান দাবি। এর একদিন আগে সিজেপির প্রতিনিধিরা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে.পি. নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর দলটি জানিয়েছিল, সরকার এক দিনের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে।
নিট বিতর্ক ও সরকারের পদক্ষেপ

পদত্যাগপত্রে ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পরপরই কেন্দ্রীয় সরকার তদন্তভার সিবিআইকে দেয়। একই সঙ্গে পরীক্ষা বাতিল করে পুনঃপরীক্ষার ঘোষণা দেওয়া হয় এবং আগামী বছর থেকে পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ কম্পিউটারভিত্তিক (CBT) পদ্ধতিতে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিনি উল্লেখ করেন, ২০ লাখের বেশি পরীক্ষার্থীর স্বার্থ বিবেচনায় কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার, জেলা প্রশাসন এবং অভিভাবকদের সহযোগিতায় ২১ জুন পুনঃপরীক্ষা সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়। ১৬ জুলাই প্রকাশিত ফলেও বহু মেধাবী শিক্ষার্থী, বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের পরীক্ষার্থীরা ভালো ফল করেছে বলে তিনি দাবি করেন।
‘শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সবার আগে’
চিঠিতে ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, শিক্ষাজীবনের চার দশকের বেশি সময় তিনি ছাত্র, শিক্ষক ও শিক্ষা সংস্কারের জন্য কাজ করেছেন। তাঁর মতে, একটি শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা দেশের উন্নয়নের ভিত্তি।
তিনি আরও বলেন, শুরু থেকেই তিনি এই ঘটনার দায় স্বীকার করেছেন এবং কখনও দায়িত্ব এড়িয়ে যাননি। তাঁর অঙ্গীকার ছিল, কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেন পরীক্ষা জালিয়াত চক্রের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে কিছু ব্যক্তি দায়িত্বশীল অবস্থানে থেকেও বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। দেশের তরুণদের বিভ্রান্তির মধ্যে না ফেলে তাদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ গঠনে মনোযোগী রাখতেই তিনি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান।
আন্দোলনকারীদের উচ্ছ্বাস

ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ঘোষণার পর দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত সিজেপি সমর্থকদের মধ্যে উল্লাস দেখা যায়। দলটি এক বিবৃতিতে জানায়, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাত্র আন্দোলনের বড় বিজয় এবং এটি প্রমাণ করেছে যে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকেও জবাবদিহির মুখে আনা সম্ভব।
দলের নেতা অভিজিৎ দিপকে সাংবাদিকদের বলেন, এই পদত্যাগ দেখিয়ে দিয়েছে যে জনগণ ভয় না পেলে এবং আন্দোলন থেকে সরে না দাঁড়ালে সরকারের কাছ থেকেও জবাব আদায় করা সম্ভব।
আন্দোলনের বাকি দাবি
সিজেপি আন্দোলনের শুরু থেকেই তিনটি দাবি তুলে ধরে। সেগুলো হলো—ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, আত্মহত্যা করা পরীক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার নিশ্চয়তা।
শুক্রবার সরকারের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা বৈঠকের পর দলটি জানিয়েছিল, তিন দাবির মধ্যে দুটি নীতিগতভাবে মেনে নেওয়া হয়েছে। প্রায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণা আসে।
উল্লেখ্য, ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি ২০২৬ পরীক্ষা ১২ মে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে বাতিল করা হয়। পরে ২১ জুন পুনঃপরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় এবং চলতি মাসে ফল প্রকাশ করা হয়। প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, যার মধ্যে কয়েকজন পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাও আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















