আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কিছু প্রশ্ন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জি-৭কে ঘিরে এখন ঠিক তেমনই একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—বিশ্ব অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা চীনকে বাইরে রেখে এই জোট কি এখনও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণের কার্যকর মঞ্চ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে পারে?
ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বাঁ শহরে অনুষ্ঠিত জি-৭-এর সর্বশেষ শীর্ষ সম্মেলনের আলোচ্যসূচি ছিল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য, গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহব্যবস্থা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক শিল্পের প্রতিযোগিতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ। এসব ক্ষেত্রের প্রতিটিতেই চীনের উপস্থিতি এতটাই গভীর যে তাকে বাদ দিয়ে আলোচনার বাস্তবতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। সম্মেলন শুরুর আগেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে বিতর্ক দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক ছিল না।
জি-৭ গঠিত হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন পশ্চিমা শিল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রভাব ছিল প্রায় একচ্ছত্র। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, ইতালি ও কানাডার সম্মিলিত অর্থনৈতিক শক্তিই তখন বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে যথেষ্ট ছিল। কয়েক দিনের বৈঠক থেকে নেওয়া সিদ্ধান্তের প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ত।
কিন্তু সেই বাস্তবতা এখন আর নেই। গত কয়েক দশকে বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্র ধীরে ধীরে পশ্চিম থেকে আরও বিস্তৃত ভূরাজনৈতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে। উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর উত্থান আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। ক্রয়ক্ষমতা সমতার হিসাবে ব্রিকস দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনীতি ইতোমধ্যেই জি-৭কে ছাড়িয়ে গেছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনে জি-৭-এর অংশও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি চীন। বহু বছর ধরে দেশটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অন্যতম বড় অবদান রেখে চলেছে। উৎপাদন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিরল খনিজের প্রক্রিয়াজাতকরণ, বৈদ্যুতিক যানবাহন, সৌরশক্তি, ৫জি প্রযুক্তি কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এসব ক্ষেত্রে চীন এখন এমন অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে তাকে উপেক্ষা করা কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হতে পারে, বাস্তবতার প্রতিফলন নয়।
তবে বিষয়টি শুধু অর্থনীতির নয়। আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার ধারণাও বদলেছে। একসময় কয়েকটি ধনী রাষ্ট্র বৈশ্বিক এজেন্ডা নির্ধারণ করত, আর অন্যরা তা অনুসরণ করত। বর্তমান বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে সেই কাঠামো আগের মতো কার্যকর নয়। নতুন শক্তিগুলোর উত্থান আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল করার দাবি জোরালো করেছে।
এ বছরের জি-৭ সম্মেলনের আলোচ্যসূচিই এই সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করেছে। বিশ্ব অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক শক্তিকে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে গেলে সেই দেশের ভূমিকাকে পাশ কাটানো সম্ভব নয়, যে দেশ এসব খনিজের প্রক্রিয়াজাতকরণে আধিপত্য ধরে রেখেছে। একইভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নীতিমালা নিয়ে আলোচনা করেও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এআই বাজারকে অনুপস্থিত রাখা বাস্তবসম্মত বলে মনে হয় না।

জি-৭-এর ভেতরেও এ বাস্তবতা নিয়ে কিছুটা উপলব্ধি দেখা গেছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ২০২৬ সালের সম্মেলনে চীনকে আমন্ত্রণ জানানোর ধারণা উত্থাপন করেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সদস্যদেশগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়নি। এটিই দেখায়, পরিবর্তিত বিশ্বকে স্বীকার করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা এখনও সেই পথে এগোতে দিচ্ছে না।
জি-৭-এর আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা তার রাজনৈতিক চরিত্র। এটি কেবল অর্থনৈতিক সমন্বয়ের প্ল্যাটফর্ম নয়; বরং উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক জোটও। শীতল যুদ্ধের সময় এই অভিন্ন পরিচয় জোটকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছিল। কিন্তু আজ একই বৈশিষ্ট্য অনেক ক্ষেত্রে তার অভিযোজনক্ষমতাকেই সীমিত করে দিচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে অলিখিতভাবে ধরে নেওয়া হয়েছে, জি-৭-এর সদস্য হতে হলে একটি নির্দিষ্ট ধরনের রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকতে হবে। ফলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, বৃহত্তম উৎপাদনশীল দেশ এবং শীর্ষ বাণিজ্যিক শক্তি হওয়া সত্ত্বেও চীন কখনও সদস্যপদের আলোচনায় আসেনি। কিন্তু এমন একটি দেশের অনুপস্থিতিতে বৈশ্বিক সমস্যার প্রতিনিধিত্বশীল সমাধান কতটা সম্ভব—এই প্রশ্ন এখন আরও জোরালো হয়ে উঠছে।
চীনের অবস্থান বরাবরই ভিন্ন। বেইজিং মনে করে, আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত আরও বিস্তৃত অংশগ্রহণের ভিত্তিতে, সীমিত সদস্যের একচেটিয়া ক্লাবের মাধ্যমে নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও উন্নয়ন মডেলের দেশগুলোকেও সমানভাবে বৈশ্বিক আলোচনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। ফলে চীনকে জি-৭-এ অন্তর্ভুক্ত করা হলেও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে উভয় পক্ষের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থেকেই যাবে।
অন্যদিকে জি-৭-এর অভ্যন্তরীণ মতভেদও এখন ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। ন্যাটো সদস্যদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রশ্ন থেকে শুরু করে ইউক্রেন যুদ্ধ মোকাবিলার কৌশল—বিভিন্ন ইস্যুতে একক অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি জোট যদি নিজস্ব সদস্যদের মধ্যেই স্থায়ী ঐকমত্য গড়ে তুলতে না পারে, তবে ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠা বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেওয়ার দাবি কতটা গ্রহণযোগ্য—এই প্রশ্ন উপেক্ষা করা যায় না।
বিশ্ব এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি আন্তঃনির্ভরশীল এবং একই সঙ্গে অনেক বেশি বহুমাত্রিক। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জলবায়ু, নিরাপত্তা কিংবা সরবরাহব্যবস্থা—কোনো ক্ষেত্রেই একক শক্তি বা সীমিত জোটের পক্ষে একা সমাধান দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে জি-৭-এর সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, সে কি অতীতের প্রভাবশালী ক্লাব হিসেবেই টিকে থাকবে, নাকি পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক সহযোগিতার পথে নিজেকে নতুনভাবে রূপান্তর করবে।
লি ওয়েনহান 



















