ভারতের বর্ষাকালীন সংসদ অধিবেশনে সোমবার শিক্ষার্থী আন্দোলন, পরীক্ষায় অনিয়ম ও কাগজ ফাঁসের অভিযোগ ঘিরে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিরোধীদের বিক্ষোভের মধ্যেই লোকসভায় সরকারি চাকরি ও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় অনিয়ম ঠেকাতে নতুন সংশোধনী বিল পেশ করা হয়েছে। বিলটি পেশ হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই হট্টগোলের কারণে লোকসভার অধিবেশন মুলতবি হয়ে যায়।
কাগজ ফাঁস ঠেকাতে কঠোর আইনের উদ্যোগ
লোকসভায় পেশ হওয়া ‘সরকারি পরীক্ষা (অন্যায় পদ্ধতি প্রতিরোধ) সংশোধনী বিল, ২০২৬’-এর লক্ষ্য পরীক্ষায় নকল, প্রতারণা, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সংগঠিতভাবে পরীক্ষাব্যবস্থায় কারসাজি ঠেকানো।
সরকারি পক্ষের বক্তব্য, পরীক্ষার অনিয়মের সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। প্রস্তাবিত আইনে অপরাধীদের জন্য কঠিন শাস্তির বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে। সংসদে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ কোটি রুপি পর্যন্ত জরিমানার বিধান থাকতে পারে।

শিক্ষার্থী আন্দোলন নিয়ে সরব বিরোধীরা
তবে বিল পেশের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের কথিত অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ নিয়ে সংসদে সরব হয়েছে বিরোধী দলগুলো। দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে ছররা বন্দুক ব্যবহারের অভিযোগ এবং বিহারে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলির অভিযোগ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বক্তব্য দাবি করা হয়েছে।
বিরোধীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবিও তোলা হয়েছে।
হট্টগোলে দুই কক্ষেই অচলাবস্থা
সোমবার অধিবেশন শুরু হওয়ার পরপরই লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিরোধীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের দাবিতে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে লোকসভা দুপুর ১২টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়। পরে কাগজ ফাঁস ঠেকানোর বিল পেশ হওয়ার কয়েক মিনিট পরও হট্টগোল অব্যাহত থাকায় অধিবেশন আবার মুলতবি করা হয়।
রাজ্যসভাতেও একই পরিস্থিতি দেখা যায়। বিরোধীদের প্রতিবাদের কারণে কার্যক্রম বারবার থমকে যায়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের পাশাপাশি শিক্ষার্থী আন্দোলন ঘিরে রাজনৈতিক চাপও ক্রমেই বাড়তে থাকে।
সাবেক শিক্ষামন্ত্রীকে ঘিরেও রাজনৈতিক উত্তাপ

এর মধ্যেই সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সংসদে ক্ষমতাসীন জোটের সদস্যদের উচ্ছ্বসিত অভ্যর্থনা ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার পর তিনি শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। সোমবার সংসদে তাকে ঘিরে ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের স্লোগান দিতে দেখা যায়।
বিরোধী দলের নেতারা এ ঘটনাকে সরকারের শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাদের দাবি, শুধু নতুন আইন করলেই হবে না; প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষায় অনিয়মের পেছনে থাকা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিল
কাগজ ফাঁস ঠেকানোর বিল ছাড়াও সোমবার লোকসভায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির সংখ্যা সংক্রান্ত আইন সংশোধনের বিষয়টি আলোচনায় আসার কথা ছিল। রাজ্যসভায় জাতীয় মর্যাদা ও প্রতীক অবমাননা প্রতিরোধ সংক্রান্ত আইন সংশোধনের বিলও বিবেচনার জন্য তোলার পরিকল্পনা ছিল।
তবে শিক্ষার্থী আন্দোলন ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের লাগাতার প্রতিবাদের কারণে সংসদের স্বাভাবিক কার্যক্রম কতটা এগোয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাগজ ফাঁস ঠেকাতে কঠোর আইন আনার উদ্যোগের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অভিযোগের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমাধানও সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
ভারতের সংসদে কাগজ ফাঁস, শিক্ষার্থী আন্দোলন ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলছে। নতুন বিলের মাধ্যমে পরীক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম ঠেকানোর উদ্যোগের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অভিযোগের জবাবদিহিও এখন বড় প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















