কাগজ ও কার্ডবোর্ডকে পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিংয়ের অন্যতম উপাদান হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু এর সঙ্গে থাকা আঠা, লেবেল, সিল বা বিশেষ প্রলেপ অনেক সময় পুরো প্যাকেটটিকেই পুনর্ব্যবহারের জন্য সমস্যাজনক করে তোলে। এখন সেই সমস্যা দূর করতে আঠাবিহীন প্রযুক্তি তৈরির চেষ্টা চলছে।
ইউরোপে কাগজ ও কার্ডবোর্ড পুনর্ব্যবহারে নতুন করে জোর দেওয়া হচ্ছে। ২০২৪ সালে ব্যবহৃত কাগজ ও কার্ডবোর্ডের প্রায় ৭৪ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন অংশে ব্যবহৃত এমন আঠা, যা সহজে আলাদা করা যায় না, পুনর্ব্যবহার কারখানায় বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে।
আঠা কেন সমস্যা তৈরি করে
প্যাকেট বা বাক্স থেকে কাগজ আলাদা করে পুনর্ব্যবহারের সময় আঠার অংশ যন্ত্রপাতিতে আটকে যেতে পারে। এতে যন্ত্রের ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি পুনর্ব্যবহৃত কাগজের মানও কমে যেতে পারে। কখনো পুরো একটি চালানই বাতিল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এই কারণে কাগজের প্যাকেজিংকে আরও সহজে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করার জন্য আঠার ব্যবহার কমানো বা পুরোপুরি বাদ দেওয়ার চিন্তা করছেন প্রযুক্তিবিদরা।
লেজার দিয়ে আঠাবিহীন সিল

জার্মানির গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফ্রাউনহোফার, হারমান আল্ট্রাসনিক ও হেনকেল এ ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে ফ্রাউনহোফার এমন একটি লেজারভিত্তিক পদ্ধতি তৈরি করছে, যেখানে কোনো আঠা ছাড়াই কাগজের প্যাকেট সিল করা সম্ভব হবে।
২০২৩ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পে কাগজের নির্দিষ্ট অংশে লেজারের তাপ প্রয়োগ করে সিল তৈরি করা হচ্ছে। প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
গবেষকদের আশা, সবকিছু ঠিকঠাক এগোলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এই ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হতে পারে।
শব্দতরঙ্গেও কাগজ জোড়া লাগানোর চেষ্টা
শুধু লেজার নয়, শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করেও কাগজ সিল করার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চলছে। জার্মানির একটি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান এ পদ্ধতিকে অনেকটা ঢালাইয়ের মতো বলে বর্ণনা করছে।
তবে নতুন প্রযুক্তি বাজারে ছড়িয়ে দিতে বড় বাধা হলো পুরোনো যন্ত্রপাতি। বর্তমানে প্যাকেজিং কারখানার অধিকাংশ যন্ত্র আঠা ব্যবহার করে প্যাকেট তৈরির জন্য তৈরি। ফলে নতুন পদ্ধতি চালু করতে যন্ত্র পরিবর্তন বা নতুন যন্ত্র বসানোর প্রয়োজন হতে পারে।
আরেকটি সমস্যা হলো উৎপাদনের গতি। আঠা ব্যবহার করা প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় নতুন প্রযুক্তি এখনো ধীর। তবে গবেষকদের দাবি, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই গতি বাড়ানো সম্ভব।

সব কাগজে এখনো কাজ করছে না
আঠাবিহীন সিল তৈরির প্রযুক্তির আরও একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সব ধরনের কাগজ দিয়ে একইভাবে সিল তৈরি করা যাচ্ছে না। এ কারণে কাগজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও কাজ করছেন গবেষকরা, যাতে এমন কাঁচামাল তৈরি করা যায় যা সহজে নতুন প্রযুক্তিতে জোড়া লাগবে।
খাদ্যপণ্যের প্যাকেজিং আরও কঠিন। খাবারকে সুরক্ষিত রাখতে অনেক সময় কাগজের ওপর বিশেষ প্রতিরোধী প্রলেপ দিতে হয়। ফলে কাগজকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য রাখা এবং একই সঙ্গে খাবার সুরক্ষিত রাখা—দুই বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।
ঠান্ডা চাপেই কাগজের সিল
এই জায়গায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে ঠান্ডা সিল প্রযুক্তি। বিশেষ প্রলেপ দেওয়া কাগজে তাপ প্রয়োগ না করেই চাপের মাধ্যমে এক অংশের সঙ্গে আরেক অংশ জোড়া লাগানো যায়।
চকলেট, আইসক্রিমসহ তাপের প্রতি সংবেদনশীল খাবারের প্যাকেজিংয়ে এ ধরনের প্রযুক্তি বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। ইতোমধ্যে কিছু খাবার ও মিষ্টিজাত পণ্যের মোড়কে এ প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে।
পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাগজ দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি-সংশ্লিষ্ট পণ্য মোড়ানোর ক্ষেত্রেও নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাগজ ব্যবহারের সুযোগ আরও বাড়ছে।

শুধু আঠা নয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ
তবে কাগজ পুনর্ব্যবহারের সমস্যা শুধু আঠা বা লেবেলের কারণে হচ্ছে না। অনেক কাগজ ও কার্ডবোর্ড পুনর্ব্যবহার কারখানায় পৌঁছানোর আগেই ময়লা হয়ে যায় কিংবা অন্য বর্জ্যের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে সেগুলো আর পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।
এ কারণে কাগজের প্যাকেজিংয়ে নতুন সিল প্রযুক্তির পাশাপাশি বর্জ্য সংগ্রহ, আলাদা করা এবং সঠিকভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থাও উন্নত করতে হবে।
সামনে আরও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত
ইউরোপে প্যাকেজিং পুনর্ব্যবহারের নিয়ম আরও কঠোর হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সব প্যাকেজিংয়ের অন্তত ৭০ শতাংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য করার লক্ষ্য রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সেই লক্ষ্য আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
ফলে প্যাকেজিং শিল্পে আঠা, প্লাস্টিক ও অন্যান্য উপাদানের বিকল্প খোঁজার চাপ বাড়ছে। আঠাবিহীন লেজার সিল, শব্দতরঙ্গভিত্তিক সিল এবং ঠান্ডা চাপের প্রযুক্তি সেই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
কাগজের প্যাকেটকে শুধু ব্যবহারযোগ্য নয়, ব্যবহারের পর সহজে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলাই এখন মূল লক্ষ্য। প্রযুক্তিগুলো আরও দ্রুত, সাশ্রয়ী ও বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজিংয়ের উপযোগী হয়ে উঠতে পারলে ভবিষ্যতের বাজারে প্লাস্টিকের জায়গায় কাগজের ব্যবহার আরও বাড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















