নদী, হ্রদ কিংবা প্রাকৃতিক জলাশয়ে সাঁতার কাটার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। গরমের দিনে শরীর ঠান্ডা রাখা, প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়া কিংবা মানসিক চাপ কমানোর জন্য অনেকেই বেছে নিচ্ছেন খোলা পানিতে সাঁতার। তবে এই আনন্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশেষ করে ভারী বৃষ্টির পর নদী বা জলাশয়ের পানিতে জীবাণু, পয়োনিষ্কাশনের বর্জ্য, পশুর মলমূত্র ও ক্ষতিকর শৈবালের উপস্থিতি বেড়ে যেতে পারে।
বৃষ্টির পর পানিতে বাড়ে জীবাণুর ঝুঁকি
সারাক্ষণ রিপোর্টের পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভারী বৃষ্টির পর শহরের নদীগুলোতে পানির মান দ্রুত খারাপ হতে পারে। অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও নর্দমাকে চাপে ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে পয়োনিষ্কাশনের বর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়ে মিশে যায়। একই সঙ্গে কৃষিজমি থেকে পশুর মলমূত্র, মাটি ও নানা দূষিত পদার্থও পানিতে চলে আসে।
এ কারণে বৃষ্টির পর অন্তত কয়েক দিন নদী বা জলাশয়ে সাঁতার না কাটাই তুলনামূলক নিরাপদ। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভারী বৃষ্টির পর ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত অনেক নদীর পানি জীবাণুর দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ থাকতে পারে।

পানি গিলে ফেললে বাড়ে অসুস্থতার আশঙ্কা
খোলা পানিতে সাঁতারের সময় সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো দূষিত পানি শরীরে ঢুকে যাওয়া। বিশেষ করে পানি গিলে ফেললে পেটের সংক্রমণ, ডায়রিয়া ও পেটব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে। সাঁতারের সময় তারা তুলনামূলক বেশি পানি গিলে ফেলে। ফলে দূষিত পানিতে থাকা জীবাণু সহজেই শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে নদী বা জলাশয়ের পানিতে ইঁদুর ও গবাদিপশুর মূত্রের মাধ্যমে ছড়ানো জীবাণুও থাকতে পারে। এর ফলে গুরুতর সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বর, কাঁপুনি, মাথাব্যথা কিংবা সাঁতারের পর অস্বাভাবিক অসুস্থতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সবুজ পানি দেখলেই সতর্ক হতে হবে
শুধু পয়োনিষ্কাশনের বর্জ্যই নয়, উষ্ণ ও ধীরগতির পানিতে ক্ষতিকর নীল-সবুজ শৈবালও জন্মাতে পারে। এসব শৈবাল থেকে বিষাক্ত পদার্থ তৈরি হতে পারে, যা চোখ ও ত্বকে জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে। বিরল ক্ষেত্রে তা যকৃত বা স্নায়ুতন্ত্রেও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।

পানির রং যদি অস্বাভাবিক সবুজ বা নীলচে-সবুজ হয়, পানির ওপর সবুজ আস্তরণ বা ফেনা জমে থাকে কিংবা পানিকে দেখতে ঘন সবুজ রঙের মতো লাগে, তাহলে সেখানে সাঁতার না কাটাই ভালো। পানিতে ভাসমান মাছ মরে থাকতে দেখলেও সতর্ক হওয়া দরকার।
শুধু পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করলেই হবে না
অনেকেই মনে করেন, কোনো নদী বা জলাশয়ের পানির মান পরীক্ষায় ভালো পাওয়া গেলে সেখানে সাঁতার কাটা নিরাপদ। কিন্তু বাস্তবে পানির দূষণ আবহাওয়া ও স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত বদলে যেতে পারে।
নিয়মিত পানির নমুনা পরীক্ষায় সাধারণত কিছু নির্দিষ্ট জীবাণুর উপস্থিতি যাচাই করা হয়। কিন্তু ভারী বৃষ্টির পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যে দূষণ তৈরি হয়, তা সবসময় সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষার ফলাফলে ধরা পড়ে না। ফলে আগের দিনের ভালো পরীক্ষার ফল পরের দিনের পানির নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না।
কোথায় সাঁতার কাটবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ
পয়োনিষ্কাশনের মুখ, নৌযান চলাচলের ঘাট, পশুপালনের এলাকা কিংবা কৃষিজমির কাছাকাছি পানিতে দূষণের আশঙ্কা বেশি থাকতে পারে। তাই এসব স্থান থেকে দূরে তুলনামূলক পরিষ্কার ও নিরাপদ জায়গা বেছে নেওয়া উচিত।

সাঁতার কাটার আগে পানির গন্ধ, রং ও ওপরের স্তর ভালোভাবে দেখা দরকার। পচা বা রাসায়নিকের মতো গন্ধ, ঘোলা বা বাদামি পানি, অস্বাভাবিক ফেনা কিংবা সবুজ আস্তরণ দেখা গেলে পানিতে না নামাই ভালো।
আনন্দের সঙ্গে চাই সতর্কতাও
খোলা পানিতে সাঁতার মানসিক প্রশান্তি দিতে পারে এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যোগাযোগও বাড়ায়। কিন্তু আনন্দের সঙ্গে সতর্কতা না থাকলে এই অভিজ্ঞতা অসুস্থতার কারণ হতে পারে।
সাঁতারের সময় পানি যতটা সম্ভব না গেলা, শরীরের কাটা বা ক্ষতস্থান ঢেকে রাখা এবং সাঁতার শেষে পরিষ্কার পানিতে গোসল করা জরুরি। শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি নজরদারি প্রয়োজন। ঠান্ডা পানি, তীব্র স্রোত এবং একা সাঁতার কাটার ঝুঁকিও মাথায় রাখতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আবহাওয়া ও পানির বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করা। ভারী বৃষ্টির পর কয়েক দিন অপেক্ষা করা এবং পানিতে নামার আগে চোখে দেখা লক্ষণগুলো যাচাই করা নিরাপদ সাঁতারের জন্য বড় ভূমিকা রাখতে পারে। প্রকৃতির পানিতে আনন্দ নেওয়া বন্ধ করার প্রয়োজন নেই, তবে সেই আনন্দের সঙ্গে সচেতনতা থাকাটাই সবচেয়ে জরুরি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















