আসামে ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিবসাগর, চরাইদেও ও যোরহাট জেলার মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক প্যাকেজের দাবি জানিয়েছে আসাম ছাত্র ইউনিয়ন। সংগঠনটির মতে, সাধারণ ত্রাণ ও ক্ষতিপূরণ দিয়ে এই বিপর্যয়ের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও জীবিকা পুনর্গঠনে প্রয়োজন বিশেষ পরিকল্পনা।
আসাম সরকারের কাছে দেওয়া এক স্মারকলিপিতে সংগঠনটি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য আর্থিক সহায়তা, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সহায়তা, কর ছাড়, ঋণের কিস্তি পরিশোধে ছাড় এবং বন্যার কারণ অনুসন্ধানে বৈজ্ঞানিক তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
ঘরবাড়ি থেকে কৃষি—বিস্তর ক্ষয়ক্ষতি
ছাত্র সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন, এবারের বন্যায় তিন জেলায় ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, গবাদিপশু, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর ফলে বহু মানুষের আয়-রোজগারের পথও বন্ধ হয়ে গেছে।
তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ও পরিকল্পিত পুনর্বাসন কার্যক্রমের সঙ্গে বিশেষ অর্থনৈতিক সহায়তা না দেওয়া হলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার অর্থনীতি স্বাভাবিক হতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
সরকারের উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতার প্রশংসা করলেও সংগঠনটি বলেছে, উদ্ধার, ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তা আরও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে গবাদিপশু রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে তারা। বন্যাকবলিত এলাকায় সংগঠনটির নিজস্ব ত্রাণ কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
বন্যায় নষ্ট নথি বিনামূল্যে পুনরুদ্ধারের দাবি
বন্যায় অনেক শিক্ষার্থীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও শিক্ষাগত নথি নষ্ট হয়েছে। এসব নথি বিনামূল্যে পুনরায় পাওয়ার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছে ছাত্র সংগঠনটি।
জন্মনিবন্ধন, স্থায়ী বাসিন্দার সনদ, জাতিগত পরিচয় ও আয়সংক্রান্ত সনদসহ প্রয়োজনীয় সরকারি কাগজপত্র পুনরায় দেওয়ার জন্য আলাদা অনলাইন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে শিক্ষার্থীদের নষ্ট হয়ে যাওয়া সনদ, নম্বরপত্রসহ অন্যান্য শিক্ষাগত নথির অনুলিপি বিনামূল্যে দেওয়ার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে পৃথক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
![]()
বন্যাকবলিত শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খরচ বহনের দাবি
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের চলমান শিক্ষাজীবনের বাকি সময়ের একাডেমিক খরচ সরকারকে বহনের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। যেসব শিক্ষার্থী আগে ফি মওকুফের সুবিধার আওতায় ছিল না, তাদেরও এই সুবিধার অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংগঠনটির মতে, বন্যার কারণে কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিত নয়। তাই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ওপর শিক্ষার বাড়তি আর্থিক চাপ কমাতে সরকারি উদ্যোগ জরুরি।
ঋণের কিস্তি ও কর ছাড়ের প্রস্তাব
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের যানবাহন, কৃষিযন্ত্র, মোটরসাইকেল ও ব্যবসায়িক ঋণের কিস্তি পরিশোধে সাময়িক ছাড় দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এসব ঋণের কিস্তির বোঝা সরকার বহন করার ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঁচ বছরের জন্য ভূমি রাজস্ব, পৌর কর ও অন্যান্য স্থানীয় কর মওকুফের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
ক্ষয়ক্ষতি অনুযায়ী বাড়ি পুনর্নির্মাণে সহায়তা

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ ও মেরামতে প্রচলিত নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণের বদলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি যাচাই করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার দাবি উঠেছে।
পাশাপাশি কৃষি, উদ্যানচাষ, পশুপালন ও স্বনির্ভর কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে আলাদা জীবিকা ও কর্মসংস্থান প্যাকেজ চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দ্রুত আয়-রোজগারে ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বন্যার কারণ অনুসন্ধানে বিশেষজ্ঞ কমিটির দাবি
বন্যার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের অনুসন্ধান কমিটি গঠনের দাবিও জানানো হয়েছে। জলসম্পদ ও পরিবেশবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি গুয়াহাটি আইআইটি, গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়, ডিব্রুগড় বিশ্ববিদ্যালয় ও তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের এতে যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সংগঠনটির মতে, শুধু ত্রাণ দিয়ে প্রতি বছর বন্যার ক্ষতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। বন্যার কারণ চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধানের পথ বের করতে হবে।
সাময়িক ত্রাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন
আসাম ছাত্র ইউনিয়ন বলেছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ কেবল সাময়িক ত্রাণ চান না; তারা সম্মানজনকভাবে নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ চান। তাই ক্ষতিগ্রস্ত তিন জেলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন নীতি গ্রহণ করে ঘরবাড়ি, শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা ও কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















