ব্রিটিশ কৌতুকশিল্পী, উপস্থাপক ও প্রকৃতিপ্রেমী বিল অডি ৮৫ বছর বয়সে মারা গেছেন। হাস্যরসের জগতে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি পাখি দেখা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে দীর্ঘদিনের কাজের জন্যও তিনি মানুষের মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিলেন। জীবনের এক পর্যায়ে তীব্র বিষণ্নতা ও মানসিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করেও প্রকৃতি তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল স্বস্তি ও আশ্রয়ের জায়গা।
কৌতুক থেকে প্রকৃতির জগতে
১৯৪১ সালের ৭ জুলাই ল্যাঙ্কাশায়ারে জন্ম বিল অডির। ছোটবেলা থেকেই পাখি দেখার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। কেমব্রিজে ইংরেজি সাহিত্য পড়ার সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্য ও কৌতুকচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে বিনোদন জগতে তাঁর পথচলা শুরু।
গ্রায়েম গার্ডেন ও টিম ব্রুক-টেলরের সঙ্গে মিলে তিনি তৈরি করেন জনপ্রিয় কৌতুক অনুষ্ঠান ‘দ্য গুডিজ’। সত্তরের দশকে অনুষ্ঠানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। অদ্ভুত পরিস্থিতি, ব্যঙ্গ ও হাস্যরসের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেন বিল অডি।

পাখি দেখার শখ থেকে জনপ্রিয় উপস্থাপক
কৌতুকশিল্পী হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পরও পাখি ও প্রকৃতির প্রতি তাঁর ভালোবাসা কখনো কমেনি। বরং সময়ের সঙ্গে তিনি প্রকৃতি বিষয়ক অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় আরও বেশি মন দেন।
পাখি দেখা নিয়ে তাঁর সহজ ও রসিক উপস্থাপনা সাধারণ দর্শকের কাছেও বিষয়টিকে আকর্ষণীয় করে তোলে। নতুন শতাব্দীর শুরুতে তিনি ব্রিটেনের অন্যতম জনপ্রিয় প্রকৃতি বিষয়ক অনুষ্ঠান উপস্থাপকে পরিণত হন। তাঁর উপস্থাপনায় পাখি ও বন্যপ্রাণী নিয়ে অনুষ্ঠান নতুন প্রজন্মের কাছেও জনপ্রিয়তা পায়।
‘স্প্রিংওয়াচ’ থেকে নতুন পরিচিতি
বিল অডির কর্মজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ছিল ‘স্প্রিংওয়াচ’। প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী নিয়ে অনুষ্ঠানটির মাধ্যমে তিনি ঘরে ঘরে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠানটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হয়।
এরপরও প্রকৃতি সংরক্ষণে তাঁর ভূমিকা থেমে থাকেনি। অবৈধভাবে হাতির দাঁত বেচাকেনার বিরুদ্ধে প্রচারণাসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কার্যক্রমে তিনি নিজের পরিচিতি ও জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগান।
মানসিক সংকটের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই
বিল অডির জীবনের আরেকটি কঠিন দিক ছিল মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম। তিনি তীব্র বিষণ্নতায় ভুগেছেন এবং একাধিকবার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর মধ্যে দ্বিমেরু মানসিক ব্যাধিরও নির্ণয় করা হয়।
মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসার সময় ওষুধজনিত বিষক্রিয়ায় তিনি গুরুতর অসুস্থও হয়ে পড়েছিলেন। জীবনের কঠিন সময়গুলো নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। তাঁর এই অভিজ্ঞতা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতেও ভূমিকা রাখে।
প্রকৃতিই ছিল তাঁর আশ্রয়
বিল অডির জীবনে সাফল্যের ক্ষেত্র ছিল অনেক। কৌতুক, অভিনয়, সংগীত, উপস্থাপনা ও লেখালেখি—সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের ছাপ রেখেছেন। তবে জীবনের শেষদিকে প্রকৃতি সংরক্ষণের কাজই তাঁকে সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি দিয়েছে।
পাখি ও বন্যপ্রাণীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা শুধু ব্যক্তিগত শখে সীমাবদ্ধ ছিল না। নতুন প্রজন্মের প্রকৃতিপ্রেমী ও সংরক্ষণকর্মীদেরও তিনি উৎসাহিত করেছেন। তাঁর কাজের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে প্রকৃতিকে মানুষের কাছে আনন্দ, কৌতূহল ও দায়িত্বের বিষয় হিসেবে তুলে ধরা।
৮৫ বছরের জীবনে বিল অডি দেখিয়েছেন, মানুষের জীবনে যত কঠিন সময়ই আসুক, ভালোবাসার কোনো একটি জায়গা তাকে আবারও আশার দিকে ফিরিয়ে নিতে পারে। তাঁর ক্ষেত্রে সেই আশ্রয়ের নাম ছিল প্রকৃতি।
প্রকৃতির প্রতি বিল অডির ভালোবাসা এবং বন্যপ্রাণী রক্ষায় তাঁর অবদান দীর্ঘদিন স্মরণ করবে মানুষ।
বিল অডির জীবন ছিল কৌতুক, পাখি, প্রকৃতি ও মানসিক সংকট জয় করে এগিয়ে চলার এক অনন্য গল্প।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















