প্রায় ১৮০ বছর পর আবারও প্রকৃতিতে দেখা মিলেছে বিরল এক ফুলের উদ্ভিদের। দীর্ঘদিন ধরে উদ্ভিদবিজ্ঞানের নথিতে প্রায় হারিয়ে যাওয়া এই উদ্ভিদের সন্ধান পাওয়া গেছে ভারতের আসামের ডিমা হাসাও জেলার জাটিঙ্গা পাহাড়ে।
জীবন্ত অবস্থায় উদ্ভিদটির সন্ধান পাওয়াকে উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে নতুন করে দেখা পাওয়া উদ্ভিদটি এখনই স্বস্তির খবর দিচ্ছে না। কারণ গবেষকদের হিসাবে, এর প্রাকৃতিক আবাসস্থলে মাত্র ৪০টির মতো উদ্ভিদ টিকে আছে।
১৮০ বছর পর আবারও দেখা
সারাক্ষণ রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনবিজ্ঞান ও জীবতথ্যবিজ্ঞান বিভাগের গবেষকেরা ডিমা হাসাও এলাকায় মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের সময় উদ্ভিদটির সন্ধান পান। ঝরনার পাশে আর্দ্র ও ছায়াযুক্ত পাথরের ফাটলে উদ্ভিদগুলো বেড়ে উঠতে দেখা যায়।
উদ্ভিদটির ফুলের রং ফ্যাকাশে সবুজ থেকে সাদাটে। ফুলের ওপর রয়েছে সূক্ষ্ম বেগুনি নকশা। এর বৈশিষ্ট্য ও আবাসস্থল দেখে গবেষকেরা ধারণা করছেন, আর্দ্র ও ছায়াযুক্ত পাথুরে পরিবেশের ওপর উদ্ভিদটির বেঁচে থাকা অনেকটাই নির্ভরশীল।

প্রথম সন্ধান মিলেছিল ১৮৪৫ সালে
এই উদ্ভিদটির প্রথম নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল ১৮৪৫ সালে। সে সময় ব্রিটিশ উদ্ভিদবিদ জে ডব্লিউ মাস্টার্স আসামের সুন্দর নদীর তীরবর্তী কোনো একটি স্থান থেকে এর নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন।
এরপর প্রায় দুই শতাব্দী ধরে জীবন্ত অবস্থায় উদ্ভিদটির আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এমনকি ভারতের বাইরে বিশ্বের অন্য কোথাও এর জীবন্ত অবস্থার কোনো তথ্যও নথিভুক্ত হয়নি।
দীর্ঘদিন ধরে উদ্ভিদটি যেন শুধু পুরোনো একটি সংরক্ষিত নমুনা ও নামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ভারতের উদ্ভিদ জরিপ সংস্থার কাছেও এর একটি সংরক্ষিত নমুনা ছিল। ফলে উদ্ভিদটির প্রকৃত বিস্তৃতি, পরিচয় ও এতদিন কীভাবে টিকে ছিল—এসব বিষয় নিয়ে রহস্য থেকেই গিয়েছিল।
পাহাড়ের নির্দিষ্ট পরিবেশেই টিকে আছে
গবেষকেরা জানিয়েছেন, উদ্ভিদটি অ্যাকান্থাসি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত একটি গুল্মজাতীয় ভেষজ উদ্ভিদ। এর উচ্চতা প্রায় ৬০ থেকে ১১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
প্রায় ৯০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ মিটার উচ্চতার এলাকায় এর সন্ধান পাওয়া গেছে। ঝরনার কাছের ভেজা, ছায়াযুক্ত পাথুরে জায়গাই এর প্রধান আবাসস্থল বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
তবে এই নির্দিষ্ট পরিবেশই এখন উদ্ভিদটির জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ আবাসস্থল খুব সীমিত হওয়ায় পরিবেশে সামান্য পরিবর্তন হলেও এর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে।

মাত্র ৪০টি উদ্ভিদ, বাড়ছে বিলুপ্তির শঙ্কা
গবেষকদের অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত মাত্র একটি প্রাকৃতিক আবাসস্থল শনাক্ত হয়েছে। সেখানে প্রায় ৪০টি উদ্ভিদ পাওয়া গেছে।
ঝরনার পানিপ্রবাহে পরিবর্তন, আবাসস্থল নষ্ট হওয়া, পাহাড়ধস, বন উজাড় এবং মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে উদ্ভিদটির সংখ্যা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার লাল তালিকার নির্দেশনা অনুযায়ী উদ্ভিদটির সংরক্ষণগত অবস্থান এখনো মূল্যায়ন করা হয়নি। তবে মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ বলছে, এর সংরক্ষণ পরিস্থিতি দ্রুত মূল্যায়ন করা জরুরি।
হারিয়ে যাওয়ার আগেই সংরক্ষণের আহ্বান
প্রায় দুই শতাব্দী মানুষের চোখের আড়ালে থাকার পর উদ্ভিদটির পুনরাবিষ্কার গবেষকদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। এবার জীবন্ত অবস্থায় উদ্ভিদটির স্বাভাবিক পরিবেশ, বৃদ্ধি, প্রজনন ও পরিবেশগত গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে গবেষকদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেওয়া না হলে প্রায় ১৮০ বছর অদৃশ্য থেকে টিকে থাকা এই বিরল উদ্ভিদটি আবারও হারিয়ে যেতে পারে। প্রকৃতিতে এর গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝার আগেই এমন ঘটনা ঘটলে তা হবে উদ্ভিদবৈচিত্র্যের জন্য বড় ক্ষতি।
১৮০ বছর পর জাটিঙ্গা পাহাড়ে এই উদ্ভিদের ফিরে আসা তাই শুধু একটি বিরল উদ্ভিদ পুনরাবিষ্কারের ঘটনা নয়, বরং পাহাড়ি জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আরও সতর্ক হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















