বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষ হয়েছে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে। কিন্তু আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেইর কাছে যেন টুর্নামেন্টের উত্তাপ এখনো শেষ হয়নি। তিনি দাবি করেছেন, বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও দেশটির জাতীয় দলের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত প্রচারণা চালানো হয়েছে। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট দল, ব্রাজিল ও মেক্সিকোর সরকারের অর্থায়ন ছিল বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
মাইলেইর অভিযোগের পরিধি বাড়ছে
মাইলেইর দাবি, আর্জেন্টিনার ফুটবলার ও সমর্থকদের নিয়ে বর্ণবাদী অভিযোগ, দলকে বিশ্ব ফুটবল সংস্থা গোপনে সুবিধা দিচ্ছে—এমন নানা ষড়যন্ত্রের গল্প এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা সবকিছুই একটি বৃহত্তর ‘আর্জেন্টিনা-বিরোধী প্রচারণা’র অংশ।
রোববার স্থানীয় একটি বেতার অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, স্বাধীনতার ধারণাকে এগিয়ে যেতে দিতে চান না—এমন প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তিরাই এই প্রচারণার সঙ্গে জড়িত।
মাইলেই বিশেষভাবে ব্রাজিলের সরকারকে দায়ী করে দাবি করেন, কথিত প্রচারণায় সবচেয়ে বড় অঙ্কের অর্থ এসেছে ব্রাজিল থেকে। পরে মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট দলকেও একই অভিযোগের আওতায় আনেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্ণবাদ নিয়ে বিতর্ক

বিশ্বকাপ চলাকালে আর্জেন্টিনার কিছু সমর্থকের বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগ ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ফাইনালের আগে মার্কিন অভিনেতা স্যামুয়েল এল জ্যাকসনও আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেন।
এ নিয়ে আর্জেন্টিনার মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। দেশটিতে বর্ণবাদের অস্তিত্ব স্বীকার করলেও একটি পুরো দেশকে বর্ণবাদের একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে বিচার করার সমালোচনা করা হয়।
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট অবশ্য এসব সমালোচনার জন্য দেশের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দায়ী করেছেন। তার অভিযোগ, বিরোধীরা এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সমর্থন করেছে, যার মাধ্যমে এখন আর্জেন্টিনাকে বর্ণবাদী হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
ব্রাজিলকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক উত্তেজনা
মাইলেইর অভিযোগের সময়েই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে। শনিবার ব্রাজিলে ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোর নির্বাচনী প্রচারণার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট।
সেখানে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন তিনি। একই বক্তব্যে মাইলেই দাবি করেন, বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-বিরোধী কথিত প্রচারণার সবচেয়ে বেশি আক্রমণ এসেছে ব্রাজিল থেকে।
পরদিন নিজের অভিযোগ আরও বিস্তৃত করে মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট দলকেও এর সঙ্গে যুক্ত করেন তিনি।

বড় ধরনের সমন্বিত প্রচারণার প্রমাণ মেলেনি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে গবেষণা করা ডিজিটাল নৃবিজ্ঞানী মার্সেদেস মাসপেরো ২০ লাখের বেশি পোস্ট বিশ্লেষণ করেছেন। তার পর্যবেক্ষণে বিভিন্ন ভাষায় একই ধরনের কিছু বাক্য ও বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। তবে এগুলোকে নিশ্চিতভাবে একটি সমন্বিত প্রচারণা বলা কঠিন বলেও তিনি মনে করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক প্রবণতা নিয়ে গবেষণা করা নাতালিয়া আরুগেতেরও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ। তার মতে, আর্জেন্টিনাকে ঘিরে ব্যাপক ও বৈশ্বিক বিরূপ আলোচনা থাকলেও বড় আকারের সমন্বিত কোনো অভিযান পরিচালিত হয়েছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, এসব আলোচনায় ব্রাজিলের উপস্থিতি অবশ্যই ছিল, বিশেষ করে বর্ণবাদ নিয়ে বিতর্কে। তবে ব্রাজিল সরকার এতে জড়িত—মাইলেইর এই অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য কোনো প্রমাণ নেই।
অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে নজর সরানোর অভিযোগ
আর্জেন্টিনার কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, মাইলেইর ‘আর্জেন্টিনা-বিরোধী প্রচারণা’র গল্পটি তার সরকারের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে দেওয়ার একটি রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এলেও দেশে বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি নিয়ে নানা অভিযোগ মাইলেই সরকারের জনপ্রিয়তায় চাপ তৈরি করেছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর তার জনপ্রিয়তা বর্তমানে সবচেয়ে নিচের পর্যায়ে রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন।

তাদের মতে, বিদেশি শক্তিকে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে তুলে ধরলে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে আলোচনার পরিবর্তে জনগণের মনোযোগ বাইরের শত্রুর দিকে সরানো সম্ভব।
পুরোনো ইতিহাসও ফিরছে আলোচনায়
মাইলেইর অভিযোগকে ঘিরে আর্জেন্টিনার অতীতের একটি বিতর্কও সামনে এসেছে। ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনায় বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় দেশটির সামরিক শাসকগোষ্ঠী মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনাকে ‘আর্জেন্টিনা-বিরোধী প্রচারণা’ হিসেবে তুলে ধরেছিল।
গবেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচিত্র ও বহুমাত্রিক আলোচনাকে একটি রাজনৈতিক সংঘাতে পরিণত করা হচ্ছে। আর এর মাধ্যমে বামপন্থী শক্তির বিরুদ্ধে মাইলেইর চলমান রাজনৈতিক লড়াইকে আরও জোরালো করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বিশ্বকাপ শেষ হলেও আর্জেন্টিনাকে ঘিরে এই রাজনৈতিক বিতর্ক এখনো থামেনি। তবে মাইলেইর অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের সমন্বিত বিদেশি অর্থায়ন বা পরিকল্পিত প্রচারণার নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিশ্বকাপ, আর্জেন্টিনা, হাভিয়ের মাইলেই, আর্জেন্টিনা-বিরোধী প্রচারণা ও ব্রাজিলকে ঘিরে নতুন এই বিতর্ক দক্ষিণ আমেরিকার রাজনীতিতেও নতুন উত্তাপ তৈরি করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















