পাকিস্তানের সরকারি হাসপাতালগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে ভেন্টিলেটরের সংকট চলছে। গুরুতর রোগীদের জীবন বাঁচাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই যন্ত্রের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসকদের সামনে তৈরি হচ্ছে বড় বাধা। একই সঙ্গে প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ভেন্টিলেটর না পেয়ে রোগীর মৃত্যু
ইসলামাবাদের পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসে সম্প্রতি ভেন্টিলেটর না পাওয়ায় এক সাংবাদিকের মৃত্যু পরিস্থিতির ভয়াবহতা সামনে এনেছে। স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর আবিদ রাজা কাজমিকে প্রথমে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। পরে তাকে মেডিকেল ও সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা তাকে ভেন্টিলেটরে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা কোনো ভেন্টিলেটরই তখন খালি ছিল না। স্বজনেরা বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
)
হাসপাতালটিতে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় নিবিড় পরিচর্যার সরঞ্জাম কম থাকায় ভেন্টিলেটরের অভাবে গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
দুই দশকেও কাটেনি সংকট
ভেন্টিলেটর এমন একটি চিকিৎসা যন্ত্র, যা রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস চালু রাখতে সহায়তা করে। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে এটি জীবন রক্ষার শেষ ভরসাগুলোর একটি। বিশেষ করে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে এর প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।
পাকিস্তানে গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ভেন্টিলেটরের সংকট রয়েছে। সাবেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরীর মতে, দেশে উচ্চমানের ভেন্টিলেটর তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা পরে আর এগোয়নি।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় দেশে ভেন্টিলেটর তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তখন তুলনামূলক সহজ ধরনের কিছু ভেন্টিলেটর তৈরি হলেও গুরুতর রোগীদের বড় অংশের প্রয়োজন মেটানোর মতো উন্নত যন্ত্র দেশে তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
ফাওয়াদ চৌধুরী মনে করেন, এ ক্ষেত্রে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ভেন্টিলেটর তৈরির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
শুধু যন্ত্র কিনলেই সমাধান নয়
ভেন্টিলেটরের দামও হাসপাতালগুলোর জন্য বড় চাপ। একটি উন্নত মানের ভেন্টিলেটর কিনতে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ লাখ পাকিস্তানি রুপি পর্যন্ত খরচ হতে পারে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মতে, সমস্যা শুধু যন্ত্র কেনার অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ডা. রানা ইমরান সিকান্দারের ভাষ্য অনুযায়ী, ভেন্টিলেটর পরিচালনার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন। জনবল সংকট থাকায় নতুন যন্ত্র পাওয়া গেলেও তা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন।
তিনি জানান, হাসপাতালটির বিভিন্ন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ৯০টির বেশি ভেন্টিলেটর রয়েছে। কিন্তু প্রায় সব সময়ই সেগুলো রোগীতে পূর্ণ থাকে। কিছু বিভাগে একজন রোগী ভেন্টিলেটরে ওঠার পর প্রায় ২০ দিন পর্যন্ত সেখানে থাকতে পারেন।
বাড়ছে রোগীর চাপ
ইসলামাবাদের জনসংখ্যা হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার সময়ের তুলনায় অনেক বেড়েছে। প্রতিষ্ঠার সময় শহরটির জনসংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখ। বর্তমানে তা প্রায় ৫০ লাখে পৌঁছেছে।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গুরুতর রোগীদের ওই হাসপাতালে পাঠানো হয়। রোগী ফিরিয়ে না দেওয়ার নীতির কারণে শয্যা না থাকলেও অনেক সময় স্ট্রেচারে রোগী রেখে চিকিৎসা চালাতে হয়। ফলে ভেন্টিলেটরের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
নতুন একটি ভবনে ৪০টি ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য শুধু অবকাঠামো বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং হাসপাতালের সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।
বেসরকারি হাসপাতালে খরচ বেশি
সরকারি হাসপাতালগুলোর ভেন্টিলেটর সংকটের আরেকটি কারণ হিসেবে বেসরকারি চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়ও সামনে এসেছে। অনেক বেসরকারি হাসপাতালে ভেন্টিলেটরে থাকা রোগীর জন্য প্রতিদিন বিপুল অর্থ নেওয়া হয়। ফলে আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান পরিবারও কখনো কখনো সরকারি হাসপাতালে রোগী স্থানান্তরের চেষ্টা করে।

ইসলামাবাদের পলিক্লিনিকের এক কর্মকর্তা জানান, হাসপাতালটিতে বিভিন্ন বিভাগে ৩৫টি ভেন্টিলেটর রয়েছে। কিন্তু সেগুলোও প্রায় সব সময় ব্যবহৃত হয়। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল না থাকায় নতুন ভেন্টিলেটর এলেও সংকট পুরোপুরি দূর হবে না বলে তিনি মনে করেন।
প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির সময় পাকিস্তানের রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে ভেন্টিলেটর ও শয্যার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল। তখন বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারকে অতিরিক্ত শয্যা, আইসোলেশন কক্ষ ও ভেন্টিলেটর দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল।
তবে স্বাভাবিক সময়ে এ ধরনের সহযোগিতা খুব বেশি দেখা যায় না। ফলে হাসপাতালগুলোর নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেন্টিলেটর সংকট কাটাতে দেশে উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি, সরকারি হাসপাতালের বাজেট বৃদ্ধি এবং নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র সম্প্রসারণের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় গুরুতর রোগীদের জন্য ভেন্টিলেটর না পাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
ভেন্টিলেটর সংকট শুধু একটি যন্ত্রের ঘাটতি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাসপাতালের অবকাঠামো, অর্থায়ন, দক্ষ জনবল ও রোগীর ক্রমবর্ধমান চাপ। তাই এই সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















