সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। শিকারি চক্র, জলবায়ু পরিবর্তন, বনভূমির ক্ষয়, অবৈধ কর্মকাণ্ডসহ নানা সংকটের মধ্যেও গত এক দশকে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধিকে সংরক্ষণ উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই অগ্রগতি ধরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এক দশকে বেড়েছে ১৯টি বাঘ
বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা নির্ধারণে ২০১৫ সাল থেকে ক্যামেরা ফাঁদ ব্যবহার করে গণনা শুরু হয়। এর আগে বাঘের পায়ের ছাপ দেখে সংখ্যা নির্ধারণের পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো।
২০১৫ সালের জরিপে সুন্দরবনে ১০৬টি বাঘের উপস্থিতি পাওয়া যায়। ২০১৮ সালের জরিপে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪টিতে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত জরিপে বাঘের সংখ্যা পাওয়া গেছে ১২৫টি।
অর্থাৎ প্রায় এক দশকে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে ১৯টি। প্রতিটি জরিপেই বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাওয়ায় সংরক্ষণ কার্যক্রম নিয়ে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে।
বনে বাড়ছে বাঘের আনাগোনা

সুন্দরবনে নিয়মিত কাজ করা বনকর্মী ও বননির্ভর মানুষেরাও বাঘের চলাচল বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি লক্ষ্য করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বনের বিভিন্ন এলাকায় একসঙ্গে দুটি বাঘ দেখা যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। কখনো তিনটি বাঘকেও একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে।
সম্প্রতি অন্ধারমানিক পর্যটনকেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায় একটি বাঘকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। একই এলাকায় নতুন করে বসানো ২০টি ক্যামেরা ফাঁদে এক সপ্তাহের মধ্যে তিনটি বাঘের উপস্থিতিও ধরা পড়ে।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আশপাশের লোকালয়ে বাঘ ঢুকে পড়ার ঘটনাও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে মানুষ ও বাঘের সংঘাত কমিয়ে আনার ক্ষেত্রেও কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে।
ফাঁদে আটকা বাঘিনীকে উদ্ধার
চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি সুন্দরবনের ভেতরে শিকারিদের পাতানো ফাঁদে আটকা পড়া একটি বাঘিনীকে উদ্ধার করেন বনকর্মীরা। প্রায় ১০ বছর বয়সী বাঘিনীটি কয়েক দিন ফাঁদে আটকে থাকায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল।
দীর্ঘ কয়েক মাস চিকিৎসা ও পরিচর্যার পর গত ১২ জুলাই তাকে আবার সুন্দরবনের বনে ছেড়ে দেওয়া হয়। বন্যপ্রাণী রক্ষায় এমন উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম বাঘ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বাঘ বাড়লেও মৃত্যুর হিসাব উদ্বেগজনক
বাঘের সংখ্যা বাড়লেও সুন্দরবনে বাঘের মৃত্যু এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়। ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনে ৬১টি বাঘ মারা গেছে।
এর মধ্যে ২৬টি বাঘ অপরাধীদের হাতে নিহত হয়েছে। লোকালয়ে ঢুকে মানুষের হামলায় মারা গেছে ১৪টি। প্রাকৃতিক কারণে মৃত্যু হয়েছে ১৯টির। ঘূর্ণিঝড় সিডরসহ বিভিন্ন ঘটনায় আরও দুটি বাঘ মারা গেছে।
একই সময়ে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বাঘের চামড়া ও কঙ্কালও উদ্ধার করা হয়েছে। এতে অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্যের ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি বলে আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে কমছে বাঘ, সুন্দরবনে আশার খবর
এক শতাব্দী আগে বিশ্বে বন্য বাঘের সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ। বর্তমানে তা নেমে এসেছে আনুমানিক ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০টির মধ্যে। এরই মধ্যে বালি, জাভা ও ক্যাস্পিয়ান—এই তিন ধরনের বাঘ পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
বর্তমানে মাত্র ১০টি দেশে বন্য বাঘের অস্তিত্ব রয়েছে। বাংলাদেশও সেই তালিকায় রয়েছে। বন উজাড়, বাঘ শিকার, অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বাঘের অস্তিত্ব হুমকির মুখে।
এই পরিস্থিতিতে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়ার খবর সংরক্ষণকর্মীদের জন্য বিশেষ আশার বিষয় হয়ে উঠেছে।
শিকার ঠেকাতে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি

সুন্দরবনে বাঘ ও হরিণ শিকার ঠেকাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে। বনরক্ষীরা নিয়মিত পায়ে হেঁটে টহল দেওয়ার পাশাপাশি নজরদারির কাজে আকাশপথের যন্ত্রও ব্যবহার করছেন।
গত এক বছরে বাঘ ও হরিণ শিকারের জন্য পেতে রাখা বিপুলসংখ্যক ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। হরিণ শিকারের সঙ্গে জড়িত ৭০ জনকে আটক করা হয়েছে। সন্দেহভাজন আরও ১৫০ জন শিকারির তালিকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে দেওয়া হয়েছে।
নিয়মিত অভিযানের কারণে শিকারিদের তৎপরতা কমেছে বলে মনে করছেন বন কর্মকর্তারা। এতে বনের ভেতরে বাঘের স্বাভাবিক চলাচলও বেড়েছে।
বনের পথ, খাল, পুকুর ও বন বিভাগের কার্যালয়ের আশপাশেও এখন বাঘের দেখা মিলছে। পর্যটকরাও সুন্দরবন ভ্রমণে বাঘ দেখার সুযোগ পাচ্ছেন।
বাঘের চলাচলের পথ রক্ষা জরুরি
সুন্দরবননির্ভর মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাতেও বাঘের উপস্থিতি বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রায় পাঁচ দশক ধরে সুন্দরবনের সঙ্গে যুক্ত থাকা বননির্ভর মানুষরা বলছেন, আগের তুলনায় বাঘের চলাচল এখন বেশি চোখে পড়ছে।
তবে বাঘের চলাচলের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হলে ভবিষ্যতে তাদের প্রজনন ব্যাহত হতে পারে। তাই বাঘের প্রজননক্ষেত্র ও চলাচলের পথ সুরক্ষিত রাখা জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তন বড় হুমকি

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের বাঘ এখনো নানা ধরনের হুমকির মধ্যে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, শিকার, মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত বিষপ্রয়োগ, বনের ভেতরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং মানুষের বাড়তি চাপ সুন্দরবনের পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলছে।
সুন্দরবনের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল। ফলে বনজ সম্পদের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় মানুষকে সংরক্ষণ কার্যক্রমে আরও বেশি যুক্ত করা প্রয়োজন।
বন বিভাগের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
নদী-খাল সচল রাখার তাগিদ
সুন্দরবনের ভেতরের অনেক নদী ও খাল পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এতে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে এই জলপথগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
![]()
দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার আওতায় নিয়মিত খননের মাধ্যমে নদী ও খালগুলো সচল না করা গেলে পুরো সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য হুমকিতে পড়তে পারে।
আর সুন্দরবন দুর্বল হয়ে পড়লে বাংলাদেশে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র প্রাকৃতিক আবাসস্থলও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বাঘ সংরক্ষণে নতুন আশার আলো
বিশ্ব বাঘ দিবসে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির এই খবর তাই নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। একদিকে বাঘের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে শিকার ও মানব-বাঘ সংঘাত কমানোর উদ্যোগও কিছুটা ফল দিচ্ছে।
তবে এই সাফল্যকে স্থায়ী করতে হলে শুধু অভিযান নয়, সুন্দরবনের পরিবেশ, বাঘের প্রজননক্ষেত্র, চলাচলের পথ, নদী-খাল এবং বননির্ভর মানুষের জীবন—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
সঠিক সংরক্ষণ উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে—এমন প্রত্যাশাই এখন সংশ্লিষ্টদের।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















