টানা মৌসুমি বৃষ্টিতে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ বন্যায় তলিয়ে গেছে। পানিতে ডুবে গেছে গ্রামের পর গ্রাম। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। এমন পরিস্থিতিতে অনেক বাসিন্দাকে নৌকায় করে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যেতে হচ্ছে।
মুরিদকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় স্বেচ্ছাসেবকেরা ছোট মোটরচালিত নৌকা নিয়ে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন। তবে দুর্গত বহু মানুষ এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। অনেকে অভিযোগ করেছেন, কয়েক দিন ধরে অপেক্ষা করেও সরকারি উদ্ধারকারী দলের দেখা পাননি তারা।
চার দিন ধরে পানিবন্দি পরিবার
মুরিদকে জেলার বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী ইকরা সালমান জানান, চার দিন ধরে তারা পানির মধ্যে আটকে আছেন। এখনো কোনো উদ্ধারকারী দল তাদের কাছে পৌঁছায়নি।
তিনি বলেন, এলাকায় বিদ্যুৎ নেই, নিরাপদ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ঘরে থাকা খাবারও শেষ হয়ে গেছে। চারদিক থেকে বন্যার পানি ঘিরে থাকায় স্বাভাবিক জীবন পুরোপুরি থমকে গেছে।

দুর্গত এলাকায় স্বেচ্ছাসেবকেরা প্রায় এক ডজন গ্রামের মানুষকে উদ্ধারের পাশাপাশি ঘরবাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কয়েকটি নৌকা নিয়মিত পানিবন্দি মানুষকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাচ্ছে।
বন্যায় প্রাণহানি বেড়ে ১০৯
পাকিস্তানে গত ২৬ জুন থেকে বন্যাসহ বিভিন্ন দুর্যোগে অন্তত ১০৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। পানিতে ডুবে যাওয়া এবং ঘরবাড়ি ধসে পড়ার মতো ঘটনাও রয়েছে এই প্রাণহানির মধ্যে। নিহতদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই পাঞ্জাবের বাসিন্দা।
তবে দুর্গত মানুষকে উদ্ধার করার পরও তাদের দুর্ভোগ শেষ হচ্ছে না। নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া অনেক পরিবারকে ছোট তাঁবুতে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।
এক রাতেই সব হারালেন রামজান
৪৫ বছর বয়সী মুহাম্মদ রামজান জানান, ভোরের দিকে হঠাৎ করে বন্যার পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পানির স্রোতে তাদের বাড়ি ভেঙে পড়ে।

পানি এত দ্রুত বেড়ে যায় যে পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও বের করে আনার সুযোগ হয়নি। ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারিয়ে এখন তাদের হাতে প্রায় কিছুই নেই।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে ঝুঁকি
পাকিস্তান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। দেশটির বন্যা মোকাবিলা ও জলবায়ুজনিত ক্ষতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতাও সীমিত।
দক্ষিণ এশিয়ায় মৌসুমি বৃষ্টি কৃষির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই বৃষ্টিপাত ক্রমেই অনিয়মিত, অনিশ্চিত ও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ফলে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং প্রাণহানির ঝুঁকিও বাড়ছে।
আফগানিস্তানেও বন্যায় প্রাণহানি

পাকিস্তানের পাশাপাশি প্রতিবেশী আফগানিস্তানেও ভারী বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ২০ থেকে ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে দেশটিতে অন্তত ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। পূর্বাঞ্চলীয় নুরিস্তান প্রদেশে ভয়াবহ বন্যার পর প্রায় ১০০ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে।
এর আগে ২০২২ সালে পাকিস্তানে ভয়াবহ মৌসুমি বন্যায় প্রায় ১ হাজার ৭০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। দেশের বিশাল অংশ পানিতে তলিয়ে গিয়ে ব্যাপক মানবিক সংকট তৈরি হয়েছিল। চলতি বছরের বন্যাও নতুন করে সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
পাকিস্তানের পাঞ্জাবে বন্যার পানি বাড়তে থাকায় এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে পানিবন্দি মানুষকে দ্রুত উদ্ধার, নিরাপদ পানি ও খাবার সরবরাহ এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















