রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক নারী শিক্ষার্থীকে হত্যার হুমকি এবং পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় দ্রুত আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে রাকসু। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ তুলে ছয় দফা দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় হত্যার হুমকির অভিযোগ
রাকসুর সহসভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ জানান, সংস্কৃত বিভাগের প্রথম বর্ষের এক নারী শিক্ষার্থীকে একই বিভাগের জ্যেষ্ঠ এক শিক্ষার্থী বিয়ের প্রস্তাব দেন। ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর তাকে ছুরি দেখিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
রাকসুর লিখিত বক্তব্য অনুযায়ী, গত ২৬ জুলাই ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মুহসিন ওই নারী শিক্ষার্থীকে ছুরি দেখিয়ে পদ্মা নদীতে ফেলে দেওয়ার হুমকি দেন। একই সঙ্গে তার কাছে পিস্তল রয়েছে বলেও ভয় দেখানোর অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ পাওয়ার পর ওই রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষকে ডেকে পাঠায়।
প্রক্টর দপ্তরে উত্তেজনা

রাকসুর অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর অভিভাবক হিসেবে পরিচয় দেওয়া আনাস নামের এক ব্যক্তি তদন্তের সময় সেখানে গিয়ে প্রক্টরের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। পরে তাকে প্রক্টর দপ্তর থেকে বের করে দেওয়া হয়।
এ ঘটনার একটি ভিডিও প্রকাশের পর কয়েকজন সাংবাদিককেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছে রাকসু। সংগঠনটির অভিযোগ, আনাস নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
পরদিন ২৭ জুলাই দুই পক্ষকে আবারও প্রক্টর দপ্তরে ডাকা হয়। রাকসুর দাবি, সেখানে নারী শিক্ষার্থীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। এরপর আনাস আবারও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করেন এবং প্রক্টরিয়াল বডি ও রাকসু নেতাদের সঙ্গে আক্রমণাত্মক আচরণ করেন বলে অভিযোগ করা হয়।
রাকসুর ভাষ্য অনুযায়ী, আনাসের মুঠোফোন প্রক্টরের উপস্থিতিতে পরীক্ষা করার পর তিনি অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করেন। বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলেও তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর না করে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রাকসুর।
রাকসু কার্যালয়ে হামলার অভিযোগ
রাকসুর অভিযোগ, পরে আনাসের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা শাফিন ও তাদের সহযোগীরা রাকসু কার্যালয়ে হামলা চালান। এতে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মার এবং তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নাজমুস সাকিব আহত হন বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।

এরপর আনাস বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে আশ্রয় নেন বলে দাবি করা হয়। খবর পেয়ে রাকসু নেতারা, হল সংসদের প্রতিনিধিসহ শিক্ষার্থীরা সেখানে জড়ো হয়ে তাকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
রাকসুর নেতাদের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে দীর্ঘ সময় কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
ছয় দফা দাবি রাকসুর
ঘটনার পর রাকসু ছয় দফা দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নারী শিক্ষার্থীকে হত্যার হুমকির ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া, রাকসু কার্যালয়ে হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনা এবং প্রশাসনের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তদন্ত করা।
এ ছাড়া ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সহিংসতা ও রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অতীতে দমন-পীড়নের সঙ্গে জড়িত ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।

রাকসু নেতারা বলেছেন, নারী শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংসতা, সন্ত্রাস বা ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে তারা গণতান্ত্রিক ও আইনসম্মত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
হামলা নাকি প্রতিরোধ—রাকসুর বক্তব্য
সংবাদ সম্মেলনে তাৎক্ষণিক বক্তব্যে রাকসুর সহসভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ কিছু গণমাধ্যমে ঘটনাটিকে রাকসু সদস্যদের হামলা হিসেবে উপস্থাপনের সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, রাকসু সদস্যরা হামলা করেননি, বরং পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কয়েকজন সাংবাদিক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছেন। এ ধরনের ভূমিকার জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তিনি বলেন।
রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মার দাবি করেন, কার্যালয়ে হামলার পর অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের জন্য প্রক্টর দপ্তরকে বারবার অনুরোধ করা হলেও প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তার অভিযোগ, এই বিলম্বের কারণেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
রাকসু নেতারা এখন দ্রুত তদন্ত, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















