ঢাকার আগারগাঁও কাঁচাবাজারে বৃহস্পতিবার সকালে হাতে একটি কাপড়ের ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী হায়দার মঈনুল আহসান। বেগুনের দাম শুনে তিনি আর হাত বাড়াননি। বরবটি রেখে দিলেন। কাঁচা মরিচের ২৫০ গ্রাম কিনতেই গুনতে হলো ১০০ টাকা। শেষ পর্যন্ত ব্যাগে উঠল শুধু একটি পেঁপে আর কয়েকটি আলু।
বাজার থেকে বেরিয়ে তিনি বললেন, “আগে মাছ বাদ দিয়েছিলাম, পরে গরুর মাংস। এখন মনে হচ্ছে সবজিও বাদ দিতে হবে।”
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সবচেয়ে বড় সংকটটি সম্ভবত এখানেই। বাজারের মূল্যবৃদ্ধির খবর প্রতিদিন শিরোনাম হয়, কিন্তু মানুষের থালা থেকে যে নীরবে পুষ্টি হারিয়ে যাচ্ছে, সেটি খুব কমই আলোচনায় আসে। অথচ অর্থনীতিবিদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব শুধু বর্তমানের জীবনযাত্রায় নয়—দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনীতির ওপরও পড়ে।
বাজারের আগুন, রান্নাঘরের নীরব সংকট
টানা বর্ষণ, জলাবদ্ধতা ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার অজুহাতে রাজধানীর কাঁচাবাজারে গত দুই সপ্তাহে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা বেড়েছে। অনেক সবজির দাম ১০০ টাকার ওপরে। কাঁচা মরিচ ৩৪০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি, ডিমের ডজন ১৩৫ থেকে ১৪৫ টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, অতিবৃষ্টি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরবরাহ কমেছে। কিন্তু ক্রেতাদের অভিযোগ, দুর্বল বাজার তদারকি এবং সুযোগসন্ধানী মজুতদারির কারণেও দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশে এই দৃশ্য নতুন নয়। প্রতি বর্ষায়, প্রতি বন্যায়, প্রতি সরবরাহ সংকটে বাজারে একই অস্থিরতা ফিরে আসে। কিন্তু এবার পার্থক্য হলো—এই মূল্যবৃদ্ধি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের সঞ্চয় প্রায় শেষ, আয় বাড়েনি, আর পরিবারগুলো আগেই ব্যয় সংকোচন শুরু করেছে।
ক্ষুধা সবসময় খালি পেট নয়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং ইউনিসেফ বহু বছর ধরে একটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে আসছে—ক্ষুধা মানেই শুধু না খেয়ে থাকা নয়। মানুষ পেট ভরে ভাত খেলেও যদি নিয়মিত পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ ও বৈচিত্র্যময় খাদ্য না পায়, তবে সেটিও অপুষ্টি।
বাংলাদেশে আজ ঠিক সেই নীরব পরিবর্তনটি ঘটছে।
অনেক পরিবার এখনও দিনে তিনবেলা খাচ্ছে। কিন্তু তাদের থালা থেকে একে একে হারিয়ে যাচ্ছে ডিম, মাছ, দুধ, শাকসবজি ও ফল। পেট ভরছে, কিন্তু শরীর পুষ্টি পাচ্ছে না।
পুষ্টিবিদরা একে বলেন “Hidden Hunger”—বাংলায়, অদৃশ্য ক্ষুধা।
এই ক্ষুধা চোখে দেখা যায় না। কিন্তু এর প্রভাব পড়ে শিশুর উচ্চতা, মেধা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, শ্রমিকের কর্মক্ষমতা এবং একটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ওপর।

একটি ডিমের দাম, একটি পরিবারের সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশের নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে ডিমকে দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে সাশ্রয়ী প্রাণিজ প্রোটিন হিসেবে ধরা হয়েছে। কিন্তু যখন এক ডজন ডিমের দাম ১৪০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন অনেক পরিবার সিদ্ধান্ত নেয়—আজ ডিম নয়, শুধু ডাল।
একজন রিকশাচালক, একজন পোশাকশ্রমিক কিংবা দিনমজুরের পরিবারে এই সিদ্ধান্ত অর্থনীতির ভাষায় শুধু “ভোক্তা আচরণ” নয়। এটি ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকির শুরু।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি দরিদ্র পরিবারকে প্রথমে পুষ্টিকর খাবার কমাতে বাধ্য করে। ফলে অপুষ্টি বাড়ে, শিশুদের বিকাশ ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদের মান কমে যায়।
পুরুষদের অপুষ্টি—অদেখা সংকট
বাংলাদেশে অপুষ্টির আলোচনায় শিশু ও মায়েরা স্বাভাবিকভাবেই অগ্রাধিকার পান। কিন্তু একটি বড় বাস্তবতা প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়—কর্মক্ষম পুরুষদের পুষ্টি।
রিকশাচালক, কৃষিশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, পরিবহনকর্মী কিংবা কারখানার শ্রমিক—দিনে আট থেকে বারো ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রম করেন। তাদের শরীরের প্রয়োজন পর্যাপ্ত ক্যালোরি, প্রোটিন, আয়রন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান।
কিন্তু যখন মাছ, মাংস, ডিম ও সবজি ক্রমেই নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন অনেকেই শুধু ভাত, আলু কিংবা অল্প ডালের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন।
এর ফল তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। কিন্তু কয়েক মাস বা কয়েক বছরের মধ্যে কর্মক্ষমতা কমে যায়, রোগ বাড়ে, উৎপাদনশীলতা কমে এবং চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে। অর্থনীতির ভাষায়, এটি একটি “Silent Productivity Crisis”।

শিশুদের জন্য দ্বিগুণ বিপদ
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের সংক্রমণ এবং শিশু মৃত্যুর ঘটনা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বিগ্ন করেছে।
WHO এবং UNICEF বহুবার সতর্ক করেছে, অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকে। বিশেষ করে ভিটামিন এ-এর ঘাটতি থাকলে হাম মারাত্মক রূপ নিতে পারে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অন্ধত্ব এবং মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যায়।
অর্থাৎ, সাম্প্রতিক হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে যারা মারা গেছে বা গুরুতর অসুস্থ হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে অপুষ্টি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে। এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত যে অপুষ্টি হামের জটিলতা বাড়ায়, যদিও এটি একমাত্র কারণ নয়।
এই কারণেই পুষ্টি ও টিকাদান—দুটিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
মূল্যস্ফীতি থেকে মানবসম্পদের সংকট
অর্থনীতির ইতিহাস বলছে, কোনো দেশের খাদ্যসংকট শুধু কৃষি বা বাজারের সমস্যা নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রমবাজার এবং প্রবৃদ্ধির সমস্যাও।
আজ যে শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে না, সে হয়তো পাঁচ বছর পরে স্কুলে মনোযোগ ধরে রাখতে পারবে না। দশ বছর পরে সে কম দক্ষ শ্রমশক্তিতে পরিণত হতে পারে। বিশ বছর পরে সেই প্রজন্ম দেশের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিতে পারে।
এ কারণেই FAO, WFP এবং বিশ্বব্যাংক খাদ্যনিরাপত্তাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে।
শুধু বৃষ্টি নয়, নীতিরও পরীক্ষা
টানা বর্ষণ, জলাবদ্ধতা কিংবা ফসলের ক্ষতি বাস্তবতা। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কেন প্রতি মৌসুমে একই সংকটে বাজার ভেঙে পড়ে?

বাংলাদেশে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, শীতল সরবরাহব্যবস্থা (কোল্ড চেইন), পরিবহন অবকাঠামো, পাইকারি বাজার ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর বাজার তদারকির দীর্ঘদিনের ঘাটতি রয়েছে। ফলে সাময়িক সরবরাহ ব্যাহত হলেই খুচরা বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেখা দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে সংস্কার প্রয়োজন।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ থালার ওপর নির্ভর করে
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে দারিদ্র্য কমিয়েছে, আয়ু বাড়িয়েছে, শিশুমৃত্যু কমিয়েছে এবং খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি যদি দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের পাতে পুষ্টিকর খাবার কমিয়ে দেয়, তবে সেই অগ্রগতি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ শুধু তার মহাসড়ক, সেতু কিংবা শিল্পাঞ্চলে গড়ে ওঠে না। ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে প্রতিদিন একটি শিশুর সকালের নাশতায়, একজন শ্রমিকের দুপুরের খাবারে এবং একটি পরিবারের রাতের ভাতের সঙ্গে কতটুকু পুষ্টি জোটে—তার ওপর।
আজ কাঁচা মরিচ ৪০০ টাকা, সবজি শতকের ঘরে, ডিমের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। সংখ্যাগুলো হয়তো কয়েক সপ্তাহ পরে বদলে যাবে। কিন্তু যদি সেই সময়ের মধ্যে হাজারো পরিবার তাদের থালা থেকে পুষ্টি হারিয়ে ফেলে, তাহলে সেই ক্ষতি পূরণ করতে সময় লাগবে বহু বছর।
বাংলাদেশের সামনে তাই প্রশ্নটি আর শুধু বাজারদরের নয়। প্রশ্নটি হলো—আমরা কি এমন একটি ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় মূল্য দেবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















