স্বপ্নের পথে পা, বাস্তবে ক্ষুধা আর হতাশা
ইউরোপে নতুন জীবনের আশায় মরক্কো থেকে স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সিউটায় ঢুকে পড়া বহু অভিবাসী মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ফিরে যেতে শুরু করেছেন। তাদের অভিযোগ, সেখানে পৌঁছে তারা খাবার পাননি, সামনে এগোনোর কোনো সুযোগও ছিল না। ক্ষুধা, ক্লান্তি এবং স্থানীয়দের বিরূপ আচরণ তাদের ইউরোপের স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ভিডিওই ছিল বড় প্রলোভন
ফিরে আসা অনেক অভিবাসী জানিয়েছেন, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং বন্ধুদের বার্তা দেখে তারা বিশ্বাস করেছিলেন, কঠোর নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও সীমান্ত পার হওয়া সম্ভব। সেই বিশ্বাসেই তারা সাঁতরে কিংবা বেড়া টপকে সিউটায় প্রবেশ করেন।
ফেজ শহরের এক বেকারিশ্রমিক ব্রাহিম বলেন, ভালো ভবিষ্যতের আশায় তিনি চাকরি ছেড়ে সীমান্ত পেরিয়েছিলেন। কিন্তু সিউটায় পৌঁছে বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তিন দিন শুধু পানি খেয়ে কাটানোর দাবি

ব্রাহিমের ভাষ্য, তিনি টানা তিন দিন শুধু পানি পান করে বেঁচে ছিলেন। খাবারের দাম এত বেশি ছিল যে তা কেনার সামর্থ্য ছিল না। তার অভিযোগ, একটি সাধারণ টুনা স্যান্ডউইচের দামও ছিল অত্যন্ত চড়া।
আরও অনেক অভিবাসী জানান, দোকানপাট ও সুপারমার্কেট বন্ধ থাকায় খাবার ও পানীয় জোগাড় করাই সবচেয়ে বড় সংকটে পরিণত হয়েছিল। ভেজা কাপড় শুকাতে শুকাতে তারা রাস্তায় খাবারের খোঁজ করেছেন।
‘সিউটা যেন এক কারাগার’
একজন অভিবাসী বলেন, সিউটা ছিল যেন একটি কারাগার। সেখানে করার মতো কিছু ছিল না, প্রায় সবকিছুই বন্ধ ছিল। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, সিউটার মরক্কান অধ্যুষিত একটি এলাকায় স্থানীয় কিছু বাসিন্দা তাদের তাড়িয়ে দিয়েছেন বা হামলা চালিয়েছেন। যদিও এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
এদিকে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পৃথক দুটি ছুরিকাঘাতের ঘটনায় দুজন সামান্য আহত হয়েছেন এবং একজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবারের পর থেকে ছুরিকাঘাতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
সীমান্তের দুই পাশে ভিন্ন চিত্র

মরক্কোর সীমান্তবর্তী শহর ফনিদেকে এখন আগের তুলনায় অনেকটাই শান্ত পরিবেশ দেখা যাচ্ছে। যে এলাকায় কয়েক দিন আগে হাজারো মানুষ জড়ো হয়েছিল, সেখানে এখন অনেকে ট্যাক্সিতে করে নিজ নিজ শহরে ফিরছেন।
অন্যদিকে সিউটায় ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবন ফিরতে শুরু করেছে। কিছু ক্যাফে খুলেছে এবং ক্রেতারাও ফিরছেন। তবে অনেক দোকান এখনও বন্ধ রয়েছে এবং শহরজুড়ে নিরাপত্তা টহল জোরদার করা হয়েছে।
সহানুভূতি ও উদ্বেগ—দুই অনুভূতিই স্থানীয়দের
সিউটার কিছু বাসিন্দা বলছেন, হঠাৎ এত মানুষের আগমনে তারা আতঙ্কিত হলেও এসব তরুণের প্রতি সহানুভূতিও অনুভব করছেন। তাদের মতে, উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে এসব তরুণকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এদিকে অভিবাসীদের জন্য নির্ধারিত আশ্রয়কেন্দ্রের এক কর্মী জানান, কেন্দ্রটি ইতোমধ্যেই পূর্ণ হয়ে গেছে এবং নতুন কাউকে নেওয়ার মতো জায়গা নেই। তার ধারণা, এখনও হাজারো অভিবাসী সিউটায় অবস্থান করছেন।
তবু কারও কারও আশা এখনও শেষ হয়নি
সবাই যে ফিরে যাচ্ছেন, তা নয়। সুদানের ৪৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ আহমেদ জানান, তিনি কয়েক ঘণ্টা সাঁতরে সিউটায় পৌঁছেছেন। নানা বাধা সত্ত্বেও তিনি স্পেন ছেড়ে ফিরতে চান না।
তার কথায়, ফিরে যাওয়ার চেয়ে এখানে চেষ্টা করতে গিয়েই মারা যাওয়া ভালো।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















