শেখ হাসিনার দেশত্যাগে বাধ্য হওয়া ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলেও বাংলাদেশের রাজনীতি ও শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা থামেনি। তবে এবার সংঘাত ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও বিরোধীদের মধ্যে নয়; বরং সেই রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যেই, যারা একসময় জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনী প্রচারণায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতা তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, শেখ হাসিনার আমলে যে রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক রাজনৈতিক সহিংসতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তার অবসান ঘটানো হবে। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারের ছয় মাস পার না হতেই সেই প্রতিশ্রুতি কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতির কারণেই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর সপ্তাহজুড়েই নতুন করে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে বিএনপির ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল (জেসিডি) এবং বিরোধী জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।
বুধবার বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি তোলারাম কলেজসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দুই সংগঠনের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হন। এর আগের দিন, ৪ আগস্ট, রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজসহ অন্তত তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ আহত হন। মাত্র দুই দিনের মধ্যে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া সংঘাত রাজধানীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত শুরু করে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে।
গভীর হচ্ছে বিভাজন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘর্ষগুলো প্রমাণ করছে যে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যে রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন ও নাগরিক জোট একত্রিত হয়েছিল, তাদের মধ্যে বিভাজন ক্রমেই গভীর হচ্ছে। আদর্শগত মতপার্থক্যের চেয়ে এখন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণই বড় সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ২০২৬’-এর সরকারি অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ প্রধান অতিথি ছিলেন। অনুষ্ঠান চলাকালে ছাত্রশিবিরের নেতারা নিজেদের দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনের চেষ্টা করলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
এরপর দুই দফা সংঘর্ষ হয়—প্রথমটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এবং দ্বিতীয়টি জাতীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাইরে, যেখানে আহতদের চিকিৎসা চলছিল। জেসিডি ও ছাত্রশিবির উভয়ই দাবি করেছে, তাদের ৩০ জনের বেশি কর্মী ও শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং সহকারী সাধারণ সম্পাদকও রয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জেসিডির কর্মীরা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ঢুকে চিকিৎসাধীন আহতদের ওপর হামলা চালায়। বিএনপিপন্থি কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তারা ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) ছাত্রসংগঠন ছাত্রশক্তি এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের কর্মীদের ওপরও হামলা চালায়। তবে জেসিডি ও ছাত্রশিবির উভয়েই সহিংসতার জন্য একে অপরকে দায়ী করেছে।
রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও উত্তেজনা
সংঘাতের প্রভাব পড়ে রাজধানীর চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানেও। সেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। অনুষ্ঠানে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনীতিক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবির ঘোষণার কৃতিত্ব বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এতে ছাত্রনেতারা আপত্তি জানিয়ে দাবি করেন, ওই ঘোষণা দিয়েছিলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
এই বিরোধকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠানের ভেতরে হট্টগোল শুরু হয়। জুলাই আন্দোলনের এক ছাত্রনেতা অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রপতির সামনেই ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা তাকে মারধর করেছেন। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় উপস্থিত কয়েকজন বিদেশি কূটনীতিক অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগেই স্থান ত্যাগ করেন।

রাষ্ট্রপতির দুঃখপ্রকাশ
পরে বক্তব্যে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ এ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “আমার সামনে যা ঘটেছে, তা দেখে আমি লজ্জিত ও ব্যথিত। এটি একটি জাতীয় অনুষ্ঠান। কিন্তু আজকের ঘটনা দেখে বক্তব্য দেওয়ার আগ্রহই হারিয়ে ফেলেছি। আমি সত্যিই লজ্জিত ও মর্মাহত।”
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, এই ঘটনা জাতীয় ঐক্যের ভেতরের বিভাজনকে প্রকাশ করেছে। বিদেশি অতিথিদের সুবিধার জন্য তিনি ইংরেজিতে বক্তব্য দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু অনেক কূটনীতিক অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে চলে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তা থেকে বিরত থাকেন।
জুলাইয়ে নিহত ২৩, আহত ২১৫
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে সারা দেশে গণপিটুনি ও জনতা-সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ১৭ জন নিহত এবং ৫১ জন আহত হন। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ৪৫টি পৃথক ঘটনায় আরও ছয়জন নিহত এবং ১৬৪ জন আহত হন। অর্থাৎ, জুলাই মাসে দুই ধরনের সহিংসতায় মোট ২৩ জন নিহত এবং ২১৫ জন আহত হয়েছেন।
সংস্থাটি জানিয়েছে, জুন মাসের তুলনায় জুলাইয়ে রাজনৈতিক সহিংসতা কিছুটা কমেছে। জুনে ৫৮টি ঘটনায় নয়জন নিহত এবং ৩৪৬ জন আহত হয়েছিলেন।
জুলাই মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ ১৪টি সংঘর্ষে দুইজন নিহত ও ৪৮ জন আহত হন। বিএনপি-জামায়াতের ছয়টি সংঘর্ষে ৪৪ জন, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের তিনটি সংঘর্ষে ১৩ জন, বিএনপি ও এনসিপির পাঁচটি সংঘর্ষে ৩৮ জন এবং বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ১৪টি সংঘর্ষে আরও ১৬ জন আহত হন। পৃথক তিনটি ঘটনায় আরও তিনজন নিহত হন।
এছাড়া জুলাই মাসে রাজনৈতিক ও অন্যান্য ১৯৩টি ঘটনায় মোট ৯ হাজার ১৫৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ৩১৮ জন আওয়ামী লীগের, ২৮ জন বিএনপির, সাতজন এনসিপির এবং একজন জামায়াতের সদস্য।
উত্তেজনার মধ্যেই দ্বিতীয় বার্ষিকী
গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উৎসবের বদলে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই পালিত হয়েছে। সরকার রাজধানীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধন করেছে, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো আলাদা কর্মসূচি পালন করেছে।
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের কাছে ১১-দলীয় জোটের সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শাকুর রহমান বলেন, “দেশ যখন বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে, তখন আমরা চুপচাপ বসে থাকব না।”
বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে তিনি দাবি করেন, “আরেকটি বিপ্লব আসন্ন”, এবং সে জন্য জনগণকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সতর্ক করেন।
তিনি বলেন, কর্তৃত্ববাদ-পরবর্তী বাংলাদেশে কিছু মানুষ অকারণে নতুন নতুন ইস্যু তৈরি করছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড অনিচ্ছাকৃতভাবে ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসনের প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি করে দিচ্ছে কি না, তা সবার ভেবে দেখা উচিত।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনকে রূপান্তর করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিভিন্ন জটিলতার কারণে এটি আগে উদ্বোধন করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতেই জাদুঘরটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















