গরমের দুপুরে বন্ধুদের সঙ্গে একটু আরাম করে বসা, ঠান্ডা সাদা মদে চুমুক দেওয়া, হালকা মৌসুমি খাবার খাওয়া আর ঘরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ফুলের সুবাস—ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনায় ক্যাট চেনের আয়োজন যেন এমনই এক স্বস্তির মরূদ্যান।
গ্রীষ্মের আড্ডা আয়োজন নিয়ে তাঁর দর্শন খুবই সহজ। অতিথিরা যেন তাঁর বাড়িতে ঢুকেই মনে করেন, তাঁরা কোনো শান্ত আশ্রয়ে এসে পড়েছেন। জুতা খুলে আরামে বসবেন, গল্প করবেন, নিজের মতো সময় কাটাবেন—আর আয়োজকের একমাত্র দায়িত্ব হবে তাঁদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা।
ক্যাট চেন নিয়মিতই বন্ধুদের নিয়ে এমন আড্ডার আয়োজন করেন। কখনো সকালের নাশতার ছোট্ট ঘরে জানালা খুলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করেন, আবার কখনো বসার ঘরের নিচু টেবিল ঘিরে মেঝের কুশন ও আরামকেদারায় সবাইকে বসান। আয়োজনের ধরন বদলালেও একটি বিষয় একই থাকে—সবকিছুতেই থাকে অনাড়ম্বর স্বাচ্ছন্দ্য।
দীর্ঘ আড্ডাই তাঁর পছন্দ
চেনের আদর্শ সন্ধ্যা শুরু হয় বসার ঘরে হালকা পানীয় দিয়ে। এরপর কয়েক ঘণ্টা ধরে সবাই ভাগাভাগি করে নানা খাবার খান। আর যদি গল্পের ফাঁকে পানীয় একটু বেশিই হয়ে যায় এবং আরও ভারী খাবারের প্রয়োজন পড়ে, তখন তিনি দ্রুত পাস্তা তৈরি করেন।
তাঁর মতে, এমন রাতগুলোই সবচেয়ে আনন্দের।
সম্প্রতি এক শনিবার বিকেলে তিনি একই ধরনের একটি অনানুষ্ঠানিক আড্ডার আয়োজন করেন। অতিথিদের আসা-যাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময় ছিল না। দিনের অন্য পরিকল্পনার ফাঁকে বন্ধুরা এসে যোগ দিয়েছেন, আবার নিজেদের সুবিধামতো চলে গেছেন।
খাবারের আয়োজনও ছিল গরমের উপযোগী। হালকা, মৌসুমি এবং অধিকাংশই এমন খাবার, যেগুলো চুলা বা চুল্লির প্রয়োজন ছাড়াই সহজে তৈরি করা যায়। আলোয় ভরা তাঁর বাড়ির বসার জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে ছিল খাবারের পাত্র। ঘরের বিভিন্ন কোণে রাখা ছিল ঠান্ডা পানীয়ের বোতল।
টেবিল সাজানোর মূলমন্ত্র সরলতা
গ্রীষ্মে ক্যাট চেন মনে করেন, সাজসজ্জায় কমই বেশি। আয়োজনের শুরু করেন একটি টেবিলকাপড় দিয়ে। পুরোনো দিনের একরঙা, সূক্ষ্ম নকশার টেবিলকাপড় তাঁর বিশেষ পছন্দ।
এরপর ফুল, খাবার ও পরিবেশনের পাত্রের মাধ্যমে যোগ করেন রং। তবে টেবিলকে কখনোই অতিরিক্ত জিনিসে ভরিয়ে ফেলেন না। অতিথিদের পানীয় রাখার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকা তাঁর কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
বসার ও খাবার জায়গা একই বড় ঘরে হওয়ায় তিনি সাধারণত নোনতা ও মিষ্টি খাবার দুটি আলাদা টেবিলে রাখেন। খাবার পরিবেশনে প্রাকৃতিক কাঠের পাত্র ও উঁচু মঞ্চের মতো কাঠের পাত্র ব্যবহার করতে ভালোবাসেন। তাঁর বাড়ির অনেক সামগ্রীই বহু বছরের পুরোনো এবং বিভিন্ন ভ্রমণ কিংবা পরিবারের স্মৃতি বহন করে।
আয়োজনের পরিকল্পনাও শুরু হয় হাতে লেখা বাজারের তালিকা দিয়ে। বাজারে গিয়ে মৌসুমি যা ভালো লাগে, সেটিও তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী তালিকায় যোগ করেন।
পোশাকেও স্বস্তির ছোঁয়া
গ্রীষ্মে সাদা পোশাক পরতে ভালোবাসেন চেন। খাবার বা পানীয় পড়ে গেলে তিনি খুব একটা চিন্তিত হন না—এটাই তাঁর কাছে সাদা পোশাক পরার আরেকটি সুবিধা।
বাড়িতে পোশাক হওয়া উচিত আরামদায়ক ও সহজ। বন্ধুদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোফায় বসে গল্প করা যাবে, এমন পোশাকই তাঁর পছন্দ। কখনো সাদা শার্ট ও প্যান্ট, কখনো ঢিলেঢালা পোশাক। তবে জুতা পরা তাঁর একেবারেই পছন্দ নয়।
প্রতিটি পাত্রেই একটি গল্প
চেনের বাড়ির প্রায় প্রতিটি খাবারের পাত্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোনো না কোনো স্মৃতি। ভ্রমণ থেকে আনা ফুলদানি, স্পেনের মেনোরকা থেকে কেনা জলপাই তেলের পাত্র, প্যারিসের ছোট চামচ কিংবা লিসবন থেকে আনা মাটির পাত্র—সবকিছুই তিনি নিয়মিত ব্যবহার করেন।
তাঁর বাবার সংগ্রহ থেকেও রয়েছে কিছু পুরোনো সামগ্রী। এসব জিনিস শুধু সাজসজ্জার অংশ নয়, অতিথিদের সঙ্গে গল্পের সূত্রও তৈরি করে।
স্পেনে তৈরি হাতে আঁকা পোমেলো কাসার প্লেট তাঁর বিশেষ পছন্দ। প্যারিসে গেলে তিনি স্যাবরের কিছু পরিবেশন সামগ্রীও সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া রোজ বোলের পুরোনো সামগ্রীর বাজার থেকে কেনা নীল রঙের লিবার্টি প্লেটও তিনি প্রতিদিন ব্যবহার করেন।
খাবারে মৌসুমের গুরুত্ব
চেনের খাবারের তালিকার মূল কথা হলো—সহজ এবং মৌসুমি। আগের দিন কৃষকের বাজার থেকে যা ভালো পাওয়া যায়, সেটিই পরদিনের খাবারে জায়গা পায়।
সাধারণত তিনি ছাগলের পনির দিয়ে তৈরি সবজির টার্ট রাখেন। কখনো অ্যাসপারাগাস, কখনো পুরোনো জাতের টমেটো, আবার কখনো জুচিনি দিয়ে তৈরি হয় সেই খাবার। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি আগের রাতেই তৈরি করে রাখা যায়।
সেদিনের আয়োজনে ছিল অ্যাসপারাগাসের টার্ট। পাশাপাশি তীব্র স্বাদের চেডার পনির, চেরি ফলের মিষ্টি সংরক্ষণ, ছোট টোস্ট ও পাতে ছিল। লবণ ও জলপাই তেল দিয়ে সাজানো ঠান্ডা টমেটোও ছিল খাবারের তালিকায়।
মিষ্টির জন্য ছিল ঠান্ডা স্ট্রবেরি ও বরই। বিশেষ করে ছোট আকারের স্ট্রবেরিগুলো তাঁর এতটাই পছন্দ হয়েছিল যে তিনি সেগুলো না কিনে পারেননি।
পানীয়ের জায়গাতেও প্রস্তুতি
চেনের বাড়িতে এখন সাদা চেনিন মদের সময়। অতিথিরা পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই ঠান্ডা করে রাখা এই পানীয় পরিবেশন করা হয়।
কেউ আরও চাইলে আলাদা করে বলতে হয় না। অতিথি যেখানে বসে থাকুন, কাছেই কোনো না কোনো পানীয় রাখা থাকে। খালি গ্লাস দেখলে তিনি অস্বস্তি বোধ করেন।
তাঁর শীতল পানীয়ের ভাণ্ডারে সবসময় থাকে ঝকঝকে পানি ও অ্যালকোহলমুক্ত তিক্ত স্বাদের পানীয়। পাশাপাশি একটি বড় পাত্রে সাধারণ পানিও রাখা হয়। কারণ পরদিনের অস্বস্তিকর মাথাব্যথা কেউই চান না।
চেনের সহজ নিয়ম—এক গ্লাস মদের সঙ্গে এক গ্লাস পানি।
আলো ও ফুলে তৈরি হয় পরিবেশ
আড্ডার পরিবেশ তৈরিতে চেন সুগন্ধিহীন স্বচ্ছ কাচের ছোট মোমবাতি ব্যবহার করেন। এগুলো পুরো রাত জ্বলতে পারে এবং ঘরে তৈরি করে উষ্ণ, ঘরোয়া ও রোমান্টিক আবহ।
ফুলও তাঁর বাড়ির নিয়মিত সঙ্গী। সাধারণত কৃষকের বাজার থেকেই ফুল কেনেন। টেবিলের ফুলের সাজ থাকে খুবই সরল। একসঙ্গে অনেক ধরনের ফুল না রেখে তিনি একটি মাত্র জাতের ফুল ব্যবহার করতে পছন্দ করেন।
সেদিনের ছোট বেগুনি ফুলগুলো ছিল পিনকুশন ফুল, যেগুলো স্ক্যাবিওসা নামেও পরিচিত। সূক্ষ্ম ও সাধারণ সৌন্দর্যের জন্য ফুলটি তাঁর বিশেষ পছন্দ।
অতিথি আপ্যায়নের কিছু অলিখিত নিয়ম
চেনের মতে, অতিথি হয়ে গিয়ে জুতা না খোলা কিংবা খালি হাতে হাজির হওয়া—দুটিই অনুচিত। আয়োজককে ধন্যবাদ জানানোর জন্য বড় কোনো উপহারের প্রয়োজন নেই। ফিতায় বাঁধা একগুচ্ছ সুগন্ধি পাতা বা ছোট্ট কোনো উপহারও যথেষ্ট।
আড্ডার পটভূমিতে তিনি বহু বছর আগে তৈরি করা বোসা নোভা গানের একটি তালিকা বাজান। গানগুলো কথোপকথনে বাধা দেয় না, আবার পরিবেশে প্রাণবন্ত ছন্দও এনে দেয়।
অতিথিদের তালিকায় তাঁর পছন্দ পুরোনো বন্ধু ও নতুন পরিচিতদের মিশ্রণ। একদিকে এমন মানুষ থাকেন, যাঁরা তাঁকে এক দশক ধরে চেনেন, অন্যদিকে এমন বন্ধুরাও থাকেন, যাঁদের আগে কখনো দেখা হয়নি। এই ভিন্ন জগতের মানুষের এক জায়গায় মিলিত হওয়াটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে আনন্দের।
চাপ কমানোর কৌশল আগেভাগে প্রস্তুতি
চেন স্বভাবগতভাবেই পরিকল্পনাপ্রিয়। তাই কোনো আয়োজনের আগের সপ্তাহজুড়ে ছোট ছোট কাজ ভাগ করে নেন। এতে শেষ মুহূর্তে সবকিছু একসঙ্গে করতে হয় না।
অতিথিরা আসার আগের দিন তিনি ফুল সাজিয়ে রাখেন, টেবিলকাপড় ইস্ত্রি করেন এবং পানীয়ের গ্লাস সাজিয়ে রাখেন। তাঁর লক্ষ্য থাকে অতিথিরা আসার আগেই সব প্রস্তুতি শেষ করা।
এরপর অতিথিরা পৌঁছালে তাঁর আর কোনো কাজ থাকে না—শুধু সবাই যেন ভালো থাকেন এবং কারও গ্লাস খালি না থাকে, সেটুকু খেয়াল রাখা।
গরমের দিনে চেনের এই আয়োজন তাই কেবল খাবার কিংবা পানীয়ের গল্প নয়। এটি আসলে আরাম, বন্ধুত্ব, স্মৃতি আর অনাড়ম্বর আতিথেয়তার এক সুন্দর সমন্বয়—যেখানে নিখুঁত আয়োজনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার আনন্দ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















