চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফরের আগে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে চীনবিরোধী অবস্থান জোরালো হয়ে উঠেছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের পক্ষে থাকা মার্কিন আইনপ্রণেতারা গত সপ্তাহে একের পর এক শুনানি ও বৈঠক করেছেন। তাদের আলোচনায় উঠে এসেছে মানবাধিকার, বাণিজ্য, সরবরাহব্যবস্থা, প্রযুক্তি, তাইওয়ান এবং চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিযোগিতার মতো স্পর্শকাতর বিষয়।
এই তৎপরতার সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠক হওয়ার কথা। চলতি বছরে এটি দুই নেতার দ্বিতীয় বৈঠক। শির এই সফর এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর হতে যাচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, তাইওয়ান, ইরান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণসহ একাধিক বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
কংগ্রেসে একসঙ্গে সক্রিয় চীনবিরোধী গোষ্ঠী
চীন নিয়ে কাজ করা মার্কিন কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটি ও কমিশন চলতি সপ্তাহে একাধিক শুনানি করেছে। এর মধ্যে ছিল হাউস সিলেক্ট কমিটি অন চায়না, কংগ্রেশনাল-এক্সিকিউটিভ কমিশন অন চায়না এবং হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটি। এসব আলোচনায় চীনের মানবাধিকার পরিস্থিতি থেকে শুরু করে বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থা পর্যন্ত নানা বিষয় সামনে আনা হয়েছে।

মূল লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে—ট্রাম্প ও শির বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে শুধু অর্থনৈতিক সমঝোতা নয়, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ও গুরুত্ব পাক।
চীনবিষয়ক মার্কিন নীতিতে ট্রাম্পকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে চাপ দিচ্ছেন রিপাবলিকান ও অন্যান্য চীন-সমালোচক আইনপ্রণেতারা। হাউস সিলেক্ট কমিটি অন চায়নার রিপাবলিকান চেয়ারম্যান জন মুলেনারও ট্রাম্পকে চীনের বিষয়ে কোনো বড় ধরনের ছাড় না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি চীনের প্রযুক্তি-প্রাপ্তি সীমিত করা, তাইওয়ানের প্রতি মার্কিন সমর্থন বজায় রাখা এবং চীনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
‘দড়ি ছোট হয়ে আসছে’ ট্রাম্পের
চীন নিয়ে ট্রাম্পের নীতির ক্ষেত্রে কংগ্রেসের চাপের পরিবর্তনটিও তাৎপর্যপূর্ণ। সাবেক এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম ২০ মাসে কংগ্রেসের রিপাবলিকানরা চীনের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টকে বেশ বড় স্বাধীনতা দিয়েছিল। কিন্তু এখন সেই স্বাধীনতা কিছুটা সংকুচিত হচ্ছে।
অর্থাৎ, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক সমঝোতার জন্য ট্রাম্প যদি বড় কোনো ছাড় দিতে চান, তাহলে কংগ্রেসের চীনবিরোধী অংশের প্রতিক্রিয়া তাঁকে বিবেচনায় নিতে হতে পারে।
এখানেই আসছে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন। ট্রাম্প প্রশাসন চীনের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়, বাণিজ্য ভারসাম্য উন্নত করা এবং মার্কিন ব্যবসার জন্য বাজার সম্প্রসারণের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে কংগ্রেসের চীনবিরোধী অংশ চাইছে মানবাধিকার, নিরাপত্তা, তাইওয়ান ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার বিষয়গুলোও আলোচনার কেন্দ্রে থাকুক।
তাইওয়ানেও চাপ
শি-ট্রাম্প বৈঠকের আগে তাইওয়ান প্রশ্নটিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের কাছে নতুন অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবছে। চীনের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনকে নতুন অস্ত্র বিক্রি আপাতত স্থগিত রাখার বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে খবর এসেছে। একই সময়ে ওয়াশিংটনের চীনবিরোধী আইনপ্রণেতা ও তাইওয়ানপন্থী গোষ্ঠীগুলো মার্কিন নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রাখার পক্ষে চাপ দিচ্ছে। ট্রাম্পের জন্য বিষয়টি আরও জটিল, কারণ তিনি একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সমঝোতা এগিয়ে নিতে চান। বাণিজ্য ও শুল্কের ক্ষেত্রে চীন থেকে কিছু সুবিধা আদায় তাঁর জন্য রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে তাইওয়ান ও প্রযুক্তি ইস্যুতে অতিরিক্ত ছাড় দিলে কংগ্রেসে তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনা বাড়তে পারে।
অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
শি-ট্রাম্প আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতাও বড় জায়গা নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এখন এআই প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। উচ্চক্ষমতার চিপ, প্রযুক্তি রপ্তানি এবং উন্নত এআই ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুই দুই দেশের সম্পর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।
একই সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় শুল্ক, চীনের কাছ থেকে মার্কিন পণ্য কেনা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহের বিষয়গুলোও সামনে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ বাড়াতে চায়, আর বেইজিং মার্কিন প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করার চেষ্টা করতে পারে।

শি-ট্রাম্প বৈঠকের আগে বার্তা স্পষ্ট
সব মিলিয়ে শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফরের আগে মার্কিন কংগ্রেস থেকে যে বার্তা আসছে, তা হলো—চীনের সঙ্গে সমঝোতা হলেও সেটি যেন মানবাধিকার, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত স্বার্থের বিনিময়ে বড় ছাড়ে পরিণত না হয়।
ট্রাম্পের সামনে তাই দ্বিমুখী চাপ। একদিকে তিনি চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক বিষয়ে বাস্তব সুবিধা অর্জন করতে চান; অন্যদিকে কংগ্রেসের প্রভাবশালী চীনবিরোধী অংশ তাঁকে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। ফলে ২৪ সেপ্টেম্বরের বৈঠক শুধু দুই প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত সমঝোতার পরীক্ষা নয়, বরং ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ চীননীতি কোন দিকে যাবে—তারও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















