যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে নতুন এক জরিপ চিকিৎসাব্যবস্থার একটি গভীর সমস্যার দিকে আবারও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অনেক নারী চিকিৎসকের কাছে গেলেও নিজের উপসর্গ, ব্যথা বা শারীরিক সমস্যাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে না বলে মনে করেন। এর প্রভাব শুধু চিকিৎসা পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; তা ছড়িয়ে পড়ছে কর্মজীবন, পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে।
গ্যালাপ ও পিভটালের যৌথ জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৫১ শতাংশ নারী গত পাঁচ বছরে স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার সময় অন্তত একটি নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৯ শতাংশ। জরিপটি ২০২৬ সালের ১৪ থেকে ২২ জুলাই অনলাইনে করা হয়। এতে গ্যালাপ প্যানেলের ৩ হাজার ৮৪৫ নারী ও ১ হাজার ২৯৬ পুরুষ অংশ নেন। সবচেয়ে বেশি যে সমস্যাটির কথা নারীরা বলেছেন, সেটি হলো—চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী তাদের উপসর্গ কিংবা ব্যথাকে ছোট করে দেখেছেন বা গুরুত্ব দেননি। ৩৪ শতাংশ নারী এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। প্রায় একই সংখ্যক নারী—৩৩ শতাংশ—বলেছেন, তারা ভুল রোগনির্ণয়ের শিকার হয়েছেন অথবা রোগের কোনো নির্দিষ্ট নির্ণয়ই পাননি। আরও ৩১ শতাংশ জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর তারা পাননি। আর ২৫ শতাংশ নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছ থেকে পরস্পরবিরোধী পরামর্শ পেয়েছেন।
‘আমার কথা কি বিশ্বাস করা হচ্ছে?’
নারীদের এমন অভিজ্ঞতা নতুন নয়। জরিপের ফলাফলও দেখাচ্ছে, চিকিৎসকের কাছে নিজের সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করাতে নারীদের অনেক সময় অতিরিক্ত চেষ্টা করতে হয়।
স্বাস্থ্যসেবার অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ৪২ শতাংশ নারী বলেছেন, নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে তাদের কথা বলতে হয়েছে, জোর দিতে হয়েছে বা নিজেদের পক্ষে অবস্থান নিতে হয়েছে। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ২৬ শতাংশ। (
জরিপের গবেষকদের মতে, চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোই অনেক সময় নারীদের জন্য বড় বাধা। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরও যদি তাদের কথা যথাযথভাবে না শোনা হয়, তাহলে সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে।
ভার্জিনিয়ার জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. কিমি চেরনোবি বলেছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে নারীদের কথা বিশ্বাস না করার একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বিশেষ করে ব্যথা বা অস্বস্তির কথা বললে নারী রোগীরা কখনো কখনো অতিরঞ্জিত করছেন—এমন ধারণা তৈরি হতে পারে।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রসম্যান স্কুল অব মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক সাহনাহ লিমের মতে, নারীদের উপসর্গকে নাটকীয়তা বা অতিরঞ্জন হিসেবে দেখার প্রবণতা বহু পুরোনো। ফলে একজন নারী নিজের শরীরে কী ঘটছে, সে বিষয়ে যতই স্পষ্টভাবে বলুন না কেন, তার বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে নেওয়া সব সময় নিশ্চিত হয় না।
রোগনির্ণয়েও বড় ব্যবধান
সমস্যাটি শুধু চিকিৎসকের আচরণে সীমাবদ্ধ নয়। নারীরা রোগের সঠিক কারণ জানতে পুরুষদের তুলনায় বেশি সময়ও অপেক্ষা করছেন।
গ্যালাপের জরিপে দেখা গেছে, সর্বশেষ স্বাস্থ্যসমস্যার রোগনির্ণয় পাওয়া নারীদের মধ্যে ৪৭ শতাংশকে তিন মাস বা তারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। এর মধ্যে ২২ শতাংশকে এক বছর বা তার বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার মতো কিছু রোগে নারীদের দীর্ঘ রোগনির্ণয় প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে একই ধরনের রোগে আক্রান্ত নারী ও পুরুষের তুলনাতেও রোগনির্ণয়ের সময়ের পার্থক্য দেখা গেছে। অর্থাৎ শুধু নারীদের বেশি জটিল ধরনের রোগ হচ্ছে—এমন ব্যাখ্যা দিয়ে পুরো ব্যবধানটি বোঝানো যায় না।
সর্বশেষ স্বাস্থ্যসমস্যার ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ নারী বলেছেন, গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা বা রোগনির্ণয় পাওয়ার জন্য তাদের চাপ দিতে হয়েছে।
ভুল বা দেরিতে রোগনির্ণয়ের ঝুঁকি
নারীদের উপসর্গকে গুরুত্ব না দেওয়ার পরিণতি কখনো শুধু বিরক্তি বা হতাশায় শেষ হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর পরিণতি গুরুতর, এমনকি প্রাণঘাতীও হতে পারে।
প্রসবের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা প্রসব-পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তপাত মাতৃমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এই পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য হলেও রোগীর প্রাথমিক অভিযোগ বা লক্ষণ যথেষ্ট গুরুত্ব না পেলে চিকিৎসা দিতে দেরি হতে পারে।
হৃদ্রোগের ক্ষেত্রেও নারীদের আলাদা চিত্র দেখা যেতে পারে। পুরুষদের হার্ট অ্যাটাকের সঙ্গে যে ধরনের তীব্র বুকব্যথার লক্ষণকে সাধারণত বেশি পরিচিত বলে মনে করা হয়, নারীদের ক্ষেত্রে উপসর্গ ভিন্ন হতে পারে। ফলে প্রচলিত ধারণার ওপর বেশি নির্ভর করলে রোগ শনাক্ত করতে দেরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
চেরনোবির মতে, বিশেষ করে ব্যথাজনিত কিছু সমস্যা বা এমন মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি, যেগুলো পরীক্ষাগারে সহজে মাপা যায় না, সেগুলোর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়ায়—রোগী যা বলছেন, তা কি বিশ্বাস করা হবে?
তার মতে, একজন রোগী নিজের শরীর সম্পর্কে যে তথ্য দিচ্ছেন, চিকিৎসকের প্রথম প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত সেটিকে বিশ্বাস করে গুরুত্ব দিয়ে দেখা। কিন্তু চিকিৎসাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামো ও লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাতের কারণে বাস্তবে সব সময় তা ঘটে না।
চিকিৎসার সমস্যা ছড়িয়ে পড়ছে কর্মজীবনে
নারীদের স্বাস্থ্য সমস্যা শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কক্ষে আটকে থাকছে না। এর প্রভাব পড়ছে কর্মক্ষেত্রেও।
জরিপে ৪২ শতাংশ নারী বলেছেন, গত পাঁচ বছরে তাদের স্বাস্থ্য তাদের কাজ বা কর্মজীবনকে কোনো না কোনোভাবে সীমিত করেছে। এর মধ্যে পদোন্নতি, নেতৃত্বের দায়িত্ব বা নতুন চাকরির সুযোগকে বাস্তবসম্মত মনে না হওয়া, কাজের বিকল্প কমে যাওয়া কিংবা নিজের সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগাতে না পারার মতো বিষয় রয়েছে।
কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৪৯ শতাংশ, আর হিস্পানিক নারীদের ক্ষেত্রে ৪৫ শতাংশ।
পিভটালের ভাইস প্রেসিডেন্ট রেনি উইটমেয়ার এই ফলাফলকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলে মনে করেছেন। তার বক্তব্যের সারকথা হলো—একটি কর্মস্থলে যদি প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে চারজন মনে করেন, স্বাস্থ্যগত কারণে তারা কম সময় কাজ করছেন, পদোন্নতির সুযোগ নিতে পারছেন না কিংবা নতুন সুযোগের দিকে এগোতে পারছেন না, তাহলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা।
পরিবার ও সামাজিক জীবনেও প্রভাব
স্বাস্থ্য খারাপ হলে নারীদের নিজেদের যত্ন নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়ছে না, অন্যদের যত্ন নেওয়ার দায়িত্বও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

জরিপে ৩২ শতাংশ নারী বলেছেন, তাদের স্বাস্থ্য নিজেদের যত্ন নেওয়াকে কঠিন করেছে। ২৭ শতাংশ বলেছেন, পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেওয়া কঠিন হয়েছে। ২৬ শতাংশ জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেননি। আর ২৪ শতাংশ নারী বলেছেন, তারা সামাজিক বা নাগরিক কর্মকাণ্ডে আগের তুলনায় কম যুক্ত হয়েছেন।
সামগ্রিকভাবে ৪২ শতাংশ নারী বলেছেন, গত পাঁচ বছরে তাদের স্বাস্থ্য তাদের জীবনে করতে চাওয়া সবকিছু করতে বাধা দিয়েছে। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৫ শতাংশ।
আর যেসব নারী বলেছেন, চিকিৎসক তাদের উপসর্গ বা ব্যথাকে গুরুত্ব দেননি, তাদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ জানিয়েছেন যে স্বাস্থ্য তাদের জীবনে করতে চাওয়া সবকিছুতে বাধা দিয়েছে। যেসব নারী এমন অভিজ্ঞতার কথা বলেননি, তাদের মধ্যে এই হার ৩৬ শতাংশ।
অর্থাৎ চিকিৎসকের কাছে একটি নারীর কথা না শোনা শেষ পর্যন্ত তার পুরো জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
মেনোপজেও একই সমস্যা
নারীদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনও ভিন্ন হয়। গ্যালাপের জরিপে মেনোপজ ও মেনোপজের আগের সময়ের অভিজ্ঞতাও আলাদাভাবে উঠে এসেছে।
৪৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ বলেছেন, তাদের বর্তমানে অথবা অতীতে মেনোপজ বা মেনোপজের আগের সময়ের উপসর্গ ছিল।
এসব উপসর্গের চিকিৎসা নিতে গিয়ে ২৪ শতাংশ নারী বলেছেন, গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা পাওয়ার জন্য তাদের চাপ দিতে হয়েছে। ২৩ শতাংশকে একাধিক চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়েছে। আর ২০ শতাংশ চেষ্টা করেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাননি।
মেনোপজ ও মেনোপজের আগের সময়ের শারীরিক ও মানসিক সমস্যাও অনেক নারীর কাজ ও দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে। এসব নারীর প্রায় ৪০ শতাংশ বলেছেন, এই সময়ের অভিজ্ঞতা তাদের জীবন বা কাজে অন্তত একটি ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
দায় শুধু নারীর নয়
চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে নিজের প্রশ্ন লিখে নেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গের তালিকা তৈরি করা এবং আগের চিকিৎসার তথ্য সঙ্গে রাখার মতো কিছু প্রস্তুতি রোগীকে সাহায্য করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমিত সময়ের চিকিৎসা সাক্ষাতে কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা আগে থেকেই ঠিক করে নেওয়াও কার্যকর।
তবে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—নিজের কথা শোনানোর পুরো দায়িত্ব নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না।
কোনো চিকিৎসকের সঙ্গে রোগীর যোগাযোগে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে অন্য চিকিৎসকের মতামত নেওয়া বা দ্বিতীয় মতামত চাওয়া যুক্তিসঙ্গত হতে পারে। নিজের শরীরে অস্বাভাবিক কিছু ঘটছে বলে মনে হলে সেটিকে গুরুত্ব দেওয়াও জরুরি।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে একজন নারীকে বারবার নিজের অসুস্থতার প্রমাণ দিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মৌলিক দায়িত্বই হলো রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা, সম্ভাব্য কারণগুলো বিবেচনা করা এবং যথাসম্ভব দ্রুত ও পরিষ্কারভাবে চিকিৎসার পথ নির্ধারণ করা।
গ্যালাপের গবেষক স্টেফানি মার্কেনের মতে, নারীদের স্বাস্থ্য নিয়ে সমস্যাটি শুধু চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া বা চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগের প্রশ্ন নয়। চিকিৎসা পাওয়ার পর কী হচ্ছে—উপসর্গকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কি না, পরিষ্কারভাবে পরবর্তী পদক্ষেপ জানানো হচ্ছে কি না এবং সময়মতো রোগনির্ণয় হচ্ছে কি না—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আর নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহনাহ লিমের ভাষায়, এটি কেবল নারীদের নিজেদের হয়ে লড়াই করার বিষয় নয়। সমস্যাটি পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যা। একজন মানুষ নিজের হয়ে যতটা advocacy বা দাবি জানাতে পারেন, তারও একটি সীমা আছে।
নারীদের স্বাস্থ্য নিয়ে এই জরিপ তাই শুধু চিকিৎসাব্যবস্থার একটি দুর্বলতার চিত্র নয়। এটি দেখাচ্ছে, একজন রোগীর কথা মন দিয়ে শোনা বা না শোনার সিদ্ধান্ত কীভাবে তার চিকিৎসা, কাজ, পরিবার, সামাজিক জীবন এবং ভবিষ্যতের সুযোগ—সবকিছুকে প্রভাবিত করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















