ইসরায়েলের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক লড়াই এবার শুধু সভা-সমাবেশ, প্রচার কিংবা ভোটের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নির্বাচনের দিন কে আকাশপথে দেশে ফিরতে পারবেন, কে ভোট দিতে পারবেন এবং বিদেশে থাকা নাগরিকদের দেশে ফেরার সুযোগ কতটা সহজ থাকবে—এসব প্রশ্নও এখন তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে।
আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন। আর এই নির্বাচন সামনে রেখে বিদেশে বসবাসরত হাজারো ইসরায়েলি দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের অনেকেই বলছেন, দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এবারের ভোট এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে বিমানের টিকিটের খরচ, দীর্ঘ যাত্রা কিংবা বিদেশে বসবাসের ঝামেলা—কোনোটিই তাদের ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারবে না।
কিন্তু ঠিক এই সময়েই প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি বিদেশে থাকা ইসরায়েলিদের দেশে ফিরিয়ে ভোট দেওয়ার জন্য সহায়তা করা একটি উদ্যোগ বন্ধ করতে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। দলটির অভিযোগ, ‘ফ্লাই অ্যান্ড ভোট’ নামে এই কর্মসূচি বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত একটি রাজনৈতিক প্রচেষ্টা এবং এর মাধ্যমে নির্বাচনে একটি নির্দিষ্ট পক্ষ লাভবান হতে পারে। অন্যদিকে উদ্যোগটির আয়োজকদের দাবি, তারা কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীকে সমর্থন করছে না। তাদের কাজ শুধু এমন একটি দেশের নাগরিকদের দেশে ফেরার পথ সহজ করা, যেখানে সাধারণ ভোটারদের বিদেশে বসে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই।
এই বিরোধ এখন এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইসরায়েলের নির্বাচনী রাজনীতি অত্যন্ত অনিশ্চিত। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহুর লিকুদ এবং তার সম্ভাব্য জোটের বিপরীতে সরকারবিরোধী দলগুলো সামগ্রিকভাবে এগিয়ে থাকলেও ৬১ আসনের সরকার গঠনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা এখনও কঠিন। ফলে কয়েক দশ হাজার অতিরিক্ত ভোটও কোনো কোনো আসনে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিতে পারে। কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বিদেশে থাকা ভোটাররা?

ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—বিদেশে থাকা সাধারণ নাগরিকদের জন্য নিয়মিত ডাকযোগে বা দূতাবাসে গিয়ে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। সীমিত কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ভোট দিতে হলে নাগরিককে নির্বাচনের সময় ইসরায়েলের ভেতরে শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকতে হয়। সরকারি দায়িত্বে বিদেশে থাকা নির্দিষ্ট শ্রেণির নাগরিকরা বিদেশ থেকেই ভোট দিতে পারেন।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য বা অন্য কোনো দেশে বসবাসরত একজন সাধারণ ইসরায়েলির সামনে মূলত দুটি পথ—ভোট দিতে দেশে ফেরা, অথবা নির্বাচনে ভোট না দেওয়া।
এই বাস্তবতাই এবারের নির্বাচনে ‘ফ্লাই অ্যান্ড ভোট’ উদ্যোগকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
ইসরায়েলি প্রবাসীদের সংখ্যা নিয়েও বিভিন্ন হিসাব রয়েছে। আমেরিকা-ইসরায়েল ডেমোক্রেসি কোয়ালিশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জোনাথন বারসাদে বলেছেন, বিদেশে থাকা ভোট দেওয়ার যোগ্য ইসরায়েলির সংখ্যা ৮ লাখ থেকে ১০ লাখ পর্যন্ত হতে পারে। এর প্রায় অর্ধেক যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন বলে তার হিসাব। তবে এদের সবাই যে নির্বাচনের দিন দেশে ফিরবেন, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তাই বাস্তবে কতজন ভোট দিতে দেশে ফিরবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
‘ফ্লাই অ্যান্ড ভোট’ কীভাবে কাজ করছে?
‘ফ্লাই অ্যান্ড ভোট’ উদ্যোগটি পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আমেরিকা-ইসরায়েল ডেমোক্রেসি কোয়ালিশন। সংগঠনটি ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নিজেদের লক্ষ্য হিসেবে ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক ভিত্তি শক্তিশালী করার কথা বলে।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা ভোটারদের বিমানের টিকিট কিনে দিচ্ছে না। বরং বিভিন্ন বাণিজ্যিক বিমান সংস্থার ভাড়া ও রুটের তথ্য খুঁজে কম খরচে দেশে ফেরার সুযোগ বের করতে সহায়তা করছে। কোথায় দলগত ভাড়া পাওয়া যেতে পারে, কোন রুট তুলনামূলক সাশ্রয়ী—এসব তথ্যও দেওয়া হচ্ছে।
প্রয়োজনে পাসপোর্ট নবায়ন, ভোট দেওয়ার যোগ্যতা যাচাই এবং অনেক মানুষ একসঙ্গে ফিরতে চাইলে চার্টার ফ্লাইটের ব্যবস্থা করার মতো লজিস্টিক সহযোগিতার কথাও বলা হয়েছে।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ এই উদ্যোগে নিবন্ধন করেছেন বলে আয়োজকেরা জানিয়েছে। এর আগে তারা ৫০ হাজার বা তারও বেশি ভোটারকে দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য জানিয়েছিল।
তবে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা আর শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরে ভোট দেওয়া মানুষের সংখ্যা এক নয়। কতজন সত্যিই বিমানে উঠবেন, তা নির্ভর করবে টিকিটের দাম, যাত্রাপথ, ব্যক্তিগত পরিস্থিতি এবং নির্বাচনের শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক আবহের ওপর।
লিকুদের আপত্তি কোথায়?
লিকুদ পার্টির অভিযোগের মূল জায়গা হলো নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা।
দলটি কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির কাছে করা আবেদনে দাবি করেছে, ‘ফ্লাই অ্যান্ড ভোট’ কেবল একটি নিরপেক্ষ যাতায়াত সহায়তা কর্মসূচি নয়; এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। লিকুদের মতে, বিদেশি অর্থায়ন ও বিভিন্ন ধরনের ভ্রমণ সুবিধা ব্যবহার করে নির্বাচনের ভোটের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলার চেষ্টা হতে পারে।
বিশেষ করে দলটি প্রশ্ন তুলেছে, কোনো ভোটারের হাতে সরাসরি নগদ অর্থ না দিলেও যদি তাকে বিশেষ বিমান সুবিধা, দলগত ছাড় কিংবা অগ্রাধিকারমূলক যাতায়াতের সুযোগ করে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি নির্বাচনী আইনের আওতায় নিষিদ্ধ সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হবে কি না।
লিকুদ আরও দাবি করেছে, এই উদ্যোগের সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির যোগাযোগ রয়েছে। তবে ‘ফ্লাই অ্যান্ড ভোট’ এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো এ ধরনের রাজনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—লিকুদের অভিযোগ এখনও অভিযোগই। নির্বাচন কমিটি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চূড়ান্তভাবে কী সিদ্ধান্ত নেবে, সেটিই নির্ধারণ করবে উদ্যোগটি আইন ভঙ্গ করছে কি না।
আয়োজকদের বক্তব্য: ‘আমরা কারও পক্ষে নই’
‘ফ্লাই অ্যান্ড ভোট’-এর আয়োজকেরা বলছেন, তারা কোনো দল বা প্রার্থীকে সমর্থন করছেন না। একজন ভোটার দেশে ফিরে কাকে ভোট দেবেন, তা জানার বা নিয়ন্ত্রণ করার কোনো চেষ্টা তাদের নেই।
উদ্যোগটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা বাতেল ব্লেইশ-সুলতানিকের বক্তব্য, তাদের কাছে বিষয়টি কোনো দলকে ক্ষমতায় আনা বা সরিয়ে দেওয়ার প্রশ্ন নয়; বিষয়টি ভোট দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা।
এই যুক্তির পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা আছে। ইসরায়েল সাধারণ নাগরিকদের জন্য বিদেশ থেকে ভোট দেওয়ার সুযোগ না রাখায় প্রবাসী ভোটারদের দেশে ফেরার খরচ নিজেদের বহন করতে হয়। ফলে অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তিরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলেও কম সামর্থ্যের অনেক মানুষ কার্যত ভোটের বাইরে থেকে যেতে পারেন।
এই বৈষম্য নিয়েই ইসরায়েলে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে থাকা নাগরিকদের ভোটাধিকার সংস্কারের আলোচনা রয়েছে। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটও অতীতে বিদেশে থাকা নির্দিষ্ট শ্রেণির নাগরিকদের ভোট দেওয়ার সুযোগ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল।
কেন এবারের নির্বাচন এত গুরুত্বপূর্ণ?
এই বিতর্ককে বুঝতে হলে ইসরায়েলের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হয়।
২৭ অক্টোবরের নির্বাচনটি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ওই হামলার পর ইসরায়েল দীর্ঘ ও বহু-মুখী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক সংঘাতও দেশটির রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। একই সময়ে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার দেশে বিচারব্যবস্থা সংস্কার, নিরাপত্তা নীতি ও সরকারের জবাবদিহি নিয়ে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছে।
এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারও বড় প্রশ্নের মুখে। সাম্প্রতিক জরিপে বিরোধী দলগুলো সামগ্রিকভাবে ভালো অবস্থানে থাকলেও তাদের মধ্যে নেতৃত্ব ও জোট নিয়ে বিভক্তি রয়েছে। ফলে শুধু কোন দল কত আসন পেল, তা নয়—নির্বাচনের পর কে কার সঙ্গে সরকার গঠন করতে পারবে, সেটিও বড় অনিশ্চয়তা।
ইসরায়েলের সংসদে সরকার গঠনের জন্য ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। বর্তমান জরিপগুলোতে কোনো পক্ষের জন্যই একটি সহজ ও নিশ্চিত পথ দেখা যাচ্ছে না।
এই কারণেই বিদেশ থেকে কয়েক হাজার অতিরিক্ত ভোটও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ভোটার ফেরানোর উদ্যোগ নিয়ে কেন এত উত্তেজনা?
ইসরায়েলের নির্বাচনে ছোট ব্যবধান নতুন কিছু নয়। একটি দল বা জোট কয়েকটি আসন হারালে পুরো সরকার গঠনের হিসাব পাল্টে যেতে পারে।
‘ফ্লাই অ্যান্ড ভোট’ উদ্যোগের সমর্থকদের যুক্তি হলো, বিদেশে থাকা নাগরিকদের ভোট দেওয়ার সাংবিধানিক সুযোগ থাকলে তাদের দেশে ফেরার বাস্তব বাধা কমানো উচিত।
কিন্তু লিকুদের আশঙ্কা হলো, যদি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের ভোটাররাই বেশি হারে এই সুবিধা গ্রহণ করেন, তাহলে উদ্যোগটি বাস্তবে নির্বাচনী ফলাফলে একতরফা প্রভাব ফেলতে পারে।
এখানেই বিতর্কটি জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ একদিকে ভোটারের অংশগ্রহণ বাড়ানো গণতন্ত্রের পক্ষে ইতিবাচক; অন্যদিকে নির্বাচনী সময়ে কোনো সংগঠন যদি কোনো একটি রাজনৈতিক পক্ষকে তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেয়, তাহলে সেটি নির্বাচনী সমতার প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
আকাশপথ নিয়েও আলাদা উদ্বেগ
বিতর্ক শুধু ‘ফ্লাই অ্যান্ড ভোট’ উদ্যোগকে কেন্দ্র করে নয়। নির্বাচনের আগে বিদেশ থেকে ইসরায়েলে ফ্লাইট চলাচল নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে এর আগে এমন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল যে নির্বাচনের সময় ফ্লাইট পরিচালনা সীমিত করার বিষয়ে পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ভেতরে আলোচনা হয়েছিল। এই খবরের পর বিরোধী রাজনীতিক ও নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করে, বিদেশে থাকা ভোটারদের দেশে ফেরার সুযোগ কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত করা উচিত নয়।পরিবহনমন্ত্রী মিরি রেগেভ অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, যুদ্ধের মধ্যেও ইসরায়েলের আকাশপথ খোলা রাখা হয়েছে এবং নির্বাচনের দিন তা বন্ধ করার কোনো পরিকল্পনা নেই। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, শুধু বামপন্থী বা সরকারবিরোধীরাই কি বিদেশ থেকে দেশে ফিরে ভোট দেবেন? ডানপন্থী ভোটাররাও দেশে ফিরতে পারেন বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। এই বক্তব্যটি বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। কারণ বিদেশ থেকে ভোট দিতে আসা নাগরিকদের রাজনৈতিক পরিচয় একরকম নয়। উদ্যোগটির আয়োজকেরাও দাবি করছে, তারা কোনো ভোটারের রাজনৈতিক পছন্দ যাচাই করে না।

অতীতেও প্রবাসীরা ভোট দিতে ফিরেছেন
বিদেশে থাকা ইসরায়েলিদের নির্বাচনের সময় দেশে ফিরে আসা নতুন ঘটনা নয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন জায়গায় থাকা ইসরায়েলিরা অতীতে নির্বাচনের সময় দেশে ফিরেছেন। আল্ট্রা-অর্থোডক্স ইসরায়েলিদের একটি অংশও নিয়মিতভাবে ভোটের সময় দেশে ফেরেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। (
এ কারণেই সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন—আগে যখন বিদেশে থাকা ভোটাররা দেশে ফিরেছেন, তখন বিষয়টি বড় রাজনৈতিক বিতর্ক হয়নি কেন? আর এখন যখন একটি সংগঠিত উদ্যোগের মাধ্যমে কয়েক দশ হাজার মানুষকে দেশে ফেরানোর চেষ্টা হচ্ছে, তখন সেটিকে নির্বাচনী হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে কেন?
অন্যদিকে লিকুদের অবস্থান হলো, এবারের উদ্যোগের পরিধি ও সংগঠিত চরিত্র আগের ঘটনাগুলোর তুলনায় আলাদা এবং বিদেশি অর্থায়নের প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
পাসপোর্ট নিয়েও তৈরি হয়েছিল সমস্যা
বিদেশে থাকা ইসরায়েলিদের দেশে ফেরার পথে আরেকটি বাস্তব সমস্যা ছিল পাসপোর্ট।
আগস্টে ইসরায়েলের জনসংখ্যা ও অভিবাসন কর্তৃপক্ষ বিদেশে থাকা নাগরিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। যেসব ইসরায়েলি নাগরিকের ইসরায়েলি পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তারা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বৈধ বিদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করেও ইসরায়েলে প্রবেশ করতে পারবেন। এই সুবিধার সময়সীমা ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল বিদেশে থাকা নাগরিকদের দেশে ফেরার প্রক্রিয়া সহজ করা, যার মধ্যে নির্বাচনে ভোট দিতে আসার বিষয়টিও রয়েছে।
অর্থাৎ ভোট দিতে দেশে ফেরার আগ্রহ শুধু রাজনৈতিক প্রচারণার বিষয় নয়; বাস্তব প্রশাসনিক প্রস্তুতিও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
আদালতেও উঠেছে প্রবাসীদের ভোটাধিকার

বিদেশে থাকা ইসরায়েলিদের ভোটাধিকার নিয়ে আলাদা আইনি লড়াইও হয়েছে। একটি মামলায় প্রবাসী ইসরায়েলিরা বিদেশ থেকে ভোট দেওয়ার সুযোগ চেয়েছিলেন। তবে ইসরায়েলের হাইকোর্ট সেই আবেদন খারিজ করে দেয়। মামলার সঙ্গে ভোটার তালিকায় বিদেশে থাকা কিছু নাগরিকের অবস্থান এবং ‘নন-রেসিডেন্ট’ হিসেবে শ্রেণিবিন্যাসের প্রশ্নও জড়িত ছিল। ফলে ২০২৬ সালের নির্বাচন শুধু নেতানিয়াহু বনাম বিরোধীদের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়; একই সঙ্গে এটি প্রশ্ন তুলছে—একজন নাগরিক দেশের বাইরে বসবাস করলেও তার ভোটাধিকার কতটা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা হবে?
সামনে এখন কী?
লিকুদের আবেদন নিয়ে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। যদি কমিটি উদ্যোগটি নিষিদ্ধ করে, তাহলে বিদেশে থাকা হাজারো ভোটারের দেশে ফেরার পরিকল্পনায় বড় প্রভাব পড়তে পারে। আর যদি উদ্যোগটি চালু থাকে, তাহলে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত ফ্লাইট, যাতায়াত ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে একটি বিষয় ইতোমধ্যেই স্পষ্ট—বিদেশে থাকা ইসরায়েলিদের ভোট এবার আর প্রান্তিক কোনো বিষয় নয়।
সাম্প্রতিক হিসাবে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ ‘ফ্লাই অ্যান্ড ভোট’-এ নিবন্ধন করেছেন। তাদের সবাই শেষ পর্যন্ত ভোট দিতে দেশে ফিরবেন কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক মানুষের আগ্রহই দেখিয়ে দিচ্ছে, ইসরায়েলের এবারের নির্বাচন তাদের দেশের সীমানার বাইরেও কতটা গভীর আগ্রহ ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আর এই নির্বাচনে যখন কোনো পক্ষই ৬১ আসনের সহজ সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিশ্চয়তা পাচ্ছে না, তখন কয়েক হাজার অতিরিক্ত ভোটও যে রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্ব পেতে পারে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
শেষ পর্যন্ত তাই লড়াইটি শুধু ভোটকেন্দ্রে হবে না। লড়াই হবে বিমানবন্দরে, বিমানের আসনে, ভোটার তালিকায় এবং আদালত ও নির্বাচন কমিশনের কক্ষেও।
ইসরায়েলের প্রবাসী নাগরিকদের জন্য প্রশ্নটি খুব সরল—তারা কি দেশের বাইরে থেকেও নিজেদের দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অংশ নিতে পারবেন? বর্তমান ব্যবস্থায় উত্তর হলো, ভোট দিতে হলে তাদের দেশে ফিরতেই হবে। আর ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, সেই ফেরার পথটিই এখন ইসরায়েলের রাজনীতির নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















