কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা যত তীব্র হচ্ছে, ততই সামনে আসছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি কি অন্তত এআইয়ের নিরাপত্তা ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করতে পারে?
সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্ট্যানফোর্ডের একটি জরিপে চীনে প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এআই ব্যবহার করা পণ্যের সুবিধা অসুবিধার চেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে একই ধরনের ইতিবাচক মনোভাব ৪৫ শতাংশেরও কম মানুষের মধ্যে দেখা গেছে। অর্থাৎ, এআইকে ঘিরে দুই দেশের সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতেও বড় পার্থক্য রয়েছে।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এমন এক সময়ে, যখন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র সফর করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। ২৪ সেপ্টেম্বরের এই বৈঠকে বাণিজ্য ও বিরল খনিজের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।
প্রতিযোগিতার মধ্যেও সহযোগিতার জায়গা কোথায়?
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বর্তমানে এআইকে শুধু প্রযুক্তি বা ব্যবসার বিষয় হিসেবে দেখছে না। এটি অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা, সাইবার নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এখনও উন্নত এআই মডেল, প্রযুক্তি কোম্পানি ও অবকাঠামোর ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত ব্যবধান কমিয়ে আনছে। স্ট্যানফোর্ডের এআই সূচকসহ বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, চীনের মডেলগুলো গুরুত্বপূর্ণ কিছু মানদণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ মডেলের কাছাকাছি চলে এসেছে।

এই প্রতিযোগিতার কারণে দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, উন্নত চিপ, তথ্যপ্রবাহ এবং এআই মডেলের ব্যবহার নিয়ে অবিশ্বাসও বাড়ছে। ফলে একটি দেশের তৈরি প্রযুক্তি অন্য দেশ কীভাবে ব্যবহার করছে, সেটিও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে বিপদের জায়গাটিই আবার সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
এআই যদি ভুল তথ্য তৈরি করে, মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো কাজ করে, সাইবার হামলায় ব্যবহৃত হয় কিংবা সামরিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, তাহলে এর ঝুঁকি কোনো একটি দেশের সীমান্তে আটকে থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্র বা চীন—কোনো দেশই একা এই ঝুঁকি সামাল দিতে পারবে না।
নিরাপত্তায় মিল খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা
সাম্প্রতিক আলোচনায় এআই নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সীমিত হলেও একটি অভিন্ন উদ্বেগের জায়গা স্পষ্ট হচ্ছে।
সিএনএনের আলোচনায় মাইক্রোসফট এআইয়ের প্রধান মুস্তাফা সুলেমানও যুক্তি দিয়েছেন, চীনকে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখলে এআই নিরাপত্তার বড় প্রশ্নগুলোর সমাধান কঠিন হবে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শক্তিশালী এআই ব্যবস্থাগুলো যদি একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে, তাহলে নিরাপত্তার কিছু মৌলিক নিয়ম নিয়ে দুই পক্ষের কথা বলা প্রয়োজন।
বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টের আচরণ, সাইবার হামলা, ভুল তথ্য, মডেলের নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং মানুষকে শেষ সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে ন্যূনতম সমঝোতা সম্ভব হতে পারে।
সাম্প্রতিক মার্কিন-চীন আলোচনায় এআই নিরাপত্তা, ‘ওপেন-ওয়েট’ মডেল এবং এআই ব্যবহারে নিরাপত্তা-নির্দেশিকা তৈরির বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে
মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতেও বড় পার্থক্য
এখানে সাধারণ মানুষের মনোভাবও গুরুত্বপূর্ণ।

চীনে এআইকে জাতীয় উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির অংশ হিসেবে তুলনামূলকভাবে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। সিএনএনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মর্গ্যান স্ট্যানলির এক জরিপে ৮০ শতাংশ চীনা উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা সপ্তাহে অন্তত একবার এআই ব্যবহার করেন। যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ৫৪ শতাংশ।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে এআই নিয়ে আশাবাদের পাশাপাশি চাকরি হারানো, নিরাপত্তা এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কাও জোরালো। সাম্প্রতিক এক মার্কিন জরিপে দেখা গেছে, মানুষ এআই বন্ধ করে দিতে চায় না, কিন্তু এর বিকাশ আরও নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে।
অর্থাৎ দুই দেশের সমাজে এআই ব্যবহারের মাত্রা ও প্রত্যাশা আলাদা হলেও নিরাপত্তার প্রশ্নটি ধীরে ধীরে উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শি-ট্রাম্প বৈঠক কতটা পরিবর্তন আনতে পারে?
আগামী সপ্তাহের শি-ট্রাম্প বৈঠক তাই শুধু বাণিজ্য বা ভূরাজনীতির বৈঠক নয়। এআই নিয়ে দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দিকনির্দেশনাও এতে কিছুটা স্পষ্ট হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে চীনকে এআই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রাখা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পও বারবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে এআই ক্ষেত্রে নেতৃত্ব ধরে রাখতে হবে এবং চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া যাবে না। তাঁর প্রশাসনের নীতিতে দ্রুত এআই উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত নেতৃত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চীনের জন্যও এআই জাতীয় শক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে বেইজিং এমন কোনো সমঝোতায় সহজে যাবে না, যা তার প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে সীমিত করতে পারে।
এই বাস্তবতায় বড় কোনো ‘এআই চুক্তি’ হওয়া কঠিন। বরং প্রথম ধাপে দুই দেশ কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে যোগাযোগের ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে—যেমন এআই দুর্ঘটনা হলে দ্রুত তথ্য বিনিময়, শক্তিশালী মডেলের নিরাপত্তা পরীক্ষা, স্বয়ংক্রিয় এআই ব্যবস্থার সীমা নির্ধারণ এবং সামরিক ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের ঝুঁকি কমানো।
অবিশ্বাসই সবচেয়ে বড় বাধা

তবে সহযোগিতার পথ সহজ নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা, চীনের সঙ্গে প্রযুক্তি ভাগাভাগি করলে তা সামরিক বা কৌশলগত সুবিধায় পরিণত হতে পারে। চীনের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র এআই প্রযুক্তিতে নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের যুক্তিকে ব্যবহার করতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিপ নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য বিরোধ, সাইবার নিরাপত্তা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব।
তবু এআইয়ের একটি বৈশিষ্ট্য অন্য অনেক প্রযুক্তির চেয়ে আলাদা। এটি যত দ্রুত উন্নত হচ্ছে, এর সম্ভাব্য ক্ষতির পরিধিও তত দ্রুত বাড়ছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যদি একে অপরকে হারানোর প্রতিযোগিতার পাশাপাশি কিছু মৌলিক নিরাপত্তা নিয়মে একমত হতে পারে, সেটি শুধু দুই দেশের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
প্রতিযোগিতা থাকবে, তবু কথা বলার দরজা খোলা রাখতে হবে
এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা এখনই বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতাও ঝুঁকিপূর্ণ।
দুই দেশই এমন শক্তিশালী প্রযুক্তি তৈরি করছে, যার ভুল ব্যবহার সীমান্ত মানে না। তাই প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা চললেও নিরাপত্তা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও মানবিক তত্ত্বাবধানের মতো বিষয়ে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা জরুরি।
সাম্প্রতিক এক জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের নিবন্ধিত ভোটারদের বড় একটি অংশ চীনের সঙ্গে কাজ করে এআইসহ বিপর্যয়কর ঝুঁকি কমানোর পক্ষে মত দিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি হয়তো কে এআইয়ে প্রথম হবে, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো—কে এমন এআই তৈরি করতে পারবে, যা শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং নিরাপদও থাকবে।
আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও অন্তত কিছু জায়গায় একসঙ্গে বসার প্রয়োজন হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















