প্রিন্সেস ডায়ানার জীবন, তার দাম্পত্য এবং ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বহু বছর ধরেই আলোচনা থামেনি। তবে ডায়ানার ছোট ভাই আর্ল চার্লস স্পেন্সারের নতুন বই ‘সোয়ান সং’ প্রকাশের আগেই এর কয়েকটি অংশ ঘিরে ব্রিটিশ রাজপরিবারে নতুন করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বইটির পুরো কপি এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তবে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি অংশে স্পেন্সার তার বোনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা এবং ডায়ানার মৃত্যুর পর তৎকালীন প্রিন্স অব ওয়েলস চার্লসের সঙ্গে তার নিজের কথোপকথনের স্মৃতি তুলে ধরেছেন। এসব বক্তব্যের মধ্যে কিছু দাবি এতটাই বিস্ফোরক যে বাকিংহাম প্যালেসও বিরলভাবে কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
বাকিংহাম প্যালেসের এক মুখপাত্র বলেছেন, রাজপরিবার সাধারণত বই নিয়ে মন্তব্য করে না। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, ভাইবোন হারানোর গভীর শোক অনেক বছর পরও মানুষের বিচারবোধ, স্মৃতি ও ঘটনাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করতে পারে।
বইটির প্রকাশক পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস জানিয়েছে, সংবাদমাধ্যমে উদ্ধৃত অংশগুলো বইয়ের প্রকৃত অংশ এবং সেগুলো সঠিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। তবে বইটি প্রকাশের আগে সিএনএন সেটির পূর্ণাঙ্গ কপি দেখেনি।
ডায়ানার মৃত্যুর পর চার্লসের প্রতিক্রিয়া নিয়ে দাবি
স্পেন্সারের বইয়ের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট রাতের ঘটনা নিয়ে। সেদিন প্যারিসে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান ডায়ানা।
স্পেন্সার লিখেছেন, ডায়ানার দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর তিনি বারবার তার বোন জেনের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন। পরে ডায়ানার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি তৎকালীন প্রিন্স চার্লসকে ফোন করেন।
নিজের স্মৃতিচারণে স্পেন্সার দাবি করেছেন, সেই ফোনে চার্লসের কণ্ঠে তিনি এমন এক উচ্ছ্বাস শুনেছিলেন, যা তার কাছে ‘লটারিতে জেতা মানুষের’ মতো মনে হয়েছিল।
স্পেন্সারের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে বহু বছর ধরে তিনি মনে করেছেন, ডায়ানার মৃত্যুর খবর শুনে চার্লস হয়তো প্রথমে এমন একজন মানুষকে হারানোর শোকের চেয়ে বেশি ভেবেছিলেন যে ঘটনাটি তাকে তার ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করার সুযোগ করে দিতে পারে।
এটি স্পেন্সারের ব্যক্তিগত স্মৃতি ও ব্যাখ্যা—স্বাধীনভাবে এর সত্যতা যাচাই করা হয়নি।
ডায়ানাকে দ্রুত ভুলে যাওয়ার মন্তব্য?
ডায়ানার শেষকৃত্যে প্রিন্স উইলিয়াম ও প্রিন্স হ্যারির তাদের মায়ের কফিনের পেছনে হাঁটা উচিত কি না, তা নিয়েও স্পেন্সার ও চার্লসের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ হয়েছিল বলে বইটিতে দাবি করা হয়েছে।
স্পেন্সারের বর্ণনা অনুযায়ী, ফোনে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের একপর্যায়ে চার্লস রাগ প্রকাশ করেন। এরপর স্পেন্সারের দাবি, তিনি এমন একটি মন্তব্য করেন যার অর্থ ছিল—ডায়ানাকে মানুষ খুব দ্রুতই ভুলে যাবে।
স্পেন্সার লিখেছেন, ওই কথা শুনে তিনি বিস্মিত হয়ে ফোন রেখে দেন।

ডায়ানার মৃত্যুর পর তার দুই ছেলে উইলিয়াম ও হ্যারির ওপর কী ধরনের মানসিক চাপ তৈরি হয়েছিল, সেটিও বইটিতে তুলে ধরেছেন স্পেন্সার। তার দাবি, ডায়ানার মৃত্যুর পর হ্যারির প্রয়োজন ছিল মায়ের স্নেহ, আলিঙ্গন ও নিরাপত্তা। কিন্তু সে সময় তিনি যথেষ্ট শান্ত পরিবেশ ও যত্ন পেয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে স্পেন্সারের উদ্বেগ ছিল।
বিয়ের আগেই ডায়ানা কি সম্পর্ক ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন?
ডায়ানা ও চার্লসের বিয়ে নিয়ে স্পেন্সারের বর্ণনাতেও রয়েছে নতুন কিছু দাবি।
তার দাবি, ১৯৮১ সালে বিয়ের আগে এক অনুষ্ঠানে চার্লসের আচরণে ডায়ানা এতটাই কষ্ট পেয়েছিলেন যে তিনি বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। স্পেন্সার লিখেছেন, ডায়ানা তার বাবার কাছে গিয়ে বলেছিলেন, এমন একজন পুরুষকে তিনি বিয়ে করতে পারবেন না, যিনি তাকে ভালোবাসেন বলে মনে হয় না।
তবে ডায়ানার বাবা তার এই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি বলে দাবি করেছেন স্পেন্সার।
এর কিছুদিন আগে ডায়ানা চার্লসের কেনা একটি ব্রেসলেট দেখতে পেয়েছিলেন বলেও বইটিতে দাবি করা হয়েছে। স্পেন্সারের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রেসলেটটি চার্লস তার পরবর্তী স্ত্রী ক্যামিলার জন্য কিনেছিলেন।
এই ঘটনাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ডায়ানা-চার্লস সম্পর্কের আলোচনার অংশ হলেও স্পেন্সার এবার সেগুলো নিজের স্মৃতি ও বোনের সঙ্গে তার কথোপকথনের ভিত্তিতে নতুন করে তুলে ধরেছেন।
বিয়ের আগের দিন চার্লস নাকি বলেছিলেন, তিনি ডায়ানাকে ভালোবাসেন না

স্পেন্সারের বইয়ের আরেকটি দাবি আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
তিনি লিখেছেন, বিয়ের আগের দিন চার্লস ডায়ানাকে বলেছিলেন যে তিনি তাকে বিয়ে করতে পেরে খুশি, কিন্তু তিনি ডায়ানার প্রেমে পড়েননি।
স্পেন্সারের দাবি, ডায়ানা এই কথাটি পরবর্তী সময়ে তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কাছে বলেছিলেন। অর্থাৎ এটি চার্লস ও ডায়ানার মধ্যে কথোপকথনের সরাসরি সাক্ষ্য নয়; বরং ডায়ানার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে স্পেন্সারের বর্ণনা।
১৯৮১ সালের জুলাইয়ে চার্লস ও ডায়ানার বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যেই তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
‘তুমি তো একটু মোটা’—ডায়ানার শরীর নিয়ে মন্তব্যের দাবি
স্পেন্সার আরও দাবি করেছেন, বাগদানের ঘোষণার কয়েক দিনের মধ্যেই চার্লস ডায়ানার শরীর নিয়ে একটি মন্তব্য করেছিলেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, চার্লস ডায়ানার কোমর চেপে ধরে তাকে বলেছিলেন, ‘এখানে একটু মোটা হয়ে আছ, তাই না?’
স্পেন্সারের দাবি, এই মন্তব্য ডায়ানাকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। পরবর্তী সময়ে ডায়ানা বুলিমিয়ায় ভুগেছিলেন—এ বিষয়টি আগে থেকেই প্রকাশ্য। স্পেন্সার লিখেছেন, ডায়ানা তাকে জানিয়েছিলেন, বাগদান থেকে বিয়ের সময়ের মধ্যে তার কোমরের মাপ ২৯ ইঞ্চি থেকে কমে ২৩ দশমিক ৫ ইঞ্চিতে নেমে এসেছিল।
তবে ডায়ানার খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যার সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো একটি মন্তব্য বা ঘটনার সরাসরি কারণ-সম্পর্ক স্থাপন করা যায় না। স্পেন্সার এখানে মূলত তার বোনের নিজের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির বর্ণনা দিয়েছেন।
ডায়ানাকে আবার ‘এইচআরএইচ’ উপাধি দিতে চেয়েছিলেন রানী?
বইটির আরেকটি চমকপ্রদ দাবি ডায়ানার শেষকৃত্যের দিনকে ঘিরে।
স্পেন্সারের দাবি, ডায়ানার মৃত্যুর পর তৎকালীন রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ডায়ানাকে তার হারানো ‘এইচআরএইচ’—হিজ রয়্যাল হাইনেস—উপাধি ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
ডায়ানা ও চার্লসের বিবাহবিচ্ছেদের পর ডায়ানার রাজকীয় ‘এইচআরএইচ’ মর্যাদা আর বহাল ছিল না। স্পেন্সারের ভাষ্য অনুযায়ী, ডায়ানা এ সিদ্ধান্তে অত্যন্ত কষ্ট পেয়েছিলেন এবং তিনি এটিকে ছোট ও প্রতিহিংসাপূর্ণ আচরণ হিসেবে দেখতেন।
তাই মৃত্যুর পর সেই মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবকে স্পেন্সার তার বোনের জন্য অর্থহীন মনে করেছিলেন। তিনি রানীর ব্যক্তিগত সচিব রবার্ট ফেলোসের সঙ্গে কথোপকথনের প্রসঙ্গ তুলে লিখেছেন, ডায়ানা যখন আর বেঁচেই নেই, তখন তার জন্য এই উপাধির অর্থ কী?
পুরোনো ক্ষত নতুন করে সামনে
ডায়ানার মৃত্যু ব্রিটিশ রাজপরিবারের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। তার জীবন, চার্লসের সঙ্গে দাম্পত্য, ক্যামিলার সঙ্গে চার্লসের সম্পর্ক এবং বিবাহবিচ্ছেদ—সবকিছুই বহু বছর ধরে জনসাধারণের আলোচনার বিষয়।
চার্লস স্পেন্সারের নতুন বই সেই পুরোনো ঘটনাগুলোকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ডায়ানার মৃত্যুর পর চার্লসের কথিত প্রতিক্রিয়া নিয়ে তার বর্ণনা ব্রিটিশ রাজপরিবারের জন্য নতুন অস্বস্তি তৈরি করেছে।
তবে বইটির দাবিগুলোকে আলাদা করে দেখা জরুরি। এগুলোর একটি বড় অংশ স্পেন্সারের ব্যক্তিগত স্মৃতি, ডায়ানার কাছ থেকে শোনা কথা এবং ঘটনাগুলো সম্পর্কে তার নিজস্ব ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে লেখা। ফলে এগুলোকে প্রমাণিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে নয়, বরং ডায়ানার ঘনিষ্ঠ ভাইয়ের দৃষ্টিতে দেখা ঘটনাবলি হিসেবে বিবেচনা করাই বেশি সতর্ক অবস্থান।
‘সোয়ান সং’ প্রকাশের পর বইটির পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু সামনে এলে ডায়ানার জীবন ও রাজপরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















