সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে হামলার পর দেশটি লোহিত সাগরের বদলে উপসাগরীয় বন্দরগুলো থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বাড়িয়েছে। জাহাজ চলাচলের তথ্য বলছে, হামলার কারণে সরবরাহে যে বিঘ্ন তৈরি হয়েছিল, তা সামাল দিতে সৌদি আরামকো বিকল্প রপ্তানি পথ ব্যবহার করছে।
রোববার সৌদি আরামকো উপসাগরের ভেতরে সাতটি বিশাল আকারের অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেল তুলেছে। ট্যাংকার চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ট্যাংকারট্র্যাকার্স ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, এসব জাহাজ ছিল ‘ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার’ বা ভিএলসিসি শ্রেণির সুপারট্যাংকার।
রয়টার্সের দেখা উপগ্রহচিত্রেও রোববার সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরের কাছে সাতটি তেলবাহী জাহাজের অবস্থান দেখা গেছে। তবে সৌদি আরামকোর একজন মুখপাত্র এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে হামলার পর দেশটির তেল রপ্তানির ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর পাইপলাইনটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু তেলবন্দরে অপরিশোধিত তেল তোলা বন্ধ রাখতে হয়।
এর ফলে ইউরোপের কিছু ক্রেতার কাছে সৌদি আরামকোকে তেল সরবরাহ বাতিল করতে হয়েছে। একই সময়ে এশিয়ার বাজারের জন্য পূর্বাঞ্চলীয় বন্দর থেকে তেল সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। এসব বন্দর হরমুজ প্রণালির ভেতরে অবস্থিত।
তেল পরিবহন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ভর্টেক্সার তথ্য অনুযায়ী, ১২ সেপ্টেম্বরের পর থেকে সৌদি আরবের উপসাগরীয় বন্দরগুলো দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৭ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল তোলা হয়েছে। মাসের প্রথম ১১ দিনে এই পরিমাণ ছিল প্রতিদিন প্রায় ২৯ লাখ ব্যারেল।
অন্যদিকে, সেপ্টেম্বরের ১ থেকে ১১ তারিখ পর্যন্ত লোহিত সাগরীয় বন্দরগুলো থেকে সৌদি আরবের তেল তোলার পরিমাণ ছিল প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৯ লাখ ব্যারেল। অর্থাৎ পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি তেল রপ্তানির একটি বড় অংশ লোহিত সাগর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে সরে গেছে।
হরমুজ প্রণালিতে আবার বাড়ছে সৌদি তেলের প্রবাহ
সৌদি আরবের তেল রপ্তানিতে এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বৃদ্ধি। জেপি মরগানের বিশ্লেষকেরা ১৮ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিলেন, উপগ্রহভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী গত ছয় দিনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি তেলের প্রবাহ প্রতিদিন গড়ে ২৯ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে।
আগস্টে এই প্রবাহ ছিল প্রতিদিন মাত্র প্রায় ৭ লাখ ব্যারেল। ফলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি তেল পরিবহন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এ ছাড়া বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সৌদি আরব চলতি মাস ও আগামী মাসে রাস তানুরা বন্দর থেকে প্রায় ৬ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিক্রি করেছে। এসব তেল হরমুজ প্রণালির ভেতরে অবস্থিত ওমানের সোহার বন্দরে জাহাজ থেকে জাহাজে স্থানান্তরের মাধ্যমে পরিবহনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
![]()
তেলের দামে কী প্রভাব পড়ছে
সৌদি আরবের তেল সরবরাহ ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হচ্ছে—এমন প্রত্যাশা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপরও প্রভাব ফেলেছে। সোমবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে যায়। ৯ সেপ্টেম্বরের পর এই প্রথম ব্রেন্টের দাম ১০০ ডলারের নিচে নামল।
পাইপলাইনে হামলার পর সৌদি আরবের তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। কারণ পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনটি দেশটির পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র ও রপ্তানি অবকাঠামোকে লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। এই পথ ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ রয়েছে।
তবে পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সৌদি আরবকে এখন বেশি পরিমাণ তেল উপসাগরীয় বন্দর দিয়ে পাঠাতে হচ্ছে। এতে দেশটির রপ্তানি ব্যবস্থা অনেক বেশি হরমুজ প্রণালিনির্ভর হয়ে পড়ছে।
ফলে সৌদি তেল রপ্তানির আংশিক পুনরুদ্ধার আন্তর্জাতিক বাজারে স্বস্তি তৈরি করলেও হরমুজ প্রণালিতে কোনো নতুন নিরাপত্তা সংকট দেখা দিলে পরিস্থিতি আবার দ্রুত বদলে যেতে পারে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হিসেবে হরমুজের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় সৌদি আরবের পাশাপাশি এশিয়ার তেল আমদানিকারক দেশগুলোর জন্যও এই পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















