০১:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাশিয়ার হুমকিতে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তায় লিথুয়ানিয়ার নজিরবিহীন প্রস্তুতি হরমুজে তেল পরিবহনের নতুন কৌশল, খরচ বাড়ছে বহুগুণ প্রিন্সেস ডায়ানার ভাইয়ের নতুন বই ঘিরে রাজপরিবারে ফের উত্তেজনা গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তায় নতুন সমীকরণ, আর্কটিকের দায়িত্ব নেবে ন্যাটো ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষের দাবি দুই রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থীর, ট্রাম্পের অবস্থান থেকে দূরে সরে বার্তা পাইপলাইন হামলার পর উপসাগরীয় পথে সৌদির তেল রপ্তানি বাড়ছে গ্রিনল্যান্ডে নতুন দুই সামরিক ঘাঁটি গড়ছে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্কের সঙ্গে চুক্তি আজ ইসলামাবাদ ঘিরে কড়া নিরাপত্তা, পিটিআইয়ের মিছিলে যাচ্ছে ২০ হাজারের বেশি পুলিশ পিংক বাসে যাত্রী নেই, প্রতিদিন ৫০-৬০ হাজার টাকা লোকসান জাতিসংঘে তারেক রহমানের সংক্ষিপ্ত সফর, ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক নয়: হুমায়ূন কবির

রাশিয়ার হুমকিতে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তায় লিথুয়ানিয়ার নজিরবিহীন প্রস্তুতি

রাশিয়ার সীমান্তের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিদ্যুৎ গ্রিড সাবস্টেশন নির্মাণ করছে লিথুয়ানিয়া। তবে এটি হবে সাধারণ কোনো বিদ্যুৎ অবকাঠামো নয়। সম্ভাব্য সামরিক ড্রোন হামলা, বিস্ফোরকবোঝাই ট্রাক, ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ এবং নাশকতার মতো হুমকি মোকাবিলায় স্থাপনাটিকে বিশেষভাবে সুরক্ষিত করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

লিথুয়ানিয়ার বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রতিষ্ঠান লিটগ্রিডের প্রধান নির্বাহী আন্দ্রিয়ুস সেমেসকেভিচিয়ুস জানিয়েছেন, রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় বিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিরাপত্তা পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে অবকাঠামো নির্মাণের সময় মূলত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো ঝুঁকি বিবেচনা করা হতো। এখন সম্ভাব্য সব ধরনের প্রচলিত ও ‘হাইব্রিড’ হুমকি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

লিথুয়ানিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে নির্মিত হবে গিজাই সাবস্টেশন। এটি পোল্যান্ডের সঙ্গে লিথুয়ানিয়ার ‘হারমনি লিংক’ বিদ্যুৎ সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সংযোগের মাধ্যমে বাল্টিক অঞ্চলের বিদ্যুৎ গ্রিড ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত হবে।

ড্রোন হামলা ঠেকাতে বিশেষ নকশা

নতুন সাবস্টেশনের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় রয়েছে বিস্ফোরকবোঝাই ট্রাকের ধাক্কা ঠেকাতে সক্ষম শক্তিশালী বেড়া। পাশাপাশি সম্ভাব্য শত্রুপক্ষের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ শনাক্ত করতে বিশেষ সেন্সর বসানো হবে।

সাবস্টেশনের গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সফরমারগুলোকে রাখা হবে শক্তিশালী কংক্রিটের বিশেষ কাঠামোর ভেতরে। লিটগ্রিডের প্রধান নির্বাহীর ভাষায়, এগুলো অনেকটা ‘সারকোফ্যাগাসের’ মতো সুরক্ষা কাঠামো হবে। সাধারণ কংক্রিটের বদলে এমন কংক্রিট ব্যবহার করা হবে, যাতে প্লাস্টিকের তন্তু মেশানো থাকবে এবং বিস্ফোরণ বা আঘাতে সেটি সহজে ভেঙে না পড়ে।

কারণ আধুনিক যুদ্ধে ব্যবহৃত সস্তা ও দীর্ঘপাল্লার বিস্ফোরক ড্রোন বিদ্যুৎ অবকাঠামোর জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। রাশিয়া ইউক্রেনের সামরিক স্থাপনা, শহর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইরানে তৈরি ‘শাহেদ’ ধরনের ড্রোন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে।

Exclusive-Lithuania plans key substation near Russia, fortified a

সেমেসকেভিচিয়ুস বলেন, একাধিক শাহেদ ড্রোন একই সঙ্গে হামলা চালাতে পারে। এসব ড্রোনের কোনো কোনোটি বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক বহন করতে সক্ষম। তাই শুধু প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে সাবস্টেশন রক্ষা করা যথেষ্ট নয়।

গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির কিছু অংশ একাধিক সেট রাখা হবে। ফলে একটি ইউনিট হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য ইউনিট দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু রাখা সম্ভব হবে। কারণ এ ধরনের বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি ধ্বংস হলে তা নতুন করে তৈরি ও প্রতিস্থাপন করতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

বিশেষ সুরক্ষা কাঠামোর ভেতরে থাকা যন্ত্রপাতিকে অতিরিক্ত ঠান্ডা রাখার জন্য কৃত্রিম শীতলীকরণ ব্যবস্থাও প্রয়োজন হবে। ফলে নিরাপত্তা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

সুয়ালকি গ্যাপ ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ

গিজাই সাবস্টেশনের অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যকার এমন একটি অঞ্চলের কাছে, যেটি একদিকে রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ এবং অন্যদিকে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র বেলারুশের মাঝখানে অবস্থিত।

এই সরু ভূখণ্ডটি ‘সুয়ালকি গ্যাপ’ নামে পরিচিত। ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বহুদিন ধরেই এই অঞ্চলকে অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে মনে করা হয়।

রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করার পর অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বাল্টিক দেশগুলোও গত বছর রাশিয়ার বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ইউরোপীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

এ অবস্থায় হারমনি লিংক শুধু একটি বিদ্যুৎ সংযোগ প্রকল্প নয়, বরং সম্ভাব্য বড় ধরনের সংঘাতের সময় বাল্টিক দেশগুলোর বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

একজন আঞ্চলিক গ্রিড কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে এই সংযোগ লিথুয়ানিয়ার জন্য ‘লাইফলাইন’ হিসেবে কাজ করতে পারে। নাশকতার ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পটির নিরাপত্তা জোরদারের সিদ্ধান্তও ত্বরান্বিত হয়েছে।

Lithuanian defence budget: to strengthen Lithuanian Armed Forces fighting  power and further modernization | LR Krašto apsaugos ministerija

মস্কোর ‘ভুয়া পতাকা’ হামলার আশঙ্কা

রাশিয়া সরাসরি হামলা না চালিয়ে এমন কোনো ঘটনা ঘটাতে পারে, যার দায় অন্য কারও ওপর চাপানো সম্ভব—এমন আশঙ্কাও রয়েছে ইউরোপের নিরাপত্তা মহলে। এ ধরনের অভিযানকে ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ বা ভুয়া পরিচয়ে পরিচালিত হামলা বলা হয়।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছে, পোল্যান্ড ও বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলো আশঙ্কা করছে, রাশিয়া ন্যাটোর ঐক্য ও প্রতিক্রিয়া যাচাই করতে কোনো ভুয়া পতাকা ড্রোন হামলা চালাতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে জার্মানির বিদ্যুৎ গ্রিডেও একাধিক নাশকতার ঘটনা এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। জার্মান কর্তৃপক্ষ এসব ঘটনার জন্য মস্কোকে দায়ী করলেও রাশিয়া জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

লিথুয়ানিয়ার সামরিক বাহিনীও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর শারীরিক নিরাপত্তা জোরদারে লিটগ্রিডকে পরামর্শ দিচ্ছে।

বাড়ছে প্রকল্পের ব্যয়

নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানোর কারণে গিজাই সাবস্টেশনের নির্মাণ ব্যয় আগের হিসাবের তুলনায় অন্তত ৪ কোটি ৮০ লাখ ইউরো বেড়েছে। ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

লিথুয়ানিয়া চলতি মাসের শেষ দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে প্রকল্পের মোট ব্যয়ের অন্তত অর্ধেক বহনের অনুরোধ জানাবে বলে জানিয়েছেন দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী লুকাস সাভিকাস।

Lithuania strengthens protection of energy infrastructure - Baltic Wind

তার যুক্তি, রাশিয়ার সীমান্তবর্তী দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যয়ের পুরো বোঝা চাপানো উচিত নয়। কারণ এসব ব্যবস্থা শুধু লিথুয়ানিয়া বা পোল্যান্ডের নিরাপত্তার জন্য নয়, পুরো ইউরোপীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন।

পোল্যান্ডও একই অবস্থান নিয়েছে। দেশটির কৌশলগত জ্বালানি অবকাঠামোর দায়িত্বে থাকা উপ-জ্বালানিমন্ত্রী ভইচেখ ভ্রোখনা বলেছেন, হারমনি লিংক যেন ইউরোপের সবচেয়ে ব্যয়বহুল আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ সংযোগে পরিণত না হয়।

গত বছর বাল্টিক দেশগুলো ও পোল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে বিদ্যুৎ গ্রিডের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো নিরাপদ করতে ৩৮ কোটি ২০ লাখ ইউরো সহায়তা চেয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র ১১ কোটি ২০ লাখ ইউরো অনুমোদন করা হয়।

বিদ্যুৎ অবকাঠামো এখন নিরাপত্তার অংশ

লিথুয়ানিয়ার গিজাই সাবস্টেশনের পরিকল্পনা ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি বড় পরিবর্তনও তুলে ধরছে। আগে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা দুর্ঘটনাকে বিবেচনা করা হতো। এখন সামরিক ড্রোন, নাশকতা, সাইবার হামলা এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাতও একই পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠেছে।

৩৫ হেক্টরজুড়ে নির্মিতব্য সাবস্টেশনে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতিগুলো ছড়িয়ে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে কোনো একটি স্থানে হামলা হলেও পুরো ব্যবস্থাটি একসঙ্গে অচল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে।

লিথুয়ানিয়ার কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ গ্রিড শুধু অর্থনৈতিক অবকাঠামো নয়—এটি জাতীয় নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাশিয়ার সীমান্তের কাছে নির্মিত নতুন এই সাবস্টেশন সেই পরিবর্তিত বাস্তবতারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

রাশিয়ার হুমকিতে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তায় লিথুয়ানিয়ার নজিরবিহীন প্রস্তুতি

রাশিয়ার হুমকিতে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তায় লিথুয়ানিয়ার নজিরবিহীন প্রস্তুতি

১২:৫৫:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাশিয়ার সীমান্তের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিদ্যুৎ গ্রিড সাবস্টেশন নির্মাণ করছে লিথুয়ানিয়া। তবে এটি হবে সাধারণ কোনো বিদ্যুৎ অবকাঠামো নয়। সম্ভাব্য সামরিক ড্রোন হামলা, বিস্ফোরকবোঝাই ট্রাক, ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ এবং নাশকতার মতো হুমকি মোকাবিলায় স্থাপনাটিকে বিশেষভাবে সুরক্ষিত করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

লিথুয়ানিয়ার বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রতিষ্ঠান লিটগ্রিডের প্রধান নির্বাহী আন্দ্রিয়ুস সেমেসকেভিচিয়ুস জানিয়েছেন, রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় বিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিরাপত্তা পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে অবকাঠামো নির্মাণের সময় মূলত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো ঝুঁকি বিবেচনা করা হতো। এখন সম্ভাব্য সব ধরনের প্রচলিত ও ‘হাইব্রিড’ হুমকি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

লিথুয়ানিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে নির্মিত হবে গিজাই সাবস্টেশন। এটি পোল্যান্ডের সঙ্গে লিথুয়ানিয়ার ‘হারমনি লিংক’ বিদ্যুৎ সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সংযোগের মাধ্যমে বাল্টিক অঞ্চলের বিদ্যুৎ গ্রিড ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত হবে।

ড্রোন হামলা ঠেকাতে বিশেষ নকশা

নতুন সাবস্টেশনের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় রয়েছে বিস্ফোরকবোঝাই ট্রাকের ধাক্কা ঠেকাতে সক্ষম শক্তিশালী বেড়া। পাশাপাশি সম্ভাব্য শত্রুপক্ষের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ শনাক্ত করতে বিশেষ সেন্সর বসানো হবে।

সাবস্টেশনের গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সফরমারগুলোকে রাখা হবে শক্তিশালী কংক্রিটের বিশেষ কাঠামোর ভেতরে। লিটগ্রিডের প্রধান নির্বাহীর ভাষায়, এগুলো অনেকটা ‘সারকোফ্যাগাসের’ মতো সুরক্ষা কাঠামো হবে। সাধারণ কংক্রিটের বদলে এমন কংক্রিট ব্যবহার করা হবে, যাতে প্লাস্টিকের তন্তু মেশানো থাকবে এবং বিস্ফোরণ বা আঘাতে সেটি সহজে ভেঙে না পড়ে।

কারণ আধুনিক যুদ্ধে ব্যবহৃত সস্তা ও দীর্ঘপাল্লার বিস্ফোরক ড্রোন বিদ্যুৎ অবকাঠামোর জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। রাশিয়া ইউক্রেনের সামরিক স্থাপনা, শহর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইরানে তৈরি ‘শাহেদ’ ধরনের ড্রোন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে।

Exclusive-Lithuania plans key substation near Russia, fortified a

সেমেসকেভিচিয়ুস বলেন, একাধিক শাহেদ ড্রোন একই সঙ্গে হামলা চালাতে পারে। এসব ড্রোনের কোনো কোনোটি বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক বহন করতে সক্ষম। তাই শুধু প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে সাবস্টেশন রক্ষা করা যথেষ্ট নয়।

গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির কিছু অংশ একাধিক সেট রাখা হবে। ফলে একটি ইউনিট হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য ইউনিট দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু রাখা সম্ভব হবে। কারণ এ ধরনের বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি ধ্বংস হলে তা নতুন করে তৈরি ও প্রতিস্থাপন করতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

বিশেষ সুরক্ষা কাঠামোর ভেতরে থাকা যন্ত্রপাতিকে অতিরিক্ত ঠান্ডা রাখার জন্য কৃত্রিম শীতলীকরণ ব্যবস্থাও প্রয়োজন হবে। ফলে নিরাপত্তা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

সুয়ালকি গ্যাপ ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ

গিজাই সাবস্টেশনের অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যকার এমন একটি অঞ্চলের কাছে, যেটি একদিকে রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ এবং অন্যদিকে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র বেলারুশের মাঝখানে অবস্থিত।

এই সরু ভূখণ্ডটি ‘সুয়ালকি গ্যাপ’ নামে পরিচিত। ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বহুদিন ধরেই এই অঞ্চলকে অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে মনে করা হয়।

রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করার পর অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বাল্টিক দেশগুলোও গত বছর রাশিয়ার বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ইউরোপীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

এ অবস্থায় হারমনি লিংক শুধু একটি বিদ্যুৎ সংযোগ প্রকল্প নয়, বরং সম্ভাব্য বড় ধরনের সংঘাতের সময় বাল্টিক দেশগুলোর বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

একজন আঞ্চলিক গ্রিড কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে এই সংযোগ লিথুয়ানিয়ার জন্য ‘লাইফলাইন’ হিসেবে কাজ করতে পারে। নাশকতার ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পটির নিরাপত্তা জোরদারের সিদ্ধান্তও ত্বরান্বিত হয়েছে।

Lithuanian defence budget: to strengthen Lithuanian Armed Forces fighting  power and further modernization | LR Krašto apsaugos ministerija

মস্কোর ‘ভুয়া পতাকা’ হামলার আশঙ্কা

রাশিয়া সরাসরি হামলা না চালিয়ে এমন কোনো ঘটনা ঘটাতে পারে, যার দায় অন্য কারও ওপর চাপানো সম্ভব—এমন আশঙ্কাও রয়েছে ইউরোপের নিরাপত্তা মহলে। এ ধরনের অভিযানকে ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ বা ভুয়া পরিচয়ে পরিচালিত হামলা বলা হয়।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছে, পোল্যান্ড ও বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলো আশঙ্কা করছে, রাশিয়া ন্যাটোর ঐক্য ও প্রতিক্রিয়া যাচাই করতে কোনো ভুয়া পতাকা ড্রোন হামলা চালাতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে জার্মানির বিদ্যুৎ গ্রিডেও একাধিক নাশকতার ঘটনা এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। জার্মান কর্তৃপক্ষ এসব ঘটনার জন্য মস্কোকে দায়ী করলেও রাশিয়া জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

লিথুয়ানিয়ার সামরিক বাহিনীও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর শারীরিক নিরাপত্তা জোরদারে লিটগ্রিডকে পরামর্শ দিচ্ছে।

বাড়ছে প্রকল্পের ব্যয়

নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানোর কারণে গিজাই সাবস্টেশনের নির্মাণ ব্যয় আগের হিসাবের তুলনায় অন্তত ৪ কোটি ৮০ লাখ ইউরো বেড়েছে। ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

লিথুয়ানিয়া চলতি মাসের শেষ দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে প্রকল্পের মোট ব্যয়ের অন্তত অর্ধেক বহনের অনুরোধ জানাবে বলে জানিয়েছেন দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী লুকাস সাভিকাস।

Lithuania strengthens protection of energy infrastructure - Baltic Wind

তার যুক্তি, রাশিয়ার সীমান্তবর্তী দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যয়ের পুরো বোঝা চাপানো উচিত নয়। কারণ এসব ব্যবস্থা শুধু লিথুয়ানিয়া বা পোল্যান্ডের নিরাপত্তার জন্য নয়, পুরো ইউরোপীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন।

পোল্যান্ডও একই অবস্থান নিয়েছে। দেশটির কৌশলগত জ্বালানি অবকাঠামোর দায়িত্বে থাকা উপ-জ্বালানিমন্ত্রী ভইচেখ ভ্রোখনা বলেছেন, হারমনি লিংক যেন ইউরোপের সবচেয়ে ব্যয়বহুল আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ সংযোগে পরিণত না হয়।

গত বছর বাল্টিক দেশগুলো ও পোল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে বিদ্যুৎ গ্রিডের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো নিরাপদ করতে ৩৮ কোটি ২০ লাখ ইউরো সহায়তা চেয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র ১১ কোটি ২০ লাখ ইউরো অনুমোদন করা হয়।

বিদ্যুৎ অবকাঠামো এখন নিরাপত্তার অংশ

লিথুয়ানিয়ার গিজাই সাবস্টেশনের পরিকল্পনা ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি বড় পরিবর্তনও তুলে ধরছে। আগে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা দুর্ঘটনাকে বিবেচনা করা হতো। এখন সামরিক ড্রোন, নাশকতা, সাইবার হামলা এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাতও একই পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠেছে।

৩৫ হেক্টরজুড়ে নির্মিতব্য সাবস্টেশনে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতিগুলো ছড়িয়ে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে কোনো একটি স্থানে হামলা হলেও পুরো ব্যবস্থাটি একসঙ্গে অচল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে।

লিথুয়ানিয়ার কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ গ্রিড শুধু অর্থনৈতিক অবকাঠামো নয়—এটি জাতীয় নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাশিয়ার সীমান্তের কাছে নির্মিত নতুন এই সাবস্টেশন সেই পরিবর্তিত বাস্তবতারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ।