১১:৫১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০২ জানুয়ারী ২০২৬

পর্ব ৫: নবাবগঞ্জের কৃষকের ঈদ — আলু আর আত্মসম্মানের ভারে নুয়ে পড়া জীবন

দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার কথা উঠলেই প্রথমে যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো—আলু। এই এলাকার কৃষকেরা বিখ্যাত তাঁদের আলু উৎপাদনের জন্য। কিন্তু এই খ্যাতি যেন তাঁদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন বেশি, বাজারে চাপ বেশি, লাভ কম। তার ওপরে এবার ঈদ এসেছে এমন এক সময়ে, যখন কৃষকের হাতে নেই টাকাও, নেই আশার বাতাসও। আছে শুধু হিসাবের খাতা, ঋণের চাপ আর সন্তানের চাহিদা মেটানোর অপূর্ণতা।

আলু হয়েছেটাকা আসেনি

নবাবগঞ্জের কৃষক আবুল কাশেম (৬০) বলেন, “আমার ছয় বিঘা জমির আলু উঠেছে মার্চে। ফলন ভালোই হয়েছে। কিন্তু দাম? আমি হিমাগারে রেখেছিলাম কিছু আলু, ভেবেছিলাম দাম বাড়বে। কিন্তু আজও সেই হিমাগারে পড়ে আছে। বাজারে গেলে ফড়িয়ারা বলে, ১২ টাকা কেজির বেশি দিব না।”

আবুল কাশেমের হিসাব বলছে, প্রতি বিঘা জমিতে খরচ হয়েছে প্রায় ৪০-৪৫ হাজার টাকা। কিন্তু যে দামে বিক্রি হয়েছে, তাতে প্রতি বিঘায় কমপক্ষে ৮-১০ হাজার টাকা করে লোকসান গুনতে হয়েছে। “শ্রমিকদের মজুরি, সার, বীজ, সেচ—সবই বাড়তি খরচ হয়েছে এবার। অথচ দাম কমেছে। এটা কেমন সুবিচার?”

পারিবারিক চাহিদা আর ঈদের বাস্তবতা

আবুল কাশেমের স্ত্রী রাশিদা খাতুন বলেন, “বড় মেয়েটা এবার বলেছে, গরু কাটা হবে তো আব্বা? ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমি চুপ করে ছিলাম। কী বলব, ঘরের চাল কিনতেই কষ্ট হচ্ছে।”

পরিবারের শিশুদের ঈদের নতুন জামার বায়না, স্ত্রীর রান্নার চিন্তা, কোরবানির সামাজিক চাপ—সব মিলে নবাবগঞ্জের কৃষকেরা যেন এক অদৃশ্য ভার বয়ে চলেছেন।

হিমাগার যেন গলার ফাঁস

এই অঞ্চলে শতাধিক হিমাগার থাকলেও কৃষকেরা বলছেন, এই হিমাগারগুলো আজ আর তাঁদের বন্ধু নয়। বরং নিয়ন্ত্রিত দামে হিমাগারে আলু রাখতে গিয়ে ভাড়া, কমিশন, পরিবহন খরচ এমনভাবে বেড়েছে যে লাভ তো দূরের কথা, মুলধনও ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না।

নবাবগঞ্জের কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, “হিমাগারে এক মণ আলু রাখতে খরচ হয় ২২০-২৫০ টাকা। যদি পরে ১৩ টাকায় বিক্রি করতে হয়, তাহলে লাভ কী? ফড়িয়া তো সব আগেই দখল করে বসে থাকে।”

ঈদে কোরবানিআছে কিনা প্রশ্ন

আবুল কাশেম বললেন, “আমরা প্রতিবছর গরু কাটি। বাড়ির উঠানে গরু বাঁধা থাকে, বাচ্চারা দৌড়ায়, মেহমান আসে। এবার আমি বলেছি, ভাই-ব্রাদার মিলে একটা গরু কিনি। না হলে সার আর বীজ কিনতে হবে ধার করে।”

তিনি আরও বলেন, “ঈদ শুধু মাংস খাওয়া না, আত্মত্যাগের শিক্ষা। আমরা এই বছর গরু না কাটলেও অনেক কিছু ত্যাগ করছি—মেয়ের জামা, ছেলের পাঞ্জাবি, স্ত্রীর ইচ্ছা—সবই কেটে ফেলা ঈদের আগেই।”

সামাজিক চাপ ও আত্মসম্মান

নবাবগঞ্জের গ্রামগুলোতে ঈদের কোরবানি একধরনের প্রতিযোগিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কার গরু বড়, কে আগে কোরবানি করছে—এসব নিয়েই চলে আলোচনা। এর মাঝেই অনেক কৃষক নিজেদের অপ্রস্তুত অবস্থায় আবিষ্কার করছেন।

সাইফুল ইসলাম বলেন, “চাষ করি বলেই কি ঈদে কোরবানি দিতে পারব না? প্রতিবেশী বুঝবে না আমি কষ্টে আছি। তারা শুধু দেখবে আমার উঠানে গরু নাই।”

এই দৃষ্টিভঙ্গিই অনেককে ধাক্কা দিচ্ছে অপ্রয়োজনীয় খরচে, আবার কেউ কেউ আত্মসম্মান নিয়ে ক্ষোভ জমিয়ে বসে আছেন।

আগামী চাষের চিন্তা আরও তীব্র

আলু শেষ হলেও শুরু হয়েছে আবার আগাম প্রস্তুতি। ধান বা সরিষা নয়, আলুই নবাবগঞ্জের চাষিদের মূল ফসল। তাই জমি প্রস্তুত, সার মজুদ, বীজ জোগাড়—সবই করতে হবে ঈদের পরপরই। কিন্তু সেই খরচ চালানোর জন্য হাতে টাকা নেই।

আবুল কাশেম বলেন, “আগে কোরবানি দিয়ে আলাদা একটা আনন্দ হতো। এখন মনে হয়, কোরবানি করলেই ধার করতে হবে। পরে চাষ করতে গিয়ে আবার সুদের টাকা গুনতে হবে।”

প্রশাসনের সহানুভূতি ও কৃষকের আর্তি

নবাবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, সরকার কৃষকদের জন্য ভর্তুকি মূল্যে বীজ ও সার দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে এই সহায়তা বাস্তবায়নের আগে আলুর বাজারে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।

রাশিদা খাতুন বলেন, “কেবল আশ্বাসে তো চাষ হয় না। আমাদের দরকার মুল্যমান।”

ছোট ঈদবড় দায়িত্ব

নবাবগঞ্জের অনেক ঘরেই এবারের ঈদ ছোট। তবে সেই ছোট ঈদের মাঝেও আছে বড় ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ। সন্তানের মুখে হাসি, প্রতিবেশীর সঙ্গে ভাগ করে খাওয়া, পরিবারের একসঙ্গে নামাজে যাওয়া—এইসবই কৃষকের ঈদ।

আবুল কাশেম বলেন, “আমরা কোরবানি দিতে না পারলেও চেষ্টা করছি খুশি থাকতে। এটা আমাদের লড়াই, আমাদের আত্মসম্মানের বিষয়। আলু দিয়ে টাকা আসুক বা না আসুক, আমরা চেষ্টা করে যাব।”

এই চেষ্টার মধ্যেই টিকে থাকে নবাবগঞ্জের কৃষকের ঈদ। তাঁদের কোরবানি শুধু পশু নয়—তাঁদের আত্মত্যাগ, ধৈর্য আর সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই।

সমাপ্ত

জনপ্রিয় সংবাদ

পর্ব ৫: নবাবগঞ্জের কৃষকের ঈদ — আলু আর আত্মসম্মানের ভারে নুয়ে পড়া জীবন

০৫:০০:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ জুন ২০২৫

দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার কথা উঠলেই প্রথমে যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো—আলু। এই এলাকার কৃষকেরা বিখ্যাত তাঁদের আলু উৎপাদনের জন্য। কিন্তু এই খ্যাতি যেন তাঁদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন বেশি, বাজারে চাপ বেশি, লাভ কম। তার ওপরে এবার ঈদ এসেছে এমন এক সময়ে, যখন কৃষকের হাতে নেই টাকাও, নেই আশার বাতাসও। আছে শুধু হিসাবের খাতা, ঋণের চাপ আর সন্তানের চাহিদা মেটানোর অপূর্ণতা।

আলু হয়েছেটাকা আসেনি

নবাবগঞ্জের কৃষক আবুল কাশেম (৬০) বলেন, “আমার ছয় বিঘা জমির আলু উঠেছে মার্চে। ফলন ভালোই হয়েছে। কিন্তু দাম? আমি হিমাগারে রেখেছিলাম কিছু আলু, ভেবেছিলাম দাম বাড়বে। কিন্তু আজও সেই হিমাগারে পড়ে আছে। বাজারে গেলে ফড়িয়ারা বলে, ১২ টাকা কেজির বেশি দিব না।”

আবুল কাশেমের হিসাব বলছে, প্রতি বিঘা জমিতে খরচ হয়েছে প্রায় ৪০-৪৫ হাজার টাকা। কিন্তু যে দামে বিক্রি হয়েছে, তাতে প্রতি বিঘায় কমপক্ষে ৮-১০ হাজার টাকা করে লোকসান গুনতে হয়েছে। “শ্রমিকদের মজুরি, সার, বীজ, সেচ—সবই বাড়তি খরচ হয়েছে এবার। অথচ দাম কমেছে। এটা কেমন সুবিচার?”

পারিবারিক চাহিদা আর ঈদের বাস্তবতা

আবুল কাশেমের স্ত্রী রাশিদা খাতুন বলেন, “বড় মেয়েটা এবার বলেছে, গরু কাটা হবে তো আব্বা? ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমি চুপ করে ছিলাম। কী বলব, ঘরের চাল কিনতেই কষ্ট হচ্ছে।”

পরিবারের শিশুদের ঈদের নতুন জামার বায়না, স্ত্রীর রান্নার চিন্তা, কোরবানির সামাজিক চাপ—সব মিলে নবাবগঞ্জের কৃষকেরা যেন এক অদৃশ্য ভার বয়ে চলেছেন।

হিমাগার যেন গলার ফাঁস

এই অঞ্চলে শতাধিক হিমাগার থাকলেও কৃষকেরা বলছেন, এই হিমাগারগুলো আজ আর তাঁদের বন্ধু নয়। বরং নিয়ন্ত্রিত দামে হিমাগারে আলু রাখতে গিয়ে ভাড়া, কমিশন, পরিবহন খরচ এমনভাবে বেড়েছে যে লাভ তো দূরের কথা, মুলধনও ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না।

নবাবগঞ্জের কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, “হিমাগারে এক মণ আলু রাখতে খরচ হয় ২২০-২৫০ টাকা। যদি পরে ১৩ টাকায় বিক্রি করতে হয়, তাহলে লাভ কী? ফড়িয়া তো সব আগেই দখল করে বসে থাকে।”

ঈদে কোরবানিআছে কিনা প্রশ্ন

আবুল কাশেম বললেন, “আমরা প্রতিবছর গরু কাটি। বাড়ির উঠানে গরু বাঁধা থাকে, বাচ্চারা দৌড়ায়, মেহমান আসে। এবার আমি বলেছি, ভাই-ব্রাদার মিলে একটা গরু কিনি। না হলে সার আর বীজ কিনতে হবে ধার করে।”

তিনি আরও বলেন, “ঈদ শুধু মাংস খাওয়া না, আত্মত্যাগের শিক্ষা। আমরা এই বছর গরু না কাটলেও অনেক কিছু ত্যাগ করছি—মেয়ের জামা, ছেলের পাঞ্জাবি, স্ত্রীর ইচ্ছা—সবই কেটে ফেলা ঈদের আগেই।”

সামাজিক চাপ ও আত্মসম্মান

নবাবগঞ্জের গ্রামগুলোতে ঈদের কোরবানি একধরনের প্রতিযোগিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কার গরু বড়, কে আগে কোরবানি করছে—এসব নিয়েই চলে আলোচনা। এর মাঝেই অনেক কৃষক নিজেদের অপ্রস্তুত অবস্থায় আবিষ্কার করছেন।

সাইফুল ইসলাম বলেন, “চাষ করি বলেই কি ঈদে কোরবানি দিতে পারব না? প্রতিবেশী বুঝবে না আমি কষ্টে আছি। তারা শুধু দেখবে আমার উঠানে গরু নাই।”

এই দৃষ্টিভঙ্গিই অনেককে ধাক্কা দিচ্ছে অপ্রয়োজনীয় খরচে, আবার কেউ কেউ আত্মসম্মান নিয়ে ক্ষোভ জমিয়ে বসে আছেন।

আগামী চাষের চিন্তা আরও তীব্র

আলু শেষ হলেও শুরু হয়েছে আবার আগাম প্রস্তুতি। ধান বা সরিষা নয়, আলুই নবাবগঞ্জের চাষিদের মূল ফসল। তাই জমি প্রস্তুত, সার মজুদ, বীজ জোগাড়—সবই করতে হবে ঈদের পরপরই। কিন্তু সেই খরচ চালানোর জন্য হাতে টাকা নেই।

আবুল কাশেম বলেন, “আগে কোরবানি দিয়ে আলাদা একটা আনন্দ হতো। এখন মনে হয়, কোরবানি করলেই ধার করতে হবে। পরে চাষ করতে গিয়ে আবার সুদের টাকা গুনতে হবে।”

প্রশাসনের সহানুভূতি ও কৃষকের আর্তি

নবাবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, সরকার কৃষকদের জন্য ভর্তুকি মূল্যে বীজ ও সার দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে এই সহায়তা বাস্তবায়নের আগে আলুর বাজারে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।

রাশিদা খাতুন বলেন, “কেবল আশ্বাসে তো চাষ হয় না। আমাদের দরকার মুল্যমান।”

ছোট ঈদবড় দায়িত্ব

নবাবগঞ্জের অনেক ঘরেই এবারের ঈদ ছোট। তবে সেই ছোট ঈদের মাঝেও আছে বড় ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ। সন্তানের মুখে হাসি, প্রতিবেশীর সঙ্গে ভাগ করে খাওয়া, পরিবারের একসঙ্গে নামাজে যাওয়া—এইসবই কৃষকের ঈদ।

আবুল কাশেম বলেন, “আমরা কোরবানি দিতে না পারলেও চেষ্টা করছি খুশি থাকতে। এটা আমাদের লড়াই, আমাদের আত্মসম্মানের বিষয়। আলু দিয়ে টাকা আসুক বা না আসুক, আমরা চেষ্টা করে যাব।”

এই চেষ্টার মধ্যেই টিকে থাকে নবাবগঞ্জের কৃষকের ঈদ। তাঁদের কোরবানি শুধু পশু নয়—তাঁদের আত্মত্যাগ, ধৈর্য আর সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই।

সমাপ্ত