হোয়াইট হাউসে নতুন ক্ষমতার রূপ
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তার সিদ্ধান্তগুলো আর তেমনভাবে থামানো যাচ্ছে না। প্রথম মেয়াদে তার উপদেষ্টারা নিয়মিতভাবে তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করতেন—শুল্কনীতি, অভিবাসন বা ফেডারেল রিজার্ভে হস্তক্ষেপের মতো বিষয়ে। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি কম সংখ্যক বিরোধী কণ্ঠস্বরের মধ্যে রয়েছেন। এক প্রাক্তন কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, ট্রাম্প বুঝে গেছেন, তিনি যা চান তা আটকানোর মতো কিছু নেই।
নীতি ও সিদ্ধান্তের নতুন ধারা
গত কয়েক দিনে ট্রাম্প ডাকযোগে ভোট বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন, নগদ জামিনবিহীন নীতি বাতিল করতে স্থানীয় সরকারকে চাপ দিয়েছেন এবং সেনা পাঠানোর হুমকি দিয়েছেন বাল্টিমোর, নিউ ইয়র্ক ও শিকাগোতে। এগুলো প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমারেখা অতিক্রম করার মতো পদক্ষেপ।
সবচেয়ে বিতর্কিত পদক্ষেপগুলোর একটি হলো ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর লিসা কুককে অপসারণের চেষ্টা, যা সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
‘একদিনের স্বৈরশাসক’ থেকে নতুন বক্তব্য
প্রচারণার সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি শুধু প্রথম দিনে স্বৈরশাসকের মতো আচরণ করবেন। দ্বিতীয় মেয়াদে এসে তিনি প্রায়শই স্বৈরশাসন নিয়ে মন্তব্য করছেন। এক বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, অনেক মানুষ বলছে হয়তো স্বৈরশাসক ভালো হতে পারে। যদিও তিনি নিজে বলেন, তিনি স্বৈরশাসক নন।

আগ্রাসী পদক্ষেপ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপ
জানুয়ারি থেকে ট্রাম্প বিশ্ববিদ্যালয়, আইন সংস্থা, প্রযুক্তি ও গণমাধ্যম কোম্পানিকে চাপে রেখেছেন এবং বড় অঙ্কের সমঝোতা আদায় করেছেন। তিনি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের আপত্তি উপেক্ষা করে লস অ্যাঞ্জেলেসে সেনা পাঠিয়েছেন, ওয়াশিংটনের পুলিশ বাহিনী নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন, চাকরির তথ্য প্রকাশকারী এক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যাপক ছাঁটাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি যেসব প্রতিষ্ঠানে তার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই, সেখানেও কর্মকর্তা অপসারণের চেষ্টা করেছেন।
নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা
প্রেসিডেন্সিয়াল ইতিহাসবিদ ডগলাস ব্রিঙ্কলি বলেছেন, ট্রাম্প যেন সব প্রতিষ্ঠানকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান। একে তিনি বর্ণনা করেছেন, ট্রাম্প যেন সবাইকে ধরে বলতে চান—‘আমি দায়িত্বে আছি’।
এই প্রবণতা শুধু নীতি নয়, প্রতীকেও ছড়িয়েছে। তিনি হোয়াইট হাউসে সোনালি অলংকরণ বসিয়েছেন, নতুন পতাকাদণ্ড স্থাপন করেছেন এবং অতিথিদের মাঝে ‘ট্রাম্প ২০২৮’ লেখা টুপি বিতরণ করছেন, যদিও সংবিধান অনুযায়ী তিনি আরেকটি মেয়াদে প্রার্থী হতে পারবেন না।
সামরিক কুচকাওয়াজ ও প্রতীকী প্রদর্শন
জুন মাসে সেনাবাহিনীর ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ট্রাম্প সামরিক কুচকাওয়াজ আয়োজন করেন। তার প্রথম মেয়াদে কর্মকর্তারা এমন আয়োজন আটকে দিয়েছিলেন, কারণ এটি স্বৈরাচারী দেশের মতো মনে হতে পারে। এবার ট্রাম্প আরও বড় প্রদর্শনীর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

ভিন্ন এক ট্রাম্প হোয়াইট হাউস
প্রথম মেয়াদে তৎকালীন চিফ অব স্টাফ জন এফ. কেলি বা অর্থনৈতিক উপদেষ্টা গ্যারি কোহনের মতো কর্মকর্তারা তাকে প্রভাবিত করতে পারতেন। তারা তাকে অভিবাসীদের তৃতীয় দেশে পাঠানো, বিচার বিভাগের তদন্তে হস্তক্ষেপ করা বা ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া থেকে বিরত রেখেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে এমন প্রতিবন্ধকতা নেই। এক ঘনিষ্ঠ মিত্রের ভাষায়, এখন আর কেউ ট্রাম্পকে থামানোর চেষ্টা করছে না; বরং সবাই তার নির্দেশ মেনে চলছে।
ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ
আমেরিকার ইতিহাসে প্রেসিডেন্টরা নিজেদের ক্ষমতা অনুযায়ী অফিসকে রূপ দিয়েছেন—অ্যান্ড্রু জ্যাকসন ছিলেন জনতার প্রেসিডেন্ট, আব্রাহাম লিংকন দাসপ্রথা বিলোপ করেছেন, এফডিআর কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তুলেছেন। ট্রাম্পের যুগটি চিহ্নিত হচ্ছে ক্ষমতার সর্বোচ্চ কেন্দ্রীকরণ দিয়ে।
তিনি নিজেই বলেছেন, “আমি যা চাই তাই করার অধিকার আমার আছে।”
হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া
প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, ট্রাম্প জনগণের চাহিদা বুঝতে ও রাজনৈতিক প্রবৃত্তি কাজে লাগাতে অসাধারণ দক্ষ। তার মতে, সবাই জানে ট্রাম্পই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন এবং তিনি একটি শক্তিশালী টিম গড়ে তুলেছেন।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিকে নতুন এক রূপ দিয়েছে—যেখানে ক্ষমতার সীমা ও ঐতিহ্যগত রীতি ভেঙে এককভাবে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। সমর্থকরা একে শক্তিশালী নেতৃত্ব হিসেবে দেখছেন, আর সমালোচকেরা আশঙ্কা করছেন, গণতন্ত্রের মূল কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















