০৬:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬
প্রেডিকশন মার্কেটে গোপন তথ্যের খেলা, ইরান হামলা থেকে মাদুরো গ্রেপ্তার—উঠছে ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের অভিযোগ বেবিমনস্টারের ‘চুম’ ভিডিওতে ১০ কোটির মাইলফলক, বিশ্বজুড়ে বাড়ছে জনপ্রিয়তা স্টারবাকসের ‘ট্যাংক ডে’ বিতর্কে ক্ষোভ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ক্ষমা চাইল মার্কিন সদর দপ্তর আল সুপাঙ্গানের সোনালি জন্মদিনে জমকালো আয়োজন, ডেনিম থিমে মুখর সন্ধ্যা জাপানের বৃদ্ধাশ্রমে নতুন ভরসা তরুণ বডিবিল্ডার ও কুস্তিগিররা ডাবলিনে গান, গল্প আর শিল্পের শহুরে জাদু ইরাকের মরুভূমিতে গোপন ইসরায়েলি ঘাঁটি, এক রাখালের মৃত্যুর পর ফাঁস চাঞ্চল্যকর তথ্য ফিলিপাইনে মার্কিন শিল্প হাব ঘিরে বিতর্ক, বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে না ম্যানিলা দামযুদ্ধের মধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়ায় বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে নতুন আশার বার্তা ভারতের আমদানি বিল নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ, সতর্কবার্তা দিলেন মোদি

নেপালের সামনে কী, রাজতন্ত্র, সেনা না তরুণরা ?

প্রধানমন্ত্রী ওলির আকস্মিক পদত্যাগ

দুই দিনব্যাপী জেন-জেড তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া সহিংস বিক্ষোভে অন্তত ২০ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হওয়ার পর, গত মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলি আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করেন। হেলিকপ্টারে তার পালিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গত বছরের ভারতমুখী পালানোর ঘটনার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিদ্রোহ নয়অর্থনৈতিক হতাশার বিস্ফোরণ

এই আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক বিদ্রোহ নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অর্থনৈতিক হতাশার বহিঃপ্রকাশ। দক্ষিণ এশিয়ার দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি নেপালে বেকারত্বের হার প্রায় ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে। তরুণদের জন্য গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি কার্যত শূন্য হয়ে গেছে। কর্মসংস্থান বা শিল্পায়নের পরিবর্তে দেশটি এখনো বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল।

দুর্নীতি ও বৈষম্য নিয়ে ক্ষোভ

রাজনীতিক শ্রেণির দুর্নীতি এবং তাদের বিলাসী জীবনযাপন সাধারণ মানুষের দারিদ্র্যের সঙ্গে ভয়াবহ বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। এই বৈষম্য তরুণ সমাজকে ক্ষুব্ধ করেছে। টিকটকের মতো সামাজিক মাধ্যম পুলিশি দমনপীড়ন ও অর্থনৈতিক হতাশার ভিডিও ছড়িয়ে আন্দোলনকে আরও উসকে দিয়েছে। সরকার সামাজিক মাধ্যম বন্ধ করা ও কারফিউ জারি করার চেষ্টা করলেও আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়।

নেপালের সামনে অনিশ্চিত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

ওলির পতনের পর নেপালের সামনে বড় প্রশ্ন—এবার কি সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করবে? রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন কি গতি পাবে? নাকি তরুণ প্রজন্ম পুরো ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাবে? পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করছেন, এ সংকট দক্ষিণ এশিয়ার ভঙ্গুর গণতন্ত্রগুলোর মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

রাজতন্ত্রের প্রতি অতীতের আকর্ষণ

গত বছর নেপালে রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল। সেটি অনেকের কাছে পশ্চাদপদ মনে হলেও বাস্তবে তা ছিল দুর্নীতি ও অচলাবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের হতাশার প্রকাশ। চীনের অর্থায়নে বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্প থেকে শুরু করে ভিসা কেলেঙ্কারি, শ্রম রপ্তানিতে অনিয়ম—সবকিছু সাধারণ মানুষকে হতবাক করে তুলেছিল। অনেকের কাছে রাজতন্ত্র মানে ছিল একটি কেন্দ্রীয় ও কার্যকর শাসনব্যবস্থা, যা বর্তমান অচল রাজনীতির চেয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ মনে হতো।

একই হতাশার ভিন্ন প্রকাশ

রাজতন্ত্রপন্থী আন্দোলন হোক বা বর্তমান তরুণদের বিদ্রোহ—দুটিই আসলে একই হতাশার ভিন্ন রূপ। কোনোটিই সুস্পষ্ট ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দেয় না, তবে উভয়ই একটি ব্যর্থ বাস্তবতা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে।

সেনারাজতন্ত্র না কি তরুণ বিপ্লবীরা?

এখন প্রশ্ন হলো—দেশটি কি সেনা বা রাজতন্ত্রের সমর্থিত শক্তির মাধ্যমে স্থিতিশীল হবে, নাকি তরুণ বিদ্রোহীরা পুরো অতীতকে প্রত্যাখ্যান করে নতুন কোনো ব্যবস্থার পথ তৈরি করবে? অনেকে আশঙ্কা করছেন, বাংলাদেশে যেমন প্রযুক্তিবিদ মুহাম্মদ ইউনুসকে নিয়ে একটি ছাত্রনেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল, তেমন কিছু নেপালেও ঘটতে পারে। ইতিমধ্যেই কাঠমান্ডুর তরুণ মেয়র বালেন্দ্র শাহ-এর নাম আলোচনায় আসছে। তিনি একজন প্রকৌশলী, র‌্যাপার ও সংগীতশিল্পী, তবে তার রাজনৈতিক অভিমুখ বা আন্তর্জাতিক যোগসূত্র স্পষ্ট নয়।

সম্ভাব্য পরিকল্পিত আন্দোলন

তরুণদের এই আন্দোলন একদিকে সত্যিকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ, অন্যদিকে এটি নেপালের রাজনৈতিক মানচিত্র নতুনভাবে সাজানোর জন্য একটি পরিকল্পিত উদ্যোগও হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক মহল, আঞ্চলিক শক্তি ও নেপালের ভেতরের গোষ্ঠীগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে যাতে বৈধ আন্দোলনকে গোপন স্বার্থের হাতিয়ার বানানো না হয়। নেপালের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শুধু আন্দোলন দমন নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, জবাবদিহিমূলক শাসন ও নাগরিকদের মর্যাদা ও সুযোগ সুনিশ্চিত করার ওপর।

নেপালের যাত্রা অতীতকে ফিরিয়ে আনা বা পুরনো প্রতীকে আঁকড়ে ধরা নয়। বরং প্রয়োজন একটি নতুন ভবিষ্যৎ গঠন করা, যেখানে ব্যর্থ ব্যবস্থার জায়গায় সত্যিকার সংস্কার আসবে এবং তরুণ প্রজন্মের আশা আর অপূর্ণ থেকে যাবে না।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রেডিকশন মার্কেটে গোপন তথ্যের খেলা, ইরান হামলা থেকে মাদুরো গ্রেপ্তার—উঠছে ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের অভিযোগ

নেপালের সামনে কী, রাজতন্ত্র, সেনা না তরুণরা ?

১২:০৯:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫

প্রধানমন্ত্রী ওলির আকস্মিক পদত্যাগ

দুই দিনব্যাপী জেন-জেড তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া সহিংস বিক্ষোভে অন্তত ২০ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হওয়ার পর, গত মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলি আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করেন। হেলিকপ্টারে তার পালিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গত বছরের ভারতমুখী পালানোর ঘটনার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিদ্রোহ নয়অর্থনৈতিক হতাশার বিস্ফোরণ

এই আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক বিদ্রোহ নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অর্থনৈতিক হতাশার বহিঃপ্রকাশ। দক্ষিণ এশিয়ার দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি নেপালে বেকারত্বের হার প্রায় ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে। তরুণদের জন্য গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি কার্যত শূন্য হয়ে গেছে। কর্মসংস্থান বা শিল্পায়নের পরিবর্তে দেশটি এখনো বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল।

দুর্নীতি ও বৈষম্য নিয়ে ক্ষোভ

রাজনীতিক শ্রেণির দুর্নীতি এবং তাদের বিলাসী জীবনযাপন সাধারণ মানুষের দারিদ্র্যের সঙ্গে ভয়াবহ বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। এই বৈষম্য তরুণ সমাজকে ক্ষুব্ধ করেছে। টিকটকের মতো সামাজিক মাধ্যম পুলিশি দমনপীড়ন ও অর্থনৈতিক হতাশার ভিডিও ছড়িয়ে আন্দোলনকে আরও উসকে দিয়েছে। সরকার সামাজিক মাধ্যম বন্ধ করা ও কারফিউ জারি করার চেষ্টা করলেও আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়।

নেপালের সামনে অনিশ্চিত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

ওলির পতনের পর নেপালের সামনে বড় প্রশ্ন—এবার কি সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করবে? রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন কি গতি পাবে? নাকি তরুণ প্রজন্ম পুরো ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাবে? পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করছেন, এ সংকট দক্ষিণ এশিয়ার ভঙ্গুর গণতন্ত্রগুলোর মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

রাজতন্ত্রের প্রতি অতীতের আকর্ষণ

গত বছর নেপালে রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল। সেটি অনেকের কাছে পশ্চাদপদ মনে হলেও বাস্তবে তা ছিল দুর্নীতি ও অচলাবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের হতাশার প্রকাশ। চীনের অর্থায়নে বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্প থেকে শুরু করে ভিসা কেলেঙ্কারি, শ্রম রপ্তানিতে অনিয়ম—সবকিছু সাধারণ মানুষকে হতবাক করে তুলেছিল। অনেকের কাছে রাজতন্ত্র মানে ছিল একটি কেন্দ্রীয় ও কার্যকর শাসনব্যবস্থা, যা বর্তমান অচল রাজনীতির চেয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ মনে হতো।

একই হতাশার ভিন্ন প্রকাশ

রাজতন্ত্রপন্থী আন্দোলন হোক বা বর্তমান তরুণদের বিদ্রোহ—দুটিই আসলে একই হতাশার ভিন্ন রূপ। কোনোটিই সুস্পষ্ট ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দেয় না, তবে উভয়ই একটি ব্যর্থ বাস্তবতা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে।

সেনারাজতন্ত্র না কি তরুণ বিপ্লবীরা?

এখন প্রশ্ন হলো—দেশটি কি সেনা বা রাজতন্ত্রের সমর্থিত শক্তির মাধ্যমে স্থিতিশীল হবে, নাকি তরুণ বিদ্রোহীরা পুরো অতীতকে প্রত্যাখ্যান করে নতুন কোনো ব্যবস্থার পথ তৈরি করবে? অনেকে আশঙ্কা করছেন, বাংলাদেশে যেমন প্রযুক্তিবিদ মুহাম্মদ ইউনুসকে নিয়ে একটি ছাত্রনেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল, তেমন কিছু নেপালেও ঘটতে পারে। ইতিমধ্যেই কাঠমান্ডুর তরুণ মেয়র বালেন্দ্র শাহ-এর নাম আলোচনায় আসছে। তিনি একজন প্রকৌশলী, র‌্যাপার ও সংগীতশিল্পী, তবে তার রাজনৈতিক অভিমুখ বা আন্তর্জাতিক যোগসূত্র স্পষ্ট নয়।

সম্ভাব্য পরিকল্পিত আন্দোলন

তরুণদের এই আন্দোলন একদিকে সত্যিকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ, অন্যদিকে এটি নেপালের রাজনৈতিক মানচিত্র নতুনভাবে সাজানোর জন্য একটি পরিকল্পিত উদ্যোগও হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক মহল, আঞ্চলিক শক্তি ও নেপালের ভেতরের গোষ্ঠীগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে যাতে বৈধ আন্দোলনকে গোপন স্বার্থের হাতিয়ার বানানো না হয়। নেপালের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শুধু আন্দোলন দমন নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, জবাবদিহিমূলক শাসন ও নাগরিকদের মর্যাদা ও সুযোগ সুনিশ্চিত করার ওপর।

নেপালের যাত্রা অতীতকে ফিরিয়ে আনা বা পুরনো প্রতীকে আঁকড়ে ধরা নয়। বরং প্রয়োজন একটি নতুন ভবিষ্যৎ গঠন করা, যেখানে ব্যর্থ ব্যবস্থার জায়গায় সত্যিকার সংস্কার আসবে এবং তরুণ প্রজন্মের আশা আর অপূর্ণ থেকে যাবে না।