০৮:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬
শেভরনের দ্বিধা ও ভেনেজুয়েলার ঝুঁকি: ট্রাম্পের চাপেও বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে অনিচ্ছা ভারত–নিউজিল্যান্ড টি-টোয়েন্টি সিরিজে দাপুটে সূচনা, ৪৮ রানে জয় ভারতের মার্কিন ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিকিৎসা সহযোগিতা জোরদার ডাভোসে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির বৈঠক, ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে ‘সমাধানের কাছাকাছি’ যুক্তরাষ্ট্রের দাবি বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সই হচ্ছে, নতুন দিগন্তে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক  অস্ট্রেলিয়া ডে ঘিরে সন্ত্রাস পরিকল্পনার অভিযোগ: পিএইচডি শিক্ষার্থীর জামিন নামঞ্জুর ইয়েমেনের এডেনে কনভয়ে বোমা হামলা: নিহত ৫, আহত কমান্ডার কাবুলের রেস্তোরাঁ হামলায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কড়া নিন্দা ভারত–স্পেনের ‘জিরো টলারেন্স’ বার্তা: সন্ত্রাস দমনে নতুন কূটনৈতিক জোট ট্রাম্পের ইঙ্গিত: উত্তরসূরি হিসেবে জেডি ভ্যান্স, মার্কো রুবিও ও স্কট বেসেন্ট

পশ্চিম নয়, এশিয়াই এখন বিদেশি শিক্ষার্থীদের নতুন ভরসাস্থল

বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্ন থেকে পরিবর্তন

চীনের হুবেই প্রদেশের ইয়াং নামের এক তরুণী ছোটবেলা থেকেই আমেরিকায় পড়াশোনার স্বপ্ন দেখতেন। ১৩ বছর বয়সে বোস্টন সফরে গিয়ে ঘাসের ওপর বসে বই পড়া শিক্ষার্থীদের দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। তার চোখে, “বিদেশে পড়াশোনা” মানেই এমন দৃশ্য। ২০২২ সালে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পর তিনি পিএইচডি করতে চাইলেন। কিন্তু সে সময় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং আমেরিকার ভিসা নিয়ম কঠোর হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি সিঙ্গাপুরকে বেছে নেন, যেখানে কাগজপত্র নিয়ে বারবার দুশ্চিন্তা করতে হয় না এবং পরিবারের কাছাকাছি থাকা যায়।

পশ্চিমের বিকল্প খুঁজছে এশিয়ান শিক্ষার্থীরা

দীর্ঘদিন ধরে উচ্চাকাঙ্ক্ষী এশিয়ান শিক্ষার্থীরা আমেরিকা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা—এই চার ইংরেজিভাষী দেশে পড়তে যাওয়াকেই মূল লক্ষ্য মনে করত। এতে ওই দেশগুলো মেধাবী তরুণ এবং বিপুল অর্থ দুই-ই পেত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই জনপ্রিয়তা কিছুটা কমেছে। ২০২০ সালে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সেখানে পড়তে যেতেন, যা এখন নেমে এসেছে ৩৫ শতাংশে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী পশ্চিমে না গিয়ে এশিয়ার ভেতরেই নতুন শিক্ষাস্থান বেছে নিচ্ছেন।

কেন এশিয়ার প্রতি ঝোঁক বাড়ছে

১. বড় চার দেশের কড়াকড়ি ভিসা ও অভিবাসন নিয়ম শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করছে।
২. পূর্ব এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে ক্রমেই উঁচুতে উঠছে, ফলে মর্যাদাও বাড়ছে।
৩. খরচ তুলনামূলকভাবে কম। ভারতের শিক্ষার্থীদের বিদেশে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া এক পরামর্শক জানান, আগে সবাই শুধু আমেরিকা বা ব্রিটেন চাইত, এখন অনেকেই জাপান, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার কথা ভাবছে।

মহামারির প্রভাব

কোভিড মহামারি চলাকালে অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সিদ্ধান্ত নেন, ঘরের কাছাকাছি থাকাই নিরাপদ। সেই প্রবণতা এখনো বহাল। অনেকেই পশ্চিমা দেশগুলোকে অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক মনে করছেন। ব্রিটিশ কাউন্সিলের এক জরিপ অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পূর্ব এশিয়ায় পড়তে যাওয়া এশিয়ান শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।

নতুন লক্ষ্য ও কৌশল

জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান এখন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

  • ২০২৪ সালে জাপানে ৩ লাখ ৩৭ হাজার বিদেশি শিক্ষার্থী ছিল, যা এক বছরে ২১ শতাংশ বৃদ্ধি। এর মধ্যে ৯০ শতাংশই এশিয়ান। দেশটির লক্ষ্য ২০৩৩ সালের মধ্যে ৪ লাখ শিক্ষার্থী নেওয়া।
  • তাইওয়ান চায় ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষার্থী সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি করে ৩ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছাতে।
  • হংকং-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেক আসন এখন বিদেশিদের জন্য খোলা হচ্ছে, যা আগে ছিল মাত্র ২০ শতাংশ।

সব দেশই বেশি ইংরেজি মাধ্যম কোর্স চালু করছে, বৃত্তি বাড়াচ্ছে এবং পড়াশোনার পর কাজ পাওয়াকে সহজ করছে।

জনসংখ্যা সংকট ও নরম শক্তি

কম জন্মহার এবং শ্রমিক ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। জাপানের হিতোৎসুবাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিরোশি ওতা সতর্ক করেছেন, পর্যাপ্ত বিদেশি শিক্ষার্থী না পেলে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে কূটনৈতিক সম্পর্কও জোরদার হচ্ছে। তাইওয়ান তার ‘নিউ সাউথবাউন্ড পলিসি’র মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করছে।

চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা

  • হংকং, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো অঞ্চলে জায়গার সীমাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।
  • চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় স্থানীয় ভাষার জটিলতা চাকরি পাওয়ার সুযোগ সীমিত করছে।
  • অভিবাসন নিয়ে জনমতও ক্রমশ সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। জাপানের ডানপন্থী দল সানসেইতো চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির সমালোচনা করছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

চীনা শিক্ষার্থীরা এখনো সবচেয়ে বড় অংশ হলেও, চীনে তরুণ জনসংখ্যা কমায় এ সংখ্যা ভবিষ্যতে হ্রাস পেতে পারে। তবে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান কুয়ারাকুয়েরেলি সাইমন্ডসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭০ লাখ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী রয়েছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৮০ লাখ ৫০ হাজারে। আর এ প্রতিযোগিতায় এশিয়ার দেশগুলোও বড় অংশ নিতে চায়।

জনপ্রিয় সংবাদ

শেভরনের দ্বিধা ও ভেনেজুয়েলার ঝুঁকি: ট্রাম্পের চাপেও বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে অনিচ্ছা

পশ্চিম নয়, এশিয়াই এখন বিদেশি শিক্ষার্থীদের নতুন ভরসাস্থল

১২:৫১:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫

বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্ন থেকে পরিবর্তন

চীনের হুবেই প্রদেশের ইয়াং নামের এক তরুণী ছোটবেলা থেকেই আমেরিকায় পড়াশোনার স্বপ্ন দেখতেন। ১৩ বছর বয়সে বোস্টন সফরে গিয়ে ঘাসের ওপর বসে বই পড়া শিক্ষার্থীদের দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। তার চোখে, “বিদেশে পড়াশোনা” মানেই এমন দৃশ্য। ২০২২ সালে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পর তিনি পিএইচডি করতে চাইলেন। কিন্তু সে সময় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং আমেরিকার ভিসা নিয়ম কঠোর হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি সিঙ্গাপুরকে বেছে নেন, যেখানে কাগজপত্র নিয়ে বারবার দুশ্চিন্তা করতে হয় না এবং পরিবারের কাছাকাছি থাকা যায়।

পশ্চিমের বিকল্প খুঁজছে এশিয়ান শিক্ষার্থীরা

দীর্ঘদিন ধরে উচ্চাকাঙ্ক্ষী এশিয়ান শিক্ষার্থীরা আমেরিকা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা—এই চার ইংরেজিভাষী দেশে পড়তে যাওয়াকেই মূল লক্ষ্য মনে করত। এতে ওই দেশগুলো মেধাবী তরুণ এবং বিপুল অর্থ দুই-ই পেত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই জনপ্রিয়তা কিছুটা কমেছে। ২০২০ সালে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সেখানে পড়তে যেতেন, যা এখন নেমে এসেছে ৩৫ শতাংশে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী পশ্চিমে না গিয়ে এশিয়ার ভেতরেই নতুন শিক্ষাস্থান বেছে নিচ্ছেন।

কেন এশিয়ার প্রতি ঝোঁক বাড়ছে

১. বড় চার দেশের কড়াকড়ি ভিসা ও অভিবাসন নিয়ম শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করছে।
২. পূর্ব এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে ক্রমেই উঁচুতে উঠছে, ফলে মর্যাদাও বাড়ছে।
৩. খরচ তুলনামূলকভাবে কম। ভারতের শিক্ষার্থীদের বিদেশে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া এক পরামর্শক জানান, আগে সবাই শুধু আমেরিকা বা ব্রিটেন চাইত, এখন অনেকেই জাপান, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার কথা ভাবছে।

মহামারির প্রভাব

কোভিড মহামারি চলাকালে অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সিদ্ধান্ত নেন, ঘরের কাছাকাছি থাকাই নিরাপদ। সেই প্রবণতা এখনো বহাল। অনেকেই পশ্চিমা দেশগুলোকে অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক মনে করছেন। ব্রিটিশ কাউন্সিলের এক জরিপ অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পূর্ব এশিয়ায় পড়তে যাওয়া এশিয়ান শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।

নতুন লক্ষ্য ও কৌশল

জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান এখন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

  • ২০২৪ সালে জাপানে ৩ লাখ ৩৭ হাজার বিদেশি শিক্ষার্থী ছিল, যা এক বছরে ২১ শতাংশ বৃদ্ধি। এর মধ্যে ৯০ শতাংশই এশিয়ান। দেশটির লক্ষ্য ২০৩৩ সালের মধ্যে ৪ লাখ শিক্ষার্থী নেওয়া।
  • তাইওয়ান চায় ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষার্থী সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি করে ৩ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছাতে।
  • হংকং-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেক আসন এখন বিদেশিদের জন্য খোলা হচ্ছে, যা আগে ছিল মাত্র ২০ শতাংশ।

সব দেশই বেশি ইংরেজি মাধ্যম কোর্স চালু করছে, বৃত্তি বাড়াচ্ছে এবং পড়াশোনার পর কাজ পাওয়াকে সহজ করছে।

জনসংখ্যা সংকট ও নরম শক্তি

কম জন্মহার এবং শ্রমিক ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। জাপানের হিতোৎসুবাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিরোশি ওতা সতর্ক করেছেন, পর্যাপ্ত বিদেশি শিক্ষার্থী না পেলে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে কূটনৈতিক সম্পর্কও জোরদার হচ্ছে। তাইওয়ান তার ‘নিউ সাউথবাউন্ড পলিসি’র মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করছে।

চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা

  • হংকং, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো অঞ্চলে জায়গার সীমাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।
  • চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় স্থানীয় ভাষার জটিলতা চাকরি পাওয়ার সুযোগ সীমিত করছে।
  • অভিবাসন নিয়ে জনমতও ক্রমশ সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। জাপানের ডানপন্থী দল সানসেইতো চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির সমালোচনা করছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

চীনা শিক্ষার্থীরা এখনো সবচেয়ে বড় অংশ হলেও, চীনে তরুণ জনসংখ্যা কমায় এ সংখ্যা ভবিষ্যতে হ্রাস পেতে পারে। তবে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান কুয়ারাকুয়েরেলি সাইমন্ডসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭০ লাখ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী রয়েছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৮০ লাখ ৫০ হাজারে। আর এ প্রতিযোগিতায় এশিয়ার দেশগুলোও বড় অংশ নিতে চায়।