বাংলাদেশের নদীমাতৃক ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল নাম ‘কালিগঙ্গা’। মানিকগঞ্জ জেলার বুক চিরে প্রবাহিত এই নদী শুধু একটি জলরাশি নয়—এটি স্থানীয় মানুষের জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এক প্রবাহমান ইতিহাস। পদ্মা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে এই নদী কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। একসময় কালিগঙ্গা ছিল মানিকগঞ্জ অঞ্চলের বাণিজ্য, কৃষি ও পরিবহনের মূল ভরকেন্দ্র; আজ সেটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের উদাসীনতা, দখলদারিত্ব ও দূষণের কারণে।
ভৌগোলিক অবস্থান ও উৎস
কালিগঙ্গা নদী মূলত পদ্মা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর, সাটুরিয়া ও মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ধলেশ্বরীতে মিশেছে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৭০ কিলোমিটার। নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলো—যেমন ঘিওর উপজেলার বালিয়াখোড়া, সাটুরিয়ার বানিয়াজুরী ও মানিকগঞ্জ সদর এলাকার দিঘুলিয়া—প্রকৃতপক্ষে এই নদীরই সন্তান।
এক সময় পদ্মা থেকে নিরবচ্ছিন্ন পানি প্রবাহিত হয়ে কালিগঙ্গাকে সক্রিয় রেখেছিল, কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে ও খালের মুখে পলি জমে এই প্রবাহ এখন অনেকাংশে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বর্ষাকালে নদী কিছুটা প্রাণ ফিরে পেলেও শুষ্ক মৌসুমে তার বুক ফেটে যায়।
নামের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য
‘কালিগঙ্গা’ নামটি নিয়ে নানা জনশ্রুতি রয়েছে। কেউ বলেন, এটি দেবী কালীকে উৎসর্গ করে নামকরণ করা হয়, আবার কেউ বলেন নদীর কালোচে পানির কারণে স্থানীয়রা একে ‘কালিগঙ্গা’ নামে ডাকতে শুরু করে। আরেকটি জনপ্রিয় মত অনুযায়ী, প্রাচীনকালে এই নদী ছিল ধর্মীয় আচার ও পূজার সঙ্গে যুক্ত, যেখানে কালীপূজা উপলক্ষে নদীঘাটে তীর্থযাত্রীরা ভিড় জমাতেন। ফলে নদীর সঙ্গে কালী দেবীর নাম যুক্ত হয়ে যায় স্থায়ীভাবে।
ঐতিহাসিক দলিলপত্রে দেখা যায়, ১৮ ও ১৯ শতকে এই নদীপথ দিয়ে কলকাতা, নারায়ণগঞ্জ ও মানিকগঞ্জের মধ্যে বাণিজ্য চলত। চাল, পাট, মাছ, লবণ ও তেল পরিবহনের জন্য কালিগঙ্গা ছিল প্রধান রুট।
প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও জীববৈচিত্র্য
কালিগঙ্গা নদীর পাড়ে এক সময় ছিল বিশাল সবুজ বনায়ন—তেঁতুল, কাঁঠাল, বাবলা ও গজার গাছের সারি। নদীর জলে পাওয়া যেত রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াল, তেলাপিয়া, কই, টেংরা, শোল ও চিংড়ির মতো মাছের প্রাচুর্য। বর্ষার মৌসুমে পাড়ের ধানক্ষেত ও বিলজুড়ে দেখা যেত অতিথি পাখির ভিড়।
নদীর এই জৈব সম্পদ স্থানীয় জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল। জেলে, কৃষক, মাঝি, নৌকা নির্মাতা ও কুমার সম্প্রদায়ের অর্থনীতি এই নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল। বিশেষ করে সাটুরিয়ার বানিয়াজুরী ও ঘিওরের আঙ্গারপাড়া এলাকায় মাছ ধরার নৌকা ও জাল তৈরির গ্রামগুলো আজও সেই ঐতিহ্যের সাক্ষী।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব
মানিকগঞ্জে কৃষি উৎপাদনের অন্যতম উৎস ছিল কালিগঙ্গা নদীর পানি। বর্ষাকালে নিয়ন্ত্রিত প্লাবনে জমির উর্বরতা বাড়ত। নদীর পানি ব্যবহার করে সেচ দেওয়া হতো ধান, পাট ও সবজি চাষে। এ ছাড়া ২০ শতকের প্রথমভাগে নদীপথে নৌবাণিজ্য ছিল এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, স্থানীয় হাটবাজারগুলো—যেমন ঘিওর বাজার, বালিয়াখোড়া হাট ও মানিকগঞ্জ সদর হাট—মূলত নদীঘাটের কাছেই গড়ে ওঠে।
অতীতে নৌকা চলাচল, পণ্য পরিবহন, এমনকি ডাক ব্যবস্থা পর্যন্ত নদীকেন্দ্রিক ছিল। খালপথে মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে পৌঁছাতে সময় লাগত মাত্র এক দিন।
নদী ও সংস্কৃতি: লোকগীতি ও জনজীবনের প্রতিফলন
কালিগঙ্গা শুধু জীবিকার উৎস নয়, এটি মানিকগঞ্জের সংস্কৃতিরও একটি প্রতীক। ভাটিয়ালি, মারফতি, পালাগান ও নৌকা বাইচের মতো লোকজ সংস্কৃতি নদীর পাড়েই জন্ম নিয়েছিল। নদীপাড়ের মানুষ গান গেয়ে বলত —
“কালিগঙ্গার বুকে চলে নাও, মাঝি হাসে তালে তালে,
বৃষ্টি পড়ে সুরের ঢেউয়ে, মন ভাসে কালো জলে।”
এমন গান নদীর প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসা ও সম্পর্কের প্রতিফলন। প্রতি বছর বর্ষাকালে নৌকা বাইচের আয়োজন এখনো কিছু এলাকায় টিকে আছে, যদিও আগের মতো জাঁকজমক আর নেই।
কালিগঙ্গার দুঃখ: দূষণ ও দখল
বর্তমান সময়ের কালিগঙ্গা যেন অতীতের ছায়ামাত্র। নদীর তীরে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা, ইটভাটা ও বর্জ্য ফেলার কারণে এর জলের মান ভয়াবহভাবে দূষিত হয়েছে। সাটুরিয়া ও মানিকগঞ্জ সদর এলাকায় নদীর দুই তীরে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানার বর্জ্য সরাসরি পানিতে পড়ছে। স্থানীয় কৃষকরা অভিযোগ করেন, এই দূষিত পানি দিয়ে জমিতে সেচ দিলে ফসলের ক্ষতি হয়।
নদীর প্রস্থ দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। যেখানে একসময় ছিল ২০০-৩০০ মিটার প্রশস্ত জলধারা, এখন তা কোথাও কোথাও ৫০ মিটারেরও কমে নেমে এসেছে। স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক উচ্ছেদ অভিযান হলেও দখলদাররা ফের ফিরে আসে, কারণ নদী রক্ষায় নেই স্থায়ী মনোযোগ বা জনঅংশগ্রহণ।
পরিবেশগত প্রভাব
নদী সংকোচনের কারণে বর্ষায় প্লাবন বেড়েছে, আবার শুষ্ক মৌসুমে জলাভাব দেখা দিচ্ছে। ফলত, কৃষি উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। তদুপরি, মাছের প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় মৎস্যসম্পদ প্রায় বিলুপ্তির পথে। আগে যে কালিগঙ্গার তীরে শতাধিক প্রজাতির পাখি দেখা যেত, এখন তা হাতেগোনা কয়েকটি।
পুনরুদ্ধারের প্রয়াস
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো নদী পুনরুদ্ধারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে। ২০২২ সালে ‘কালিগঙ্গা নদী সংরক্ষণ আন্দোলন’ নামের এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নদীর সীমানা নির্ধারণ ও দখলমুক্তির দাবিতে মানববন্ধন ও গণস্বাক্ষর অভিযান চালায়। তাছাড়া মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীর প্রবাহ পুনরুজ্জীবনে খনন প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছে।
সরকারও ২০২৩ সালে কালিগঙ্গা নদীকে অবৈধ দখলমুক্ত ঘোষণার আওতায় এনেছে, যদিও বাস্তবায়নের অগ্রগতি খুব ধীর। তবু জনগণের মধ্যে নদী রক্ষার সচেতনতা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
নদীর সঙ্গে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও ঘটনা
মানিকগঞ্জের ইতিহাসে কালিগঙ্গার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু কিংবদন্তি ও ঐতিহাসিক ঘটনা। কথিত আছে, মোগল আমলে এই নদীপথ দিয়েই স্থানীয় জমিদাররা পণ্য আনা-নেওয়া করতেন। ব্রিটিশ শাসনামলে এখানে স্থাপিত হয় ঘাট ও নৌবন্দর। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কালিগঙ্গার তীরে মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলা আক্রমণ চালিয়েছিলেন পাকিস্তানি সেনাদের ওপর। বিশেষত সাটুরিয়ার বানিয়াজুরী ঘাট ছিল এক সময় গোপন আশ্রয়কেন্দ্র।
সাহিত্য ও শিল্পে কালিগঙ্গার প্রতিফলন
বাংলা সাহিত্যেও কালিগঙ্গা নদীর উল্লেখ পাওয়া যায়। স্থানীয় কবি ও সাহিত্যিকরা নদীর বেদনা, ভালোবাসা ও পরিবর্তনের গল্পকে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁদের কবিতায়। মানিকগঞ্জের কবি আব্দুল আলীম লিখেছিলেন —
“কালিগঙ্গার ঢেউ থেমে গেছে, তবু মন ভাসে স্মৃতির নৌকায়,
বালুচরে এখন শুধু ঘাস, তবু শুনি জলের সুর।”
এই নদী মানিকগঞ্জের সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক অমোচনীয় অধ্যায় হয়ে আছে।
পর্যটন সম্ভাবনা
কালিগঙ্গা নদী ঘিরে প্রকৃতির এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ বিরাজমান। বালিয়াখোড়া, সাটুরিয়া ও দিঘুলিয়া অঞ্চলের নদীতীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। এখানে নৌভ্রমণ, পাখি পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় হাট-বাজারের সংস্কৃতি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। তবে পর্যটন উন্নয়নের কোনো স্থায়ী অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি।
যদি নদী পুনরুদ্ধার ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে কালিগঙ্গা সহজেই হতে পারে মানিকগঞ্জের ‘ইকো-ট্যুরিজম হাব’।
স্থানীয় জীবনের সঙ্গে নদীর বর্তমান সম্পর্ক
যদিও নদী তার আগের জৌলুস হারিয়েছে, তবু এখনও মানিকগঞ্জবাসীর জীবন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। অনেক কৃষক আজও এর পাড়ে চাষ করেন, জেলেরা বর্ষায় জাল ফেলেন, শিশুরা গ্রীষ্মে সাঁতার কাটে, আর বৃদ্ধরা বিকেলে নদীতীরে বসে অতীতের গল্প বলেন। নদী যেন মানিকগঞ্জের আত্মার প্রতীক, যা নিঃশব্দে মানুষের জীবনে প্রবাহিত।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়
নদী বাঁচাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রশাসনিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতা ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। নদীর তীরবর্তী এলাকার ইটভাটা, অবৈধ স্থাপনা ও শিল্পবর্জ্য বন্ধ করা জরুরি। একই সঙ্গে নদীর খনন, নাব্যতা ফিরিয়ে আনা ও তীর সংরক্ষণের কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
পরিবেশবিদদের মতে, যদি আগামী দশ বছরের মধ্যে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে কালিগঙ্গা হয়তো মানচিত্রেই কেবল থাকবে—বাস্তবে নয়।
কালিগঙ্গা নদী শুধু একটি নদী নয়; এটি মানিকগঞ্জের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জনজীবনের প্রতিচ্ছবি। এক সময় এই নদীই ছিল মানুষের আশা ও জীবিকার উৎস। আজ সেটিই বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে। নদীকে পুনরুজ্জীবিত করা মানে প্রকৃতি, ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচানো। কালিগঙ্গার পুনর্জাগরণে তাই প্রয়োজন সরকারের পরিকল্পিত পদক্ষেপ, স্থানীয় জনগণের সচেতনতা এবং প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ।
যদি আমরা সবাই মিলে এই নদীর প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারি, তবে কালিগঙ্গা আবারো হবে মানিকগঞ্জের গর্ব, জীবনের ছন্দে বয়ে চলা এক স্রোতস্বিনী নাম।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 























