০৭:৪৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষুদ্র ব্যবসায় বড় ধাক্কা, বাড়তি খরচে টিকে থাকাই এখন চ্যালেঞ্জ আফগান সীমান্তে ড্রোন অনুপ্রবেশের দাবি খারিজ, পাকিস্তানের পাল্টা বক্তব্য কাস্ত্রপকে না খেলানো নিয়ে প্রশ্ন, দক্ষিণ কোরিয়ার কোচের সিদ্ধান্তে বিতর্ক কোরিয়ান নাটকে ইন্দোনেশিয়ার কফি ক্যান্ডির ঝড়, জনপ্রিয়তার শীর্ষে কোপিকো ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইপিওর পথে রিলায়েন্স জিও, এআই খাতে বিশাল বিনিয়োগের পরিকল্পনা বিশ্বকাপের উন্মাদনায় ‘ক্যাপ্টেন সুবাসা’ এখন এআই ভিডিওতে, নতুন উদ্যোগ পিক্সভার্সের অস্ট্রেলিয়ায় ক্রীড়া বাজির বিজ্ঞাপনে লাগাম, তবু আসক্তি রোধে প্রশ্ন রয়ে গেল ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া কীভাবে দেওয়া হবে? ট্রাম্প প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞায় চাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান, বিভ্রান্ত কর্মীরা ব্রিটেনে চরম ডানের উত্থান: যখন ক্ষোভই রাজনীতির প্রধান ভাষা হয়ে ওঠে

ঢাকার ঈদ মিছিল: সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির স্মারক

  • Sarakhon Report
  • ০৭:৫৯:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪
  • 395

মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান

ঈদের আনন্দকে সামনে রেখে মোগল আমল থেকে ঢাকায় ঈদ আনন্দ মিছিল একটি অপরিহার্য আয়োজনে পরিণত হয়। যদিও সুলতানি আমল বা তারও আগে থেকে ঈদ পালনের রেওয়াজ শুরু হয়। কিন্তু ঢাকাকে কেন্দ্র করে যে ঈদ মিছিল তা স্থানীয় মোগল প্রশাসকদের হাত ধরে শুরু হয়। মোগল স¤্রাট হুমায়ূন কেন্দ্রীয় ভাবে ঈদ সমাবেশের আয়োজন শুরু করেন করেন। ধীরে ধীরে তা স্থানীয় মোগল প্রশাসকদেরও প্রভাবিত করে। ঈদের এই আয়োজনে শাসকদের পরিবারের সদস্যরাও অংশ নিতেন।

১৬০৮ সালে মোগল প্রশাসক ইসলাম খান চিশতি প্রথম যখন ঢাকায় আসেন তখন রোজা চলছিল। রোজা পরবর্তী এবং তার দায়িত্ব গ্রহণের সূচনা হিসেবে প্রথম ঈদেই তিনি আনন্দ সমাবেশের আয়োজন করেন। সদ্য বানানো লালবাগ মসজিদে ঈদের জামাত শেষে পদাতিক, ঘোড়সওয়ার ও হস্তিবাহিনী এই শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। মোগল লেখক মির্জা নাথান তার ‘বাহারীস্তান-ই গায়েবী’ বইয়ে জানিয়েছেন, রমজানে ছোট বড় প্রত্যেকে প্রতিদিন তাদের প্রিয়জনদের আবাসস্থলে যেত।

ঈদের চাঁদ ওঠা এবং ঈদের চাঁদ দেখতে পারার মধ্য দিয়ে ঈদের আনন্দ শুরু হয়ে যেত। খোলামাঠে বা বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে ঈদের চাঁদ দেখে মুনাজাত পড়া ছিল একটি সাধারণ ঘটনা। ঈদের চাঁদ দেখা ও তারপরে মোগল শাসকের উদ্যোগ নিয়ে মির্জা নাথান আরো জানান, ‘দিনের শেষে সন্ধ্যায় নতুন চাঁদ দেখা যায়। শাহী তুর্য বেজে ওঠে এবং একের পর এক গোলন্দাজ বাহিনী থেকে আতশবাজি শুরু হয়। সন্ধ্যার প্রথম থেকে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত গোলন্দাজ বাহিনী একটানা বন্দুকের গোলাগুলি ছুঁড়তে থাকে। রাত শেষের দিকে বন্দুক ছোঁড়া বন্ধ হয় এবং বড় কামান থেকে গোলা নিক্ষিপ্ত হতে থাকে। তাতে ভূমিকম্পের অবস্থা সৃষ্টি হয়।’

ঈদের চাঁদ সব সময়ই জনমনে আনন্দ বয়ে আনে। ঢাকায় নবাব আহসানউল্লাহ ঈদের চাঁদ দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে বুড়িগঙ্গার পাড়ে আহসান মঞ্জিলের বারান্দায় বসে থাকতেন। ঈদের দিন আহসান মঞ্জিলে বিশাল ভোজের আয়োজন করতেন তিনি।

ঈদের চাঁদ ওঠার আনন্দে শিশুরা আতশবাজি জ¦ালিয়ে ও পটকা ফুটিয়ে আনন্দ করার সংস্কৃতি অনেক পুরানো। এসব আতশবাজি শ্রেণীর মধ্যে ছিল তারাবাতি, মরিচ, ফোয়ারা, মাহতাবি, মাররা, হাওয়াই, চরকি, কবুতরি, টোল্টা, ব্যান্ডবাজি ইত্যাদি। এক সময় ঈদের চাঁদ দেখার মানসিক পূর্ণতা পাওয়া শুরু হয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানের মাধ্যমে। গানটি ঈদের অঘোষিত ‘জাতীয় উৎসব সঙ্গীতে’ পরিণত হয়েছে।

 

মোগল আমলে শোভাযাত্রা করে ঈদের জামাত পড়তে যাওয়ার রীতি ছিল। সবাই ভালো পোশাক পরে ঈদের নামাজে যেতেন এবং পথে দরিদ্রদের মাঝে অর্থ বিতরণ করতেন। বাচ্চাদের ঈদের উপহার বা সালামি দেওয়ার প্রথা শুরু হয় মূলত তখন থেকে। ধানমন্ডি ঈদগাহ তৈরি হয়েছে মোগল আমলে। সেখানে সবাই নামাজ পড়তে যেতেন। পল্টন ময়দানে এক সময় বড় ঈদ জামাত হতো। এক সময় ঢাকায় জন্মষ্টমী ও মহররমের মিছিল ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। এসব মিছিল ধর্মীয় বিষয়কে সামনে রেখে হলেও এতে সর্বধর্মীয় অংশগ্রহণ ছিল। এ কারণেই বলা হয়, ধর্ম যার যার উৎসব সবার। বৃটিশ শাসন কালে ঢাকায় তাদের মনোনীত প্রশাসক নায়েব নাজিমদের সময় ঈদের মিছিলের শোভাযাত্রা নবাব কাটারা, দেওয়ান বাজার, হোসেনী দালাল, বকশী বাজার, বেগম বাজার, বেচারাম দেউরী, ছোট কাটারা, বড় কাটারা, চক বাজার, উর্দু রোড এলাকায় বিস্তৃত ছিল। মিছিলের শুরুতে নায়েবে নাজিম হাতির পিঠে বসতেন। বাহারী ছাতা তার মাথায় ধরা থাকতো। হাতিকে সাজানো হতো রঙিন কাপড়ে। ঘোড়া, উট, পালকির পাশাপাশি শত সহ¯্র লাল, নীল, সবুজ, হলুদ সিল্কের পতাকা থাকতো অংশগ্রহণকারীদের হাতে। ঢোল, বাঁশি, কাড়া, নাকড়া, শিঙ্গাসহ নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র থাকতো। মিছিল দেখতে আসা শত শত মানুষ গোলাপের পাপড়ি ছিটিয়ে দিতো মিছিলকারীদের ওপর। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ আহসান মঞ্জিল, রায়সাহেব বাজার পুল, বংশাল, তিনকোণা পার্ক ও মাহুৎটুলীতে দাঁড়িয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন।

ঈদের মিছিল এক পর্যায়ে ঈদের পরদিন আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হয়। নানা ভাবে ১৯২০ সাল পর্যন্ত টানা মিছিলের আয়োজন হলেও মাঝখানে কিছু কারণে এক যুগের মতো বন্ধ ছিল। পরে আবার শুরু হয় এবং এর ব্যাপ্তি বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন মহল্লা থেকে মিছিল করে লোকজন আসতেন। এসব মিছিলের ওপর প্রতিযোগিতা হতো এবং পুরষ্কার দেয়া হতো। এমনকি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আবাসিক হল থেকেও মিছিলে ছাত্ররা অংশ নিতেন। সেখানে হলের শিক্ষকরাও অংশ নিতেন।

ঈদের দিন এক সাথে নামাজ পড়ার জন্য সবাই উদগ্রীব হয়ে থাকতেন। ঈদগাহ, বড় মাঠ কিংবা মসজিদে জামাতে সাধারণত পুরুষরা অংশ নেন। নারীদেরও ঈদ জামাত পড়ার আগ্রহ ছিল। কিন্তু এ বিষয়ে নানা সামাজিক বাধা ছিল। জাতির অনেক জটিল সমস্যা সমাধানের মতো এ কাজেও এগিয়ে আসেন ঋষিতুল্য শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ১৯৩৭ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ইমামতিতে কার্জন হলে ঢাকায় মহিলাদের প্রথমবারের মতো ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। শোনা যায় ‘মহিলাদের জামাতে ইমামতি করতে তখন কেউ রাজি হন নি’। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দীর্ঘদিনের অচলায়তনকে ভাঙ্গেন।
ঈদ মিছিল শুধু আনন্দ উৎসব নয়, এখানে সামাজিক সমস্যা এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদও ফুটে উঠতো। বৃটিশ আমলে উর্দু রোডের ইসমাইল সরদার একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গান লেখেন। এই গানটি ঈদ মিছিলে উর্দু রোডের হিন্দু ধোপারা রঙিন সাজে সেজে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে নেচে নেচে গাইতেন। গানের কথা ছিল এমন:

আও আও মিলকে চালে হিন্দু মুসলমান
দুনো হাম হায় পাড়োশী, ঝগড়া কাহেকা
আও আও মিলকে চালে হিন্দু মুসলমান

১৯১৯ সালে পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে বৃটিশ সেনাদের গুলিতে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনকারী ৩৭৯ জন মারা যান এবং বারোশর বেশি আহত হন। এই ঘটনার প্রতিবাদে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৃটিশদের দেয়া নাইটহুড পদবী প্রত্যাখ্যান করেন। একই ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকায় স্থানীয় লেখক হাকীম আরশাদ একটি গান লেখেন,

পাঞ্জাবকে আন্দার জালিয়ানওয়ালা বাগমে
কেতনে বাচ্চে কো তুনে এতিম এতিম বানায়ারে
কেতনে আওরাত কো তুনে বেওয়া বানায়ারে
বেকসুর গোলি চালায়ারে
হায় হায় তুনে বেকসুর গোলি চালায়ারে।

সেবার ঈদের মিছিলে প্রায় এক তৃতীয়াংশই শোকের প্রতীক কালো পোশাক পরেছিলেন। দশজন যুবক এই প্রতিবাদী গানটি ঈদ মিছিলে উচ্চকণ্ঠে গেয়ে শোনান। মিছিল শেষ না হতেই গানের লেখক ও অভিযুক্তদের রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে জেলে পাঠায় বৃটিশ সরকার।
লক্ষাধিক লোকের অংশগ্রহণে এক মাইলেরও বেশি লম্বা ঈদ মিছিলে নানা কৌতুকের ছলে সমাজ ও রাষ্ট্রের অনাকাঙ্খিত বিষয়গুলো তুলে ধরা হতো। মানুষ হাসি ঠাট্টার মধ্য দিয়ে সামাজিক সমস্যার বিষয়গুলো সবাইকে জানাতেন। ১৯৫৩ সালের দৈনিক আজাদ ঈদ মিছিল নিয়ে একটি প্রতিবেদনে জানায়, “ঈদের পর দিবস ঢাকার প্রসিদ্ধ ঈদের মিছিলটা খুবই আকর্ষণীয় হয়। এই মিছিল দেখার জন্য লক্ষ লক্ষ নাগরিক নওয়াবপুর রোড, জনসন রোড, সদরঘাট অঞ্চলে বেলা প্রায় ১২টা হইতে অপেক্ষা করিতে থাকে। শহরের বিভিন্ন ক্লাব ও সর্দারগণের উদ্যোগে এই মিছিল বাহির করা হয়।…সরকারী কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি, ভিসা অফিসের দুর্নীতি, ঔষধ বিক্রেতাগণ কর্তৃক চড়া মূল্যে ঔষধ বিক্রয়ের কারসাজি, প্রদেশের খাদ্য সমস্যা, চাষীগণের দুরাবস্থা, কাশ্মীর সমস্যার সমাধান, ঢাকা মিউনিসিপ্যালটির রাস্তার দুর্দশা ও তাহার প্রতিকার প্রভৃতি বিষয়ের ব্যঙ্গ রূপ দিয়া জনসাধারণের নিকট আকর্ষণীয়ভাবে তুলিয়া ধরা হয়। গতকল্য (সোমবার) পল্টন ময়দানে ঈদ উপলক্ষে এক বিরাট মেলা হয়।”

ঈদের শোভাযাত্রা দেখে আমেরিকার ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির লোক সংস্কৃতির অধ্যাপক হেনরি গøাসি মূল্যায়ন করেন এভাবে, ‘এই আদি অকৃত্রিম, দিলখোলা, মজার ঈদ প্যারেডে যে ভালো দিকটি উদযাপিত হয় সেটি এই জাতির বীরত্বগাঁথা, এর অর্জন।’

লেখক: সাংবাদিক

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষুদ্র ব্যবসায় বড় ধাক্কা, বাড়তি খরচে টিকে থাকাই এখন চ্যালেঞ্জ

ঢাকার ঈদ মিছিল: সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির স্মারক

০৭:৫৯:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪

মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান

ঈদের আনন্দকে সামনে রেখে মোগল আমল থেকে ঢাকায় ঈদ আনন্দ মিছিল একটি অপরিহার্য আয়োজনে পরিণত হয়। যদিও সুলতানি আমল বা তারও আগে থেকে ঈদ পালনের রেওয়াজ শুরু হয়। কিন্তু ঢাকাকে কেন্দ্র করে যে ঈদ মিছিল তা স্থানীয় মোগল প্রশাসকদের হাত ধরে শুরু হয়। মোগল স¤্রাট হুমায়ূন কেন্দ্রীয় ভাবে ঈদ সমাবেশের আয়োজন শুরু করেন করেন। ধীরে ধীরে তা স্থানীয় মোগল প্রশাসকদেরও প্রভাবিত করে। ঈদের এই আয়োজনে শাসকদের পরিবারের সদস্যরাও অংশ নিতেন।

১৬০৮ সালে মোগল প্রশাসক ইসলাম খান চিশতি প্রথম যখন ঢাকায় আসেন তখন রোজা চলছিল। রোজা পরবর্তী এবং তার দায়িত্ব গ্রহণের সূচনা হিসেবে প্রথম ঈদেই তিনি আনন্দ সমাবেশের আয়োজন করেন। সদ্য বানানো লালবাগ মসজিদে ঈদের জামাত শেষে পদাতিক, ঘোড়সওয়ার ও হস্তিবাহিনী এই শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। মোগল লেখক মির্জা নাথান তার ‘বাহারীস্তান-ই গায়েবী’ বইয়ে জানিয়েছেন, রমজানে ছোট বড় প্রত্যেকে প্রতিদিন তাদের প্রিয়জনদের আবাসস্থলে যেত।

ঈদের চাঁদ ওঠা এবং ঈদের চাঁদ দেখতে পারার মধ্য দিয়ে ঈদের আনন্দ শুরু হয়ে যেত। খোলামাঠে বা বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে ঈদের চাঁদ দেখে মুনাজাত পড়া ছিল একটি সাধারণ ঘটনা। ঈদের চাঁদ দেখা ও তারপরে মোগল শাসকের উদ্যোগ নিয়ে মির্জা নাথান আরো জানান, ‘দিনের শেষে সন্ধ্যায় নতুন চাঁদ দেখা যায়। শাহী তুর্য বেজে ওঠে এবং একের পর এক গোলন্দাজ বাহিনী থেকে আতশবাজি শুরু হয়। সন্ধ্যার প্রথম থেকে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত গোলন্দাজ বাহিনী একটানা বন্দুকের গোলাগুলি ছুঁড়তে থাকে। রাত শেষের দিকে বন্দুক ছোঁড়া বন্ধ হয় এবং বড় কামান থেকে গোলা নিক্ষিপ্ত হতে থাকে। তাতে ভূমিকম্পের অবস্থা সৃষ্টি হয়।’

ঈদের চাঁদ সব সময়ই জনমনে আনন্দ বয়ে আনে। ঢাকায় নবাব আহসানউল্লাহ ঈদের চাঁদ দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে বুড়িগঙ্গার পাড়ে আহসান মঞ্জিলের বারান্দায় বসে থাকতেন। ঈদের দিন আহসান মঞ্জিলে বিশাল ভোজের আয়োজন করতেন তিনি।

ঈদের চাঁদ ওঠার আনন্দে শিশুরা আতশবাজি জ¦ালিয়ে ও পটকা ফুটিয়ে আনন্দ করার সংস্কৃতি অনেক পুরানো। এসব আতশবাজি শ্রেণীর মধ্যে ছিল তারাবাতি, মরিচ, ফোয়ারা, মাহতাবি, মাররা, হাওয়াই, চরকি, কবুতরি, টোল্টা, ব্যান্ডবাজি ইত্যাদি। এক সময় ঈদের চাঁদ দেখার মানসিক পূর্ণতা পাওয়া শুরু হয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানের মাধ্যমে। গানটি ঈদের অঘোষিত ‘জাতীয় উৎসব সঙ্গীতে’ পরিণত হয়েছে।

 

মোগল আমলে শোভাযাত্রা করে ঈদের জামাত পড়তে যাওয়ার রীতি ছিল। সবাই ভালো পোশাক পরে ঈদের নামাজে যেতেন এবং পথে দরিদ্রদের মাঝে অর্থ বিতরণ করতেন। বাচ্চাদের ঈদের উপহার বা সালামি দেওয়ার প্রথা শুরু হয় মূলত তখন থেকে। ধানমন্ডি ঈদগাহ তৈরি হয়েছে মোগল আমলে। সেখানে সবাই নামাজ পড়তে যেতেন। পল্টন ময়দানে এক সময় বড় ঈদ জামাত হতো। এক সময় ঢাকায় জন্মষ্টমী ও মহররমের মিছিল ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। এসব মিছিল ধর্মীয় বিষয়কে সামনে রেখে হলেও এতে সর্বধর্মীয় অংশগ্রহণ ছিল। এ কারণেই বলা হয়, ধর্ম যার যার উৎসব সবার। বৃটিশ শাসন কালে ঢাকায় তাদের মনোনীত প্রশাসক নায়েব নাজিমদের সময় ঈদের মিছিলের শোভাযাত্রা নবাব কাটারা, দেওয়ান বাজার, হোসেনী দালাল, বকশী বাজার, বেগম বাজার, বেচারাম দেউরী, ছোট কাটারা, বড় কাটারা, চক বাজার, উর্দু রোড এলাকায় বিস্তৃত ছিল। মিছিলের শুরুতে নায়েবে নাজিম হাতির পিঠে বসতেন। বাহারী ছাতা তার মাথায় ধরা থাকতো। হাতিকে সাজানো হতো রঙিন কাপড়ে। ঘোড়া, উট, পালকির পাশাপাশি শত সহ¯্র লাল, নীল, সবুজ, হলুদ সিল্কের পতাকা থাকতো অংশগ্রহণকারীদের হাতে। ঢোল, বাঁশি, কাড়া, নাকড়া, শিঙ্গাসহ নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র থাকতো। মিছিল দেখতে আসা শত শত মানুষ গোলাপের পাপড়ি ছিটিয়ে দিতো মিছিলকারীদের ওপর। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ আহসান মঞ্জিল, রায়সাহেব বাজার পুল, বংশাল, তিনকোণা পার্ক ও মাহুৎটুলীতে দাঁড়িয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন।

ঈদের মিছিল এক পর্যায়ে ঈদের পরদিন আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হয়। নানা ভাবে ১৯২০ সাল পর্যন্ত টানা মিছিলের আয়োজন হলেও মাঝখানে কিছু কারণে এক যুগের মতো বন্ধ ছিল। পরে আবার শুরু হয় এবং এর ব্যাপ্তি বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন মহল্লা থেকে মিছিল করে লোকজন আসতেন। এসব মিছিলের ওপর প্রতিযোগিতা হতো এবং পুরষ্কার দেয়া হতো। এমনকি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আবাসিক হল থেকেও মিছিলে ছাত্ররা অংশ নিতেন। সেখানে হলের শিক্ষকরাও অংশ নিতেন।

ঈদের দিন এক সাথে নামাজ পড়ার জন্য সবাই উদগ্রীব হয়ে থাকতেন। ঈদগাহ, বড় মাঠ কিংবা মসজিদে জামাতে সাধারণত পুরুষরা অংশ নেন। নারীদেরও ঈদ জামাত পড়ার আগ্রহ ছিল। কিন্তু এ বিষয়ে নানা সামাজিক বাধা ছিল। জাতির অনেক জটিল সমস্যা সমাধানের মতো এ কাজেও এগিয়ে আসেন ঋষিতুল্য শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ১৯৩৭ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ইমামতিতে কার্জন হলে ঢাকায় মহিলাদের প্রথমবারের মতো ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। শোনা যায় ‘মহিলাদের জামাতে ইমামতি করতে তখন কেউ রাজি হন নি’। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দীর্ঘদিনের অচলায়তনকে ভাঙ্গেন।
ঈদ মিছিল শুধু আনন্দ উৎসব নয়, এখানে সামাজিক সমস্যা এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদও ফুটে উঠতো। বৃটিশ আমলে উর্দু রোডের ইসমাইল সরদার একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গান লেখেন। এই গানটি ঈদ মিছিলে উর্দু রোডের হিন্দু ধোপারা রঙিন সাজে সেজে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে নেচে নেচে গাইতেন। গানের কথা ছিল এমন:

আও আও মিলকে চালে হিন্দু মুসলমান
দুনো হাম হায় পাড়োশী, ঝগড়া কাহেকা
আও আও মিলকে চালে হিন্দু মুসলমান

১৯১৯ সালে পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে বৃটিশ সেনাদের গুলিতে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনকারী ৩৭৯ জন মারা যান এবং বারোশর বেশি আহত হন। এই ঘটনার প্রতিবাদে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৃটিশদের দেয়া নাইটহুড পদবী প্রত্যাখ্যান করেন। একই ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকায় স্থানীয় লেখক হাকীম আরশাদ একটি গান লেখেন,

পাঞ্জাবকে আন্দার জালিয়ানওয়ালা বাগমে
কেতনে বাচ্চে কো তুনে এতিম এতিম বানায়ারে
কেতনে আওরাত কো তুনে বেওয়া বানায়ারে
বেকসুর গোলি চালায়ারে
হায় হায় তুনে বেকসুর গোলি চালায়ারে।

সেবার ঈদের মিছিলে প্রায় এক তৃতীয়াংশই শোকের প্রতীক কালো পোশাক পরেছিলেন। দশজন যুবক এই প্রতিবাদী গানটি ঈদ মিছিলে উচ্চকণ্ঠে গেয়ে শোনান। মিছিল শেষ না হতেই গানের লেখক ও অভিযুক্তদের রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে জেলে পাঠায় বৃটিশ সরকার।
লক্ষাধিক লোকের অংশগ্রহণে এক মাইলেরও বেশি লম্বা ঈদ মিছিলে নানা কৌতুকের ছলে সমাজ ও রাষ্ট্রের অনাকাঙ্খিত বিষয়গুলো তুলে ধরা হতো। মানুষ হাসি ঠাট্টার মধ্য দিয়ে সামাজিক সমস্যার বিষয়গুলো সবাইকে জানাতেন। ১৯৫৩ সালের দৈনিক আজাদ ঈদ মিছিল নিয়ে একটি প্রতিবেদনে জানায়, “ঈদের পর দিবস ঢাকার প্রসিদ্ধ ঈদের মিছিলটা খুবই আকর্ষণীয় হয়। এই মিছিল দেখার জন্য লক্ষ লক্ষ নাগরিক নওয়াবপুর রোড, জনসন রোড, সদরঘাট অঞ্চলে বেলা প্রায় ১২টা হইতে অপেক্ষা করিতে থাকে। শহরের বিভিন্ন ক্লাব ও সর্দারগণের উদ্যোগে এই মিছিল বাহির করা হয়।…সরকারী কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি, ভিসা অফিসের দুর্নীতি, ঔষধ বিক্রেতাগণ কর্তৃক চড়া মূল্যে ঔষধ বিক্রয়ের কারসাজি, প্রদেশের খাদ্য সমস্যা, চাষীগণের দুরাবস্থা, কাশ্মীর সমস্যার সমাধান, ঢাকা মিউনিসিপ্যালটির রাস্তার দুর্দশা ও তাহার প্রতিকার প্রভৃতি বিষয়ের ব্যঙ্গ রূপ দিয়া জনসাধারণের নিকট আকর্ষণীয়ভাবে তুলিয়া ধরা হয়। গতকল্য (সোমবার) পল্টন ময়দানে ঈদ উপলক্ষে এক বিরাট মেলা হয়।”

ঈদের শোভাযাত্রা দেখে আমেরিকার ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির লোক সংস্কৃতির অধ্যাপক হেনরি গøাসি মূল্যায়ন করেন এভাবে, ‘এই আদি অকৃত্রিম, দিলখোলা, মজার ঈদ প্যারেডে যে ভালো দিকটি উদযাপিত হয় সেটি এই জাতির বীরত্বগাঁথা, এর অর্জন।’

লেখক: সাংবাদিক