০৫:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে বড় উসকানি’, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে ক্ষুব্ধ বেইজিং মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির নতুন প্রতিযোগিতা: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার মধ্যস্থতাকারী কে? বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন শিথিলতা: বাণিজ্য অর্থায়নে বাড়ল ঋণসীমা কেরালার নতুন মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন ভি ডি সতীশন, ১৮ মে শপথের সম্ভাবনা পাকিস্তানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ‘ফাতাহ-৪’ সফল পরীক্ষা, পাল্লা ও নিখুঁত আঘাতের সক্ষমতার দাবি বেইজিং বৈঠকে ইরান ইস্যু, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বন্ধে ব্রিকসের জোরালো অবস্থান চাইল তেহরান মিয়ানমার নিয়ে বর্ণনার লড়াই: রাষ্ট্র, বৈধতা ও সংবাদমাধ্যমের দায় এল নিনোর শঙ্কায় ফের গম কেনায় ঝুঁকছে এশিয়া, বাড়ছে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা চীনের সস্তা চিপের চাপে ভারতের সেমিকন্ডাক্টর স্বপ্ন, টাটার নতুন ফ্যাবের সামনে কঠিন লড়াই অভিনেত্রী নীনা ওয়াদিয়া: ‘আমাদের বাড়ির সব দেয়াল ছিল হলুদ, যেন একটা লেবু’

তানজানিয়ায় রক্তে রাঙানো দমন-পীড়ন: এক ভয়াবহ নতুন বাস্তবতা

তানজানিয়ায় সামিয়া সুলুহু হাসানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠান ছিল অস্বাভাবিকভাবে নিস্তেজ। ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর রাজধানী দোদোমার সামরিক মাঠে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সাধারণ মানুষকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি আফ্রিকার মাত্র চারজন রাষ্ট্রপ্রধান সেখানে উপস্থিত ছিলেন। অথচ ২৯ অক্টোবরের নির্বাচনে তিনি দাবি করেছিলেন যে, তিনি ৯৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। এই বিরাট ব্যবধান ও সীমিত উপস্থিতি দেখিয়ে দেয়—শাসক দল চামা চা মাপিন্দুজি (CCM) এখন গভীর সংকটে পড়েছে।


প্রতিবাদের বিস্ফোরণ

ভোট কারচুপি, বিরোধী দল নিষিদ্ধ করা ও তাদের নেতাদের কারাগারে পাঠানোর পর তানজানিয়ায় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ শুরু হয়। সরকার জনগণের দাবি উপেক্ষা করে কঠোর দমননীতি চালু করে। সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনী অনেক বিক্ষোভকারীকে হত্যা করে। এতে তানজানিয়ার রাজনীতিতে এক “তিয়ানআনমেন মুহূর্ত” তৈরি হয়েছে—যেখানে শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রের মুখোশ খুলে গেছে।


অর্থনৈতিক উন্নতি বনাম গণতান্ত্রিক অধিকার

অর্থনৈতিক দিক থেকে তানজানিয়া আফ্রিকার অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল দেশ। ২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৬ শতাংশ। কিন্তু এই উন্নতি মানুষকে খুশি করতে পারেনি। ব্রিটিশ গবেষক ড্যান পাজেট বলেন, এই আন্দোলন অর্থনৈতিক নয়, বরং গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে।
বন্দি বিরোধী নেতা টুন্ডু লিসু নির্বাচনের আগে বলেছিলেন—“সংস্কার না হলে নির্বাচন নয়।” এ বছর নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে তার দলের অনেক নেতা-কর্মী নিখোঁজ হয়েছেন।


সামিয়ার শাসনে ভয় ও ক্ষোভ

২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট জন মাগুফুলির মৃত্যুর পর সামিয়া সুলুহু হাসান ক্ষমতায় আসেন। এরপর থেকেই রাজনৈতিক দমন-পীড়ন আরও বেড়ে যায়। তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, রাজপথে নেমে আসে। তাদের অভিযোগ—ভোট গণনায় জালিয়াতি হয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছে, এবং ভিন্নমত দমন করা হয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট কমিউনিটি (SADC) জানায়, “বেশিরভাগ এলাকায় ভোটাররা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারেননি।”


রক্তে ভেজা পরিণতি

গির্জা ও বেসরকারি সংগঠনগুলো এখনো নিহতের সঠিক সংখ্যা জানার চেষ্টা করছে। অনেক স্থানে মৃতদেহ সরিয়ে ফেলা হয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজও মুছে ফেলা হয়েছে। প্রাথমিক হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে, শত শত, এমনকি হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে। এটি আফ্রিকার সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত নির্বাচনের একটি বলে মনে করা হচ্ছে।


বর্তমান অবস্থা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

বিক্ষোভ দমনের পর দেশে ইন্টারনেট সংযোগ ফিরেছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক ভয় এখনো রয়ে গেছে। অনেকের ধারণা, সরকার এতটাই ভীত যে, তারা বন্দি নেতা টুন্ডু লিসুকে মুক্তি দিতে সাহস পাচ্ছে না।
দীর্ঘমেয়াদে তানজানিয়ার রাজনীতি আরও অশান্ত হতে পারে। আফ্রিকার প্রাচীন মুক্তিযোদ্ধা দল CCM-এর ভেতরেও এখন ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলছে। সেনাবাহিনীর একটি অংশ সামিয়াকে অযোগ্য ও বিপজ্জনক বলে মনে করছে।


‘ইদি আমিন মামা’ নামে বিদ্রূপ

বিক্ষোভকারীরা সামিয়াকে বিদ্রূপ করে “ইদি আমিন মামা” নামে ডাকছে—উগান্ডার কুখ্যাত একনায়ক ইদি আমিনের নামানুসারে। নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার জন্য তিনি যেভাবেই হোক ক্ষমতায় টিকে থাকতে চান।
তবে ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের আগেই CCM-এর নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
যা-ই হোক, সামিয়া সুলুহু হাসান ইতোমধ্যেই তানজানিয়ার শান্তিপূর্ণ ভাবমূর্তি ভেঙে দিয়েছেন। এখন দেশটি আফ্রিকার অস্থিতিশীল রাজনীতির মানচিত্রে নতুন এক দমননীতির প্রতীক হয়ে উঠছে।


তানজানিয়ার এই সংকট শুধু একটি দেশের নয়, বরং গোটা আফ্রিকার গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। একদিকে অর্থনৈতিক সাফল্য, অন্যদিকে রাজনৈতিক দমন—এই দ্বন্দ্বই মহাদেশের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সামিয়ার নেতৃত্বে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার নামে গণঅধিকার লঙ্ঘনই এখন তানজানিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতা।


#তানজানিয়া #সামিয়া_সুলুহু #গণআন্দোলন #মানবাধিকার #রাজনৈতিক_সংকট #আফ্রিকা #সারাক্ষণ_রিপোর্ট

জনপ্রিয় সংবাদ

দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে বড় উসকানি’, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে ক্ষুব্ধ বেইজিং

তানজানিয়ায় রক্তে রাঙানো দমন-পীড়ন: এক ভয়াবহ নতুন বাস্তবতা

১২:১২:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫

তানজানিয়ায় সামিয়া সুলুহু হাসানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠান ছিল অস্বাভাবিকভাবে নিস্তেজ। ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর রাজধানী দোদোমার সামরিক মাঠে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সাধারণ মানুষকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি আফ্রিকার মাত্র চারজন রাষ্ট্রপ্রধান সেখানে উপস্থিত ছিলেন। অথচ ২৯ অক্টোবরের নির্বাচনে তিনি দাবি করেছিলেন যে, তিনি ৯৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। এই বিরাট ব্যবধান ও সীমিত উপস্থিতি দেখিয়ে দেয়—শাসক দল চামা চা মাপিন্দুজি (CCM) এখন গভীর সংকটে পড়েছে।


প্রতিবাদের বিস্ফোরণ

ভোট কারচুপি, বিরোধী দল নিষিদ্ধ করা ও তাদের নেতাদের কারাগারে পাঠানোর পর তানজানিয়ায় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ শুরু হয়। সরকার জনগণের দাবি উপেক্ষা করে কঠোর দমননীতি চালু করে। সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনী অনেক বিক্ষোভকারীকে হত্যা করে। এতে তানজানিয়ার রাজনীতিতে এক “তিয়ানআনমেন মুহূর্ত” তৈরি হয়েছে—যেখানে শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রের মুখোশ খুলে গেছে।


অর্থনৈতিক উন্নতি বনাম গণতান্ত্রিক অধিকার

অর্থনৈতিক দিক থেকে তানজানিয়া আফ্রিকার অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল দেশ। ২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৬ শতাংশ। কিন্তু এই উন্নতি মানুষকে খুশি করতে পারেনি। ব্রিটিশ গবেষক ড্যান পাজেট বলেন, এই আন্দোলন অর্থনৈতিক নয়, বরং গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে।
বন্দি বিরোধী নেতা টুন্ডু লিসু নির্বাচনের আগে বলেছিলেন—“সংস্কার না হলে নির্বাচন নয়।” এ বছর নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে তার দলের অনেক নেতা-কর্মী নিখোঁজ হয়েছেন।


সামিয়ার শাসনে ভয় ও ক্ষোভ

২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট জন মাগুফুলির মৃত্যুর পর সামিয়া সুলুহু হাসান ক্ষমতায় আসেন। এরপর থেকেই রাজনৈতিক দমন-পীড়ন আরও বেড়ে যায়। তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, রাজপথে নেমে আসে। তাদের অভিযোগ—ভোট গণনায় জালিয়াতি হয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছে, এবং ভিন্নমত দমন করা হয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট কমিউনিটি (SADC) জানায়, “বেশিরভাগ এলাকায় ভোটাররা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারেননি।”


রক্তে ভেজা পরিণতি

গির্জা ও বেসরকারি সংগঠনগুলো এখনো নিহতের সঠিক সংখ্যা জানার চেষ্টা করছে। অনেক স্থানে মৃতদেহ সরিয়ে ফেলা হয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজও মুছে ফেলা হয়েছে। প্রাথমিক হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে, শত শত, এমনকি হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে। এটি আফ্রিকার সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত নির্বাচনের একটি বলে মনে করা হচ্ছে।


বর্তমান অবস্থা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

বিক্ষোভ দমনের পর দেশে ইন্টারনেট সংযোগ ফিরেছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক ভয় এখনো রয়ে গেছে। অনেকের ধারণা, সরকার এতটাই ভীত যে, তারা বন্দি নেতা টুন্ডু লিসুকে মুক্তি দিতে সাহস পাচ্ছে না।
দীর্ঘমেয়াদে তানজানিয়ার রাজনীতি আরও অশান্ত হতে পারে। আফ্রিকার প্রাচীন মুক্তিযোদ্ধা দল CCM-এর ভেতরেও এখন ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলছে। সেনাবাহিনীর একটি অংশ সামিয়াকে অযোগ্য ও বিপজ্জনক বলে মনে করছে।


‘ইদি আমিন মামা’ নামে বিদ্রূপ

বিক্ষোভকারীরা সামিয়াকে বিদ্রূপ করে “ইদি আমিন মামা” নামে ডাকছে—উগান্ডার কুখ্যাত একনায়ক ইদি আমিনের নামানুসারে। নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার জন্য তিনি যেভাবেই হোক ক্ষমতায় টিকে থাকতে চান।
তবে ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের আগেই CCM-এর নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
যা-ই হোক, সামিয়া সুলুহু হাসান ইতোমধ্যেই তানজানিয়ার শান্তিপূর্ণ ভাবমূর্তি ভেঙে দিয়েছেন। এখন দেশটি আফ্রিকার অস্থিতিশীল রাজনীতির মানচিত্রে নতুন এক দমননীতির প্রতীক হয়ে উঠছে।


তানজানিয়ার এই সংকট শুধু একটি দেশের নয়, বরং গোটা আফ্রিকার গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। একদিকে অর্থনৈতিক সাফল্য, অন্যদিকে রাজনৈতিক দমন—এই দ্বন্দ্বই মহাদেশের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সামিয়ার নেতৃত্বে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার নামে গণঅধিকার লঙ্ঘনই এখন তানজানিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতা।


#তানজানিয়া #সামিয়া_সুলুহু #গণআন্দোলন #মানবাধিকার #রাজনৈতিক_সংকট #আফ্রিকা #সারাক্ষণ_রিপোর্ট