চীন ও জাপানের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার কারণে বেইজিং তার নাগরিকদের জাপান ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে বলার পর, চীনা পর্যটকদের নতুন গন্তব্য হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতি আগ্রহ হঠাৎই বেড়ে গেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি পর্যটন সুবিধা বাড়ালেও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও তিন দেশের (চীন–জাপান–দক্ষিণ কোরিয়া) ত্রিপাক্ষিক সহযোগিতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
চীনা পর্যটকদের নতুন গন্তব্য: দক্ষিণ কোরিয়া
১৪ নভেম্বর চীন তার নাগরিকদের জাপান ভ্রমণে সতর্ক করার পরের সপ্তাহান্তেই চীনা পর্যটকরা ভ্রমণের গন্তব্য নতুন করে ঠিক করতে শুরু করেন।
চীনের জনপ্রিয় ভ্রমণ প্ল্যাটফর্ম ‘কুনার’-এর তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়া–সংক্রান্ত টিকিট বুকিং ও অনুসন্ধান হঠাৎই বেড়ে যায়। পাশাপাশি সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের প্রতিও আগ্রহ বেড়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়া এ সুযোগ কাজে লাগাতে চীনগামী ফ্লাইট ও রুট বাড়াচ্ছে।
কোরিয়ান এয়ার ও এশিয়ানা নভেম্বরের শুরু থেকেই চীনে ফ্লাইট বাড়িয়েছে। জেজু এয়ার ও টি’ওয়ে এয়ারলাইন্স গুইলিন, উহানসহ নতুন রুট চালু করছে।
চীনা ক্রুজ কোম্পানিগুলোও জাপান ঘিরে বাড়তি উত্তেজনার কারণে রুট পরিবর্তন করছে।
একটি ক্রুজ জাহাজ ডিসেম্বরের সফরসূচিতে জাপানের সব বন্দর বাদ দিয়ে জেজুতে বেশি সময় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
স্বল্পমেয়াদি লাভ, দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি
এই পরিস্থিতি দক্ষিণ কোরিয়ার স্বল্পমেয়াদি অর্থনীতির জন্য লাভজনক হলেও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা—চীন–জাপান দ্বন্দ্ব দীর্ঘস্থায়ী হলে তিন দেশের ত্রিপাক্ষিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
জাপান ২০২৬ সালের শুরুতে ত্রিপাক্ষিক সম্মেলন আয়োজন করতে চাইলেও চীন তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির “তাইওয়ান–সংক্রান্ত ভুল মন্তব্য” সহযোগিতার পরিবেশ নষ্ট করেছে।
চীন ইতোমধ্যেই নভেম্বরে ম্যাকাওয়ে অনুষ্ঠিতব্য ত্রিপাক্ষিক সাংস্কৃতিক মন্ত্রীদের বৈঠকও স্থগিত করেছে।
দীর্ঘদিনের অস্থির ত্রিপাক্ষিক সম্পর্ক
চীন–জাপান–দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই ইতিহাস, সীমান্ত বিরোধ ও রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে দুর্বল।
২০১২ সালে সেনকাকু/দিয়াওয়ু দ্বীপ নিয়ে বিরোধের সময় ত্রিপাক্ষিক আলোচনা বন্ধ হয়েছিল।
২০২৪ সালের মে মাসে সিউলে অনুষ্ঠিত সম্মেলন ছিল চার বছরের বেশি সময় পর প্রথম শীর্ষ বৈঠক।
সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের সম্পর্ক কিছুটা উষ্ণ হয়েছে।
১১ বছর পর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নভেম্বরের শুরুতে সিউল সফর করেন এবং অক্টোবরে এপেক সম্মেলনেও অংশ নেন।
২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে তীব্র উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মন্তব্য: দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ
সিউলের আসান ইনস্টিটিউটের গবেষক লি দং-গিউ বলেন,
চীন–জাপান বিরোধ বাড়ার ফলে দক্ষিণ কোরিয়া স্বল্পমেয়াদে লাভবান হলেও দীর্ঘমেয়াদে কূটনীতি জটিল হয়ে পড়বে।
তার মতে, উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে আঞ্চলিক ঐকমত্য দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরে কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে যেভাবে আলোচনা চলছে, সেখানে চীন–জাপান উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির বক্তব্যের কঠোর জবাব দিয়ে চীন আসলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো—বিশেষ করে সিউলকে সতর্ক করছে, যাতে তারা তাইওয়ান প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে সাবধান হয়।
তাইওয়ান ইস্যুতে সতর্ক সিউল
৭ নভেম্বর পার্লামেন্টে তাকাইচি বলেছিলেন, চীন তাইওয়ানে হামলা চালালে জাপান সামরিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
বেইজিং তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে তাইওয়ানকে চীনের অংশ বলে দাবি পুনর্ব্যক্ত করে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষক ড. অ্যান্ড্রু ইয়ো বলেন,
চীন–জাপান উত্তেজনা উত্তর–পূর্ব এশিয়ায় অস্থিরতা বাড়ায়, যা সিউলকে চিন্তিত করে।
তিনি মনে করেন, লি জাই মিয়ং সরকারের জন্য এটি তাইওয়ান বিষয়ে অতিরিক্ত সাবধান হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
চীনা পররাষ্ট্রনীতিবিদ চু জে-উ বলেন,
দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনা দক্ষিণ কোরিয়াকে তাইওয়ান ইস্যুতে খোলামেলা অবস্থান নেওয়া কঠিন করে তুলবে।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে নীরব অবস্থান নিয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ারও সে পথ অনুসরণ করা উচিত।
দক্ষিণ কোরিয়ার ‘সংযত কূটনীতি’
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জাই মিয়ং সাংবাদিকদের বলেন,
জাপান ও চীনের সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠকে তিনি দেশটির মূল অবস্থান পরিষ্কার করেছেন—যাতে কোনো ভুল ব্যাখ্যা না হয়।
তার সরকার ‘জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক বাস্তববাদী কূটনীতি’ চালিয়ে যাবে বলেও তিনি জানান।
অক্টোবরের শুরুতে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় বাড়তে থাকা ‘চীন–বিরোধী’ সমাবেশ কঠোরভাবে দমন করার আহ্বান জানান।
২০২৪ সালের সামরিক আইন বিতর্কের পর এসব সমাবেশ বাড়তে থাকে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়লের সমর্থকরা মনে করেন, তাদের নেতার পতনে চীনা হস্তক্ষেপ ভূমিকা রেখেছে।
পর্যটন ফিরে আসছে, কিন্তু বিতর্কও বাড়ছে
২০২৫ সালে ভিসা শিথিল হওয়ায় চীনা পর্যটন ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
জানুয়ারি–সেপ্টেম্বর সময়ে ৪.২ মিলিয়ন চীনা পর্যটক দক্ষিণ কোরিয়া ভ্রমণ করেছেন।
বছর শেষে সংখ্যা মহামারির আগের ৬ মিলিয়নের বেশি ছুঁতে পারে।
তবে একই সঙ্গে কিছু অশোভন আচরণ নিয়ে বিতর্কও উঠেছে।
গিয়ংবকগুং প্রাসাদ ও জেজুর হল্লাসান পর্বতে চীনা পর্যটকদের মলত্যাগের ঘটনাও খবরের শিরোনাম হয়।
আসান ইনস্টিটিউটের ড. লি মনে করেন, এসব বিতর্ক দক্ষিণ কোরিয়া–চীন সম্পর্ক পুনর্গঠনে তেমন প্রভাব ফেলবে না।
তার মতে,
দক্ষিণ কোরিয়ায় চীন–বিরোধী মনোভাব আগে থেকেই আছে; তাই কয়েকটি ঘটনার কারণে তা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা কম।
এছাড়া চীনা সরকার মিডিয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করলেও দুই দেশের সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের ধারা বাধাগ্রস্ত হবে না।
পর্যটন থেকে স্বল্পমেয়াদি সুবিধা পেলেও চীন–জাপান উত্তেজনা দক্ষিণ কোরিয়ার কূটনীতিতে বড় ধরনের ভারসাম্য সংকট তৈরি করতে পারে। দেশটি আপাতত বাস্তববাদী ও ‘শান্ত মাথায়’ কূটনীতি চালিয়ে যেতে চাইছে, যাতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং ত্রিপাক্ষিক সহযোগিতার পথ পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















