দেশের ব্যাংকিং খাত এখনো গভীর কাঠামোগত চাপে রয়েছে। এই খাতের বাস্তব ও টেকসই সংস্কার স্বল্প সময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
রাজধানীর একটি হোটেলে ‘ব্যাংকিং খাত সংস্কার’ শীর্ষক এমটিবি-এফই গোলটেবিল আলোচনায় তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছে। বহু প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়েছে, অনেক ক্ষেত্রে আইন মানা হচ্ছে না এবং মালিকরাই ব্যবস্থাপনায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করে সতর্কতামূলক নীতিমালা উপেক্ষা করছেন।
দীর্ঘদিনের সংকট দ্রুত সমাধান অসম্ভব
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ব্যাংকিং খাতের সমস্যাগুলো গভীর, জটিল এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। গত ১৫ বছরে যে সংকট জমেছে, তা ১৪ থেকে ১৬ মাসের মধ্যে সমাধান করা বাস্তবসম্মত নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি
বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর স্বায়ত্তশাসন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পূর্ণ স্বাধীনতা না জবাবদিহির বাইরে থাকা বাস্তবসম্মত বা কাম্য নয়। কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বাইরে কাজ করতে পারে না। স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে জবাবদিহি থাকতে হবে।
আন্তর্জাতিক ঝুঁকি ও ব্যাংকিং স্থিতিশীলতা
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, অবৈধ অর্থপ্রবাহ, অপরাধসংশ্লিষ্ট বাণিজ্য ও মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব বিষয় সরাসরি ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে এবং এগুলো মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমর্থন জরুরি।
নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা
তিনি অভিযোগ করেন, কিছু চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিং প্রতিষ্ঠান যথাযথ যাচাই ছাড়াই নিরীক্ষা প্রতিবেদন স্বাক্ষর করেছে। অতীত তারিখে বা সন্দেহজনক প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করা আর্থিক শৃঙ্খলাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইতোমধ্যে এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, অনিয়ম শুধু ব্যাংকিং খাতে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চশিক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের আর্থিক কার্যক্রম অনেক সময় যথাযথ নিরীক্ষার বাইরে থেকে যায়।
আইন সংশোধন ও সময়ের সীমাবদ্ধতা
অর্থ উপদেষ্টা জানান, সরকার সম্প্রতি নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস আইন ও হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন আইন সংশোধন করেছে। একই সঙ্গে মানি লন্ডারিং আইন ও অর্থনৈতিক আদালত সংশোধনের কাজ চলমান রয়েছে। তবে সময়ের স্বল্পতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, সময় খুবই সীমিত, তবু যতটা সম্ভব কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কাঠামোগত সংস্কার
বাংলাদেশ ব্যাংকে অতিরিক্ত সংখ্যক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি জানান, কাঠামো যৌক্তিক করতে ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও ভবিষ্যৎ করণীয়

সব সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেন ড. সালেহউদ্দিন। তিনি বলেন, বাইরে থেকে বাংলাদেশকে ধসে পড়ছে বলে দেখা হচ্ছে না, তবে অংশীদাররা পরিস্থিতিকে কঠিন বলে মনে করছেন।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ব্যাংকিং খাত সংস্কার এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। অর্থনীতির জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সুযোগ নষ্ট করা যাবে না। বর্তমান সরকার সব সংস্কার শেষ করতে না পারলেও পরবর্তী সরকারকে তা এগিয়ে নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবিব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















