ইউক্রেন যুদ্ধের রণক্ষেত্রে শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেনের সৈন্যই নয়, দূর আফ্রিকার বহু তরুণও জড়িয়ে পড়ছেন প্রাণঘাতী সংঘাতে। চাকরি ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের রাশিয়ায় নেওয়া হলেও বাস্তবে অনেকেই বাধ্য হচ্ছেন যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র ধরতে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ এখন দেরিতে হলেও বিষয়টি ঠেকাতে উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে।
চাকরির প্রতিশ্রুতি থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে
কেনিয়ার ২৮ বছর বয়সী ভিনসেন্ট ওধিয়াম্বো একটি ভিডিও ধারণ করেছিলেন, যেখানে দেখা যায় কয়েকজন সৈন্য যুদ্ধের আগে নাচছেন। রুশ ভাষায় কথা বলা এক কমান্ডার সবাইকে নাচতে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। ওধিয়াম্বোর ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্ব ইউক্রেনে ফ্রন্টলাইনে পৌঁছানোর আগের দিনই ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছিল। পরে যুদ্ধে সেই ভিডিওতে থাকা প্রায় সব সৈন্য নিহত হন।
ওধিয়াম্বো বলেন, ভিডিওতে থাকা প্রায় সবাই ছিলেন আফ্রিকান। তিনি নিজেও তাদের একজন, যিনি যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন।
হাজারো আফ্রিকানের অংশগ্রহণ
২০২২ সালে ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে দুই পক্ষই বিদেশি যোদ্ধা ব্যবহার করছে। ইউক্রেনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রুশ সেনাবাহিনীতে আফ্রিকার ৩৬টি দেশের প্রায় এক হাজার সাতশো আশি নাগরিক যুক্ত আছেন। বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কেনিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার হিসাব বলছে, এক হাজারেরও বেশি কেনিয়ান এই যুদ্ধে জড়িয়েছেন এবং তাদের মধ্যে অন্তত ঊননব্বই জন এখনও সামনের সারিতে লড়ছেন।
প্রতারণা ও জোরপূর্বক নিয়োগের অভিযোগ
যুদ্ধে জড়ানো অনেক আফ্রিকান জানিয়েছেন, তারা স্বেচ্ছায় যুদ্ধ করতে যাননি। তাদের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় নেওয়া হয়।
ওধিয়াম্বো জানান, একটি নিয়োগ সংস্থা তাকে রাশিয়ায় বেসামরিক চাকরি, বিনামূল্যে বিমানযাত্রা ও ভিসা এবং দশ হাজার ডলারের বেশি সমপরিমাণ সাইনিং বোনাসের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছানোর পর তাকে দুটি বিকল্প দেওয়া হয়—রুশ সেনাবাহিনীতে চুক্তি স্বাক্ষর করা অথবা প্রায় একত্রিশ হাজার ডলার জরিমানা দিয়ে দেশে ফিরে যাওয়া।
এই ঘটনায় কেনিয়ার ওই নিয়োগ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে মানব পাচারের অভিযোগে মামলা হয়েছে।
আফ্রিকা জুড়ে একই কৌশল
আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে দরিদ্র ও বেকার তরুণদের লক্ষ্য করে নিয়োগকারীরা কাজ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘানার রাজধানী আক্রায়ও এমন ঘটনা সামনে এসেছে। সেখানে এক নিয়োগকারী নাকি আগাম বড় অঙ্কের টাকা নিয়েছিল এবং পরে মাসিক বেতন থেকেও বিপুল অর্থ কেটে নেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তারা এমন চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন যা রুশ ভাষায় লেখা ছিল এবং তারা বুঝতেই পারেননি। মাত্র এক সপ্তাহের প্রশিক্ষণের পর তাদের সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
কেন আফ্রিকার দিকে ঝুঁকছে রাশিয়া
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে জনবল সংকট তৈরি হয়েছে। হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে এবং সেনা পলায়নের ঘটনাও বাড়ছে। ফলে নতুন সৈন্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ কারণেই রাশিয়া আফ্রিকার তরুণদের দিকে ঝুঁকছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা খুব কম
যুদ্ধে পাঠানো বিদেশি যোদ্ধাদের বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা খুবই কম বলে বিভিন্ন অনুমানে দেখা গেছে। এক হিসাব অনুযায়ী, রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া বিদেশিদের প্রায় বিয়াল্লিশ শতাংশ চার মাসের মধ্যেই নিহত হন।
ঘানার অন্তত পঞ্চান্ন জন নাগরিক ইতিমধ্যে এই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন বলে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন।
আফ্রিকান দেশগুলোর নতুন উদ্যোগ
ঘটনাগুলো সামনে আসার পর আফ্রিকার সরকারগুলো এখন সতর্ক হতে শুরু করেছে। কেনিয়া ইতিমধ্যে শত শত অবৈধ নিয়োগ সংস্থা বন্ধ করেছে এবং রাশিয়াকে তাদের নাগরিকদের সেনাবাহিনীতে নেওয়া বন্ধ করতে বলেছে।
ঘানার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যুদ্ধবন্দী দুই ঘানার নাগরিকের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে মানব পাচার ঠেকাতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গড়ার কথাও বলেছেন।
সমর্থন হারানোর আশঙ্কা
যুদ্ধ নিয়ে আফ্রিকার কিছু দেশে এখনও রাশিয়ার প্রতি সহানুভূতি রয়েছে। তবে নতুন জরিপে দেখা যাচ্ছে, রাশিয়ার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব এখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তুলনায় কম।
রাশিয়ার একটি অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটি এমন ছত্রিশটি “বন্ধুপ্রতিম” দেশের তালিকা তৈরি করেছে যেখানে নতুন যোদ্ধা নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এতে কয়েকটি আফ্রিকান দেশও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আফ্রিকান তরুণদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে মহাদেশটির সমর্থন হারানোর ঝুঁকি বাড়তে পারে—এই আশঙ্কাই রাশিয়াকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















