শ্রীলঙ্কায় টানা প্রবল বৃষ্টি, নদীর পানি বৃদ্ধি, ভূমিধস এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ফলে দেশজুড়ে দীর্ঘ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ দেখা দিয়েছে। ৫৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, নিখোঁজ কমপক্ষে ২১ জন। হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনী উদ্ধারকাজে নিয়োজিত রয়েছে।
শ্রীলঙ্কাজুড়ে টানা বৃষ্টি: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে
শুক্রবার সকাল থেকেই শ্রীলঙ্কার সর্বত্র অবিরাম ভারী বৃষ্টি শুরু হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র জানায়, পুরো ৬৫ হাজার বর্গকিলোমিটার দ্বীপজুড়ে ২৪ ঘণ্টায় কোথাও কোথাও ৩৬০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে।
ফলাফল—বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক প্লাবন ও জনজীবন বিপর্যস্ত।
কেরানি নদী উপচে পড়ার উপক্রম: ঝুঁকিতে হাজারো মানুষ
শ্রীলঙ্কার অন্যতম প্রধান নদী কেরানি শুক্রবার সন্ধ্যার আগেই বিপদসীমা ছুঁয়ে ফেলে। নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়।
স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা: তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ
শ্রীলঙ্কার কডুওয়েলা এলাকায় ঘর ছেড়ে পালিয়ে আসা ভি. এস. এ. রত্নায়েকে বলেন, “গত ৩০ বছরে এমন বন্যা দেখিনি। নব্বই দশকে একবার এমন বন্যা হয়েছিল, তখন আমার ঘর ছিল সাত ফুট পানির নিচে।”

সামরিক বাহিনীর বৃহৎ অভিযান
শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী বিপুল মাত্রায় উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। ২০ হাজারের বেশি সেনা সদস্য মাঠে নেমেছে। নৌবাহিনী নৌকা পাঠিয়ে পানিবন্দি মানুষদের উদ্ধার করছে এবং নদীর পথে আটকে থাকা গাছপালা সরাচ্ছে।
বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারও যুক্ত হয়েছে। আনুরাধাপুরায় এক ব্যক্তি নারকেল গাছে উঠে বাঁচার চেষ্টা করছিলেন; একটি বেল দুই-এক-দুই হেলিকপ্টার নেমে তাকে নাটকীয়ভাবে উদ্ধারের দৃশ্য দেশজুড়ে আলোচিত হয়েছে।
মৃত্যু, নিখোঁজ ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব
শ্রীলঙ্কায় নিশ্চিত মৃত ৫৬ জনের মধ্যে ২৬ জন বাদুল্লার চা-বাগান অঞ্চলে ভূমিধসে চাপা পড়ে মারা গেছেন।
২১ জন নিখোঁজ, ১৪ জন হাসপাতালে। প্রায় ৩ হাজার বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১৫ হাজারের মতো মানুষকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে সরানো হয়েছে।
রুয়ানওয়েলায় মরিয়া সাহায্যের আহ্বান
শ্রীলঙ্কার রুয়ানওয়েলায় আকমা নামের এক নারী টিভির মাধ্যমে সাহায্যের আবেদন জানিয়ে বলেন, “আমাদের নিচতলা পুরোপুরি ডুবে গেছে। আমরা ছয়জন এখানে আটকে আছি, একটি দেড় বছরের শিশুসহ। পানি যদি আরও কয়েক ধাপ বাড়ে, আমাদের আর যাওয়ার জায়গা থাকবে না।”
ভারতীয় পর্যটক উদ্ধার
শ্রীলঙ্কার পরিবহন মন্ত্রী বিমল রত্নায়েকে জানিয়েছেন, মধ্য প্রদেশে আটকে পড়া ৬০ ভারতীয় পর্যটককে উদ্ধার করে কলম্বোতে আনা হয়েছে।

আরও বৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা
শ্রীলঙ্কার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র জানায়, সপ্তাহান্তে আরও ভারী বৃষ্টি হতে পারে। ঘূর্ণিঝড় দিতওয়া উত্তরদিকে সরতে সরতে ভারতের তামিলনাড়ু উপকূলের দিকে এগোচ্ছে। ২০১৬ সালের বন্যার (যখন ৭১ জনের মৃত্যু হয়েছিল) মতো অথবা তার থেকেও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কেরানি নদীর ভয়ের পানি: পরিবারগুলো সরিয়ে নিচ্ছে স্বজনদের
শ্রীলঙ্কার কেরানি নদীর তীরঘেঁষা পরিবারগুলো আগেভাগেই নিরাপদে সরছে। এম. এ. মাদুশন্থা জানান, “পরিস্থিতি খারাপ হবে বুঝে স্ত্রী-সন্তানদের গতরাতে বোনের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের ঘর ডুবে গেছে।”
সরকারের তাৎক্ষণিক নির্দেশনা
শ্রীলঙ্কা সরকার জননিরাপত্তার স্বার্থে দেশজুড়ে স্কুলের পরীক্ষা দুই দিনের জন্য স্থগিত করেছে। সরকারি কর্মচারীদেরও একদিনের ছুটি দেওয়া হয়েছে, যাতে অপ্রয়োজনে বাইরে যাতায়াত কমে।
#tags: শ্রীলঙ্কা বন্যা দুর্যোগ আবহাওয়া আন্তর্জাতিক_সংবাদ সারাক্ষণ_রিপোর্ট
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















