চীনের সাম্প্রতিক ইঙ্গিত বিশ্ব ব্যবস্থার এক অস্বস্তিকর সত্যকে আবার সামনে এনেছে—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ীরাই আজও আন্তর্জাতিক কাঠামোর মালিক। ক্ষমতার ভিত্তি কখনোই শুধু প্রতিষ্ঠান নয়; ইতিহাসের বড় সংঘর্ষে কারা জিতেছে, সেটাই ঠিক করে কার হাতে নিয়ন্ত্রণ থাকবে।
চীনের নীরব স্মরণ করিয়ে দেওয়া
চীন সম্প্রতি জাতিসংঘ সনদের ৫৩, ৭৭ ও ১০৭ নম্বর অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করে জাপানকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে এসব ‘পুরনো’ ধারাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী দেশগুলো প্রাক্তন শত্রু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একতরফা সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেয়, যদি তারা আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করে।
তাত্ত্বিকভাবে আজও এই সনদ চীনকে জাপানের বিরুদ্ধে বা রাশিয়াকে জার্মানির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সামরিক পদক্ষেপের অনুমতি দেয়। এটি অদ্ভুত শোনালেও মূল বাস্তবতা একটিই—ক্ষমতা ও শক্তি আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়ম তৈরি করে।

জাতিসংঘ সংস্কার বিতর্ক কেন বাস্তবসম্মত নয়
ভারত বা ব্রাজিল আজ প্রভাবশালী হলেও তারা বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী নয়। বিপরীতে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব কমে গেলেও তাদের স্থায়ী সদস্যপদ টিকে আছে কারণ ১৯৪৫ সালে তারা বিজয়ী পক্ষ হিসেবে যুদ্ধ শেষ করেছিল।
ফ্রান্স যুদ্ধের মাত্র ১৫ বছরের মধ্যে নিজস্ব পারমাণবিক শক্তি তৈরি করে, এমনকি মার্কিন চাপ উপেক্ষা করে। এই ধরনের শক্তির পরিচয় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সম্মান পায়।
ইতিহাস বলছে—কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কেবল তখনই টিকে থাকে, যখন তা বিশ্ব শক্তির প্রকৃত ভারসাম্যকে প্রতিফলিত করে। লিগ অব নেশনস ব্যর্থ হয়েছিল নকশাগত ত্রুটির কারণে নয়, বরং ব্রিটেন–ফ্রান্স ১৯৩০-এর দশকে ইউরোপের শক্তি ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায়।
জাতিসংঘ সনদ ও বাস্তব শক্তির সম্পর্ক
জাতিসংঘ সনদের কর্তৃত্ব বাস্তবের চেয়ে প্রতীকী। সনদ তখনই কার্যকর, যখন তা রক্ষার ক্ষমতা বিজয়ী রাষ্ট্রগুলোর কাছেই থাকে।
চীনের উদ্ধৃত সেই অনুচ্ছেদগুলো তাই শুধুই অতীতের প্রদর্শন নয়; এটি বিশ্বের একটি মূল সত্যকে মনে করিয়ে দেয়—চূড়ান্ত বৈধতা আসে শক্তির অধিকার থেকে।
পশ্চিমা বক্তব্য ও বাস্তবতার ফারাক
মধ্যপ্রাচ্যের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, পশ্চিমা দেশগুলোর প্রায়ই সেই মূল্যবোধ লঙ্ঘন করে যেগুলো তারা রক্ষার দাবি করে। কথার সঙ্গে বাস্তবতার এই ব্যবধান যত বাড়ে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ততই বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।
জাতিসংঘ কেন এখনো গুরুত্বপূর্ণ
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এখনো বাস্তব শক্তির প্রতিফলন। স্থায়ী সদস্য হলো সেই রাষ্ট্রগুলো, যাদের সামরিক সক্ষমতা ও যুদ্ধে বিজিত বৈধতা—দুটিই রয়েছে।
তাদের পারমাণবিক ক্ষমতা এই ঐতিহাসিক যুক্তির বাস্তব রূপ। মতপার্থক্য থাকলেও অন্য কোনো দেশ গোষ্ঠী এই পর্যায়ের শক্তি বা বৈধতা দাবি করতে পারে না।
চীনের বার্তার আসল তাৎপর্য
জাপানকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে চীন জানাচ্ছে—তারা বর্তমান জাতিসংঘ কাঠামোর ভিতরেই স্বচ্ছন্দ।
এটি দেখায় যে চীন নিজেকে বর্তমান ব্যবস্থার নির্মাতা ও বৈধ শক্তি হিসেবে দেখে, কোনো বিদ্রোহী বা বিপ্লবী শক্তি হিসেবে নয়।
আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়ার বর্তমান কাঠামো ভাঙতে আগ্রহী নয়। এই ব্যবস্থাই তাদের বৈশ্বিক অবস্থান কে টিকিয়ে রেখেছে।

প্রধান ঝুঁকি কোথায়
যদি পশ্চিমা কোনো বড় রাষ্ট্র ১৯৪৫-পরবর্তী সেই যুদ্ধকালীন অনুচ্ছেদ বাতিলের দাবি করে, তবেই বড় বিপদের ইঙ্গিত দেখা যাবে।
এটি মানে হবে নতুন ভূ-রাজনৈতিক বিপ্লবের পথে হাঁটা—যেমনটি ইতিহাস বলছে, এমন বিপ্লব কখনো শান্তিপূর্ণ হয় না; সীমান্ত বদলে যায়, সমাজ ভেঙে পড়ে।
চীনের এই ইঙ্গিত এক বিভ্রম দূর করে—আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন কখনোই শক্তির ভারসাম্য কে প্রতিস্থাপন করতে পারেনি।
আজও বিশ্ব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল এবং বিজয়ী শক্তির ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
জাতিসংঘের প্রাসঙ্গিকতা তাই রেজোলিউশন বা বক্তৃতা নয়—বরং সেই ক্ষমতার শ্রেণিবিন্যাস, যা শেষ বড় বৈশ্বিক সংঘাতের পর গড়ে উঠেছিল। বর্তমান উত্তাল সময়ে স্থিতির একমাত্র ভিত্তি সেটিই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















