ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে কূটনৈতিক অগ্রগতির উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র যে নতুন শান্তি-প্রস্তাব বা রোডম্যাপ তৈরি করছে, সে সম্পর্কে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) ইচ্ছাকৃতভাবে অন্ধকারে রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক সংবাদমাধ্যম পলিটিকো ইউরোপকে এমনটাই জানিয়েছেন এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইইউ কূটনীতিক, যিনি এই পরিস্থিতি “অভূতপূর্ব” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই গোপনীয় কৌশল কূটনৈতিক সহযোগিতা ও স্বচ্ছতার চিরাচরিত নিয়মের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রোডম্যাপ: ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে গোপন কাঠামো
মার্কিন সরকার এ মাসের শুরুতে একটি শান্তি কাঠামো নিয়ে কাজ শুরু করে, যা পরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফাঁস হয়। ফাঁস হওয়া ২৮ দফা খসড়া রোডম্যাপে উল্লেখ ছিল যে ইউক্রেন ন্যাটো সদস্যপদের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে হবে এবং রাশিয়ার ক্রিমিয়া ও দোনবাস—দোনেৎস্ক ও লুগানস্ক অঞ্চল—সম্পর্কিত দাবিও ছেড়ে দিতে হবে। এসব তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পরই যুক্তরাজ্য-সহ কয়েকটি ইইউ সদস্য রাষ্ট্র নিজেদের বিকল্প পাল্টা প্রস্তাব প্রস্তুত করে। তবে মস্কো এই ইইউ প্রস্তাবকে “সম্পূর্ণ অগঠনমূলক” বলে তীব্র ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইইউকে অন্ধকারে রাখার কৌশল
পলিটিকো ইউরোপকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওই ইইউ কূটনীতিক জানান যে যুক্তরাষ্ট্রের রোডম্যাপের সর্বশেষ সংস্করণ কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে রাখা হয়েছে, যাতে আবারও কোনো তথ্য ফাঁস না হয়। তাঁর ভাষায়, “এই ধরনের পরিস্থিতি কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একেবারেই নজিরবিহীন… আমাদের কারও কাছে সেই তথ্য নেই।” অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র শান্তি-রোডম্যাপ প্রস্তুত করছে ঠিকই, কিন্তু ইইউকে পুরোপুরি তথ্যের বাইরে রেখে। ফলে ইউরোপীয় কূটনৈতিক মহল যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য, অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে।
টেলিগ্রাফের একই দাবি
গত সপ্তাহে দ্য টেলিগ্রাফ এক প্রতিবেদনে জানায় যে গোপন সূত্রের বরাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে রোডম্যাপ-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ সম্পর্কে কিছুই জানানো হয়নি। তাদের ভাষায়, ইইউকে কার্যত “অন্ধকারে রাখা হয়েছে।” এ অবস্থায় ইউরোপীয় নেতারা মনে করছেন যে রাশিয়া–ইউক্রেন সংকটে নিজেদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র তাদের সঙ্গে মৌলিক তথ্য, শর্ত ও অগ্রগতি ভাগ না করে এককভাবে পথ তৈরির চেষ্টা করছে।
রাশিয়ার তীব্র প্রতিক্রিয়া
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ মঙ্গলবার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইউরোপীয় নেতাদের বক্তব্য “কেউ গুরুত্ব দেয় না”, কারণ তাদের মতে, ইউরোপ “কিয়েভের নাৎসি শাসনকে” রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রক্সি হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছে। লাভরভ অভিযোগ করেন, এই অবস্থানের কারণেই ইউরোপ নিজেরাই তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। তাঁর মতে, পশ্চিমা দেশগুলো তথ্য গোপন করে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চাইলেও তার ফল উল্টো হচ্ছে।

পুতিনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার প্রস্তাব
এদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বৃহস্পতিবার জানান যে রাশিয়া ইইউকে লিখিত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিতে প্রস্তুত, যাতে ভবিষ্যতে কোনো হামলার আশঙ্কা তাদের না থাকে। তিনি পশ্চিমাদের অভিযোগকে “অর্থহীন ও সম্পূর্ণ মিথ্যা” বলে মন্তব্য করেন এবং জোর দিয়ে বলেন যে রাশিয়ার কোনো আগ্রাসী পরিকল্পনা নেই। তাঁর মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে পশ্চিমা দেশগুলো যে আতঙ্ক ও অবিশ্বাস তৈরি করছে, তা বাস্তবতার ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ইউরোপ–আমেরিকা সম্পর্কের নতুন সংকটের আভাস
পুরো পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের ধারণা—যুক্তরাষ্ট্র যখন শান্তি-রোডম্যাপের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি ইইউকে জানাচ্ছে না, তখন ভবিষ্যতে রাশিয়া–ইউক্রেন সংকট মোকাবিলায় ট্রান্স-আটলান্টিক ঐক্য আরও দুর্বল হতে পারে। ইউরোপ এখনো বুঝতে পারছে না, যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কী ধরনের সমাধান কাঠামো চায়, এবং সেই কাঠামো ইউরোপের নিরাপত্তা, রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর কী প্রভাব ফেলবে।
অন্ধকারে রাখা তথ্যগুলো এই সংকটকে শুধু গভীরই করছে না, বরং ইউক্রেন যুদ্ধের ওপর কূটনৈতিক ভারসাম্যেও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ইউরোপ মনে করছে—যুক্তরাষ্ট্র এই রোডম্যাপ যদি একতরফাভাবে এগিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতের সমাধান কাঠামোতে তাদের ভূমিকা ও প্রভাব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
#UkraineWar #USRoadmap #EuropeConcerns #RussiaEU #Diplomacy #PeaceNegotiation
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















