থাইল্যান্ডের রাজা চীনে যাত্রা করার আগের দিনই তার সরকার এক বিশেষ পদক্ষেপ নেয়। ১২ নভেম্বর ব্যাংকক থেকে বহুল আলোচিত চীনা অপরাধচক্রের হোতা শে ঝিজিয়াংকে তিন বছরের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে বেইজিংয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়। মিয়ানমারে অনলাইন জুয়া ও প্রতারণার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগে চীন বহুদিন ধরে তাকে ফেরত চেয়ে আসছিল।
রাজা মহা ওয়াজিরালংকর্ন গত অর্ধশতকে প্রথম থাই সম্রাট হিসেবে চীন সফর করেন। এই সফর সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট সংকেত—দীর্ঘদিন ধরে চীন ও আমেরিকার মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখে চলা থাইল্যান্ড এখন ক্রমাগতভাবে উত্তর দিকের শক্তিশালী প্রতিবেশীর দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
দুই দেশের সম্পর্ক নানা ক্ষেত্রে দ্রুত ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। বিশেষভাবে নজর কাড়ছে থাইল্যান্ডের চীনের কঠোর দাবিগুলোর প্রতি অস্বাভাবিক সাড়া। অপরাধী হস্তান্তর ছিল এমনই এক বড় উদাহরণ। গত আগস্টে ব্যাংককের এক আর্ট গ্যালারিতে তিব্বতি, উইঘুর ও হংকংয়ের শিল্পীদের প্রদর্শনী সরিয়ে ফেলা হয়—চীনা কূটনীতিকদের অভিযোগের পর। এরও আগে ২০১৪ সাল থেকে আটক থাকা ৪০ জন উইঘুর পুরুষকে চীনে ফেরত পাঠায় থাইল্যান্ড—যদিও আমেরিকা, কানাডাসহ বহু দেশ তাদের আশ্রয় দিতে আগ্রহী ছিল। আমেরিকা এই ঘটনায় মন্তব্য করে যে তারা “থাইল্যান্ডের দীর্ঘদিনের মিত্র” হিসেবে হতাশ। কিন্তু থাই সরকার জানায়—উইঘুরদের অন্য কোথাও পাঠালে চীনের প্রতিশোধমূলক আচরণের আশঙ্কা ছিল।

চীনের চাপ এতে ভূমিকা রেখেছে বটে, তবে ব্যবসায়িক স্বার্থও এই পরিবর্তনের বড় কারণ। চীনের কোম্পানিগুলো থাইল্যান্ডে বিপুল বিনিয়োগ করছে—শিল্পপার্ক থেকে উচ্চগতির রেললাইন পর্যন্ত। নরেসুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পল চেম্বার্সের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ক্ষমতাসীন ফেউ থাই পার্টি যখন চীনা পর্যটক ও বিনিয়োগ আকর্ষণে বিশেষ উদ্যোগ নেয়, তখন থেকেই সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। ২০২৪ সালে দুই দেশের বাণিজ্য ছিল ১১৬ বিলিয়ন ডলার; এ বছরের প্রথম দশ মাসেই তা ১২২ বিলিয়নে পৌঁছেছে।
থাইল্যান্ডের পর্যটন খাত—যা দেশটির জিডিপির ১২ শতাংশ এবং মোট কর্মসংস্থানের পাঁচভাগের একভাগ—সেখানেও চীনের অবদান বিশাল। গত বছর থাইল্যান্ডে আসা ৩৫.৫ মিলিয়ন বিদেশি পর্যটকের মধ্যে ৬.৭ মিলিয়নই ছিলেন চীনা। কিন্তু চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে তা নেমে আসে মাত্র ৩.৪ মিলিয়নে। এর নেপথ্যে রয়েছে বছরের শুরুতে চীনা সেলিব্রিটি ওয়াং জিংকে থাইল্যান্ড থেকে অপহরণ করে মিয়ানমারের এক প্রতারণা চক্রে পাচার করার ঘটনা, যা বহু চীনা পর্যটকের মনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। এরপর দুই দেশ মিলে প্রতারণা ও মানবপাচার নেটওয়ার্ক দমনে যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে।
নিরাপত্তা খাতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০১৪ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর আমেরিকা থাইল্যান্ডের সঙ্গে সামরিক সহায়তা ও যৌথ মহড়া কমিয়ে দিলে, চীন দ্রুত সেই শূন্যস্থান পূরণ করে। সাবমেরিন, ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া যান তারা সরবরাহ করেছে তুলনামূলক কম দামে এবং মানবাধিকার নিয়ে কোনো শর্ত ছাড়াই। ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ড চীন থেকে ৩৯৪ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনেছে, যেখানে আমেরিকা থেকে কেনা হয়েছে মাত্র ২০৭ মিলিয়নের অস্ত্র। এখন দেশটি চীনের অ্যান্টি-শিপ মিসাইল, এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং সাঁজোয়া যান ব্যবহার করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমেরিকার সামরিক সহায়তা আরও কমেছে—২০২৩ সালে ১০৬ মিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে মাত্র ৮ মিলিয়নে।

তবুও থাইল্যান্ড তার দীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী আমেরিকান জোট পুরোপুরি ত্যাগ করেনি। ১৮৩৩ সালের “অ্যামিটি অ্যান্ড কমার্স” চুক্তি থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের সূচনা। এখনো দুই দেশ এশিয়া অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বহুপাক্ষিক সামরিক মহড়া ‘কোবরা গোল্ড’ আয়োজন করে, যেখানে প্রায় ৩০টি দেশ ও হাজারো মার্কিন সেনা অংশ নেয়। আমেরিকা এখনো থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার—যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য শুল্কনীতি ভবিষ্যতে এই সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে। একইসঙ্গে থাইল্যান্ড চীনের দিকে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও এড়িয়ে চলতে চাইছে। চীন থেকে আসা নিম্নমানের সস্তা পণ্য স্থানীয় শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে—অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দেশটির ৭০ শতাংশের বেশি সিইও আরও ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। রাজা চীন সফরে থাকাকালীন থাইল্যান্ডের অর্থমন্ত্রী একনিতি নীতিৎথনপ্রাপাস ঘোষণা দেন—আগামী ১ জানুয়ারি থেকে কমদামি আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এটি ছিল চীনের বিরুদ্ধে এক বিরল প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ।
চীনের কাছাকাছি যাওয়ার সুবিধা যেমন আছে, ঝুঁকিও তেমন বাড়ছে—এটাই এখন থাইল্যান্ডের বাস্তব চ্যালেঞ্জ।
#Thailand #China #US #Diplomacy #Economy #Tourism #Security #Geopolitics
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















