ইসরায়েলের বোমাবর্ষণে ধ্বংসস্তূপে পড়ে থাকা পরমাণু স্থাপনাগুলো, শহরজুড়ে নিহত বিজ্ঞানী ও সেনা কর্মকর্তাদের স্মরণে টাঙানো ফলক—সব মিলিয়ে মনে হওয়ার কথা, তেহরান এখন গভীর প্রতিরক্ষায়। অথচ রাজধানীর রাজনৈতিক সুর একেবারে ভিন্ন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সম্প্রতি জানিয়েছেন, তারা আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরতে চান। তাঁর দাবি, হামলার ঠিক আগে পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে আমেরিকার দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতি হয়েছিল। এমনকি ইরানি ভূখণ্ডেই আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধকরণ চালুর ভাবনাও নাকি তৈরি হয়েছিল।
সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানও ওয়াশিংটন সফরে একই বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বছরের পর বছর উত্তেজনার পর, এ যেন এক নতুন মৌসুমের হাওয়া। প্রশ্ন হলো—বাইরের শক্তিগুলো কীভাবে সাড়া দেবে?
তেহরানের ভিতরে পরিবর্তনের আলামত
সন্দেহপ্রবণদের জন্য ইরানের এই আগ্রহকে প্রতারণা মনে হওয়াই স্বাভাবিক। দেশটি নিঃসন্দেহে সময় চাইবে নিজেদের প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রঘাঁটি পুনর্গঠনের জন্য। তেহরানে ভয়—ইসরায়েল আবার আঘাত হানতে পারে, বিশেষ করে আগামী নির্বাচনের আগে যদি উত্তেজনা বাড়ে। আরও বড় ঝুঁকির কথা শোনা যাচ্ছে—গোপন স্থাপনায় বিজ্ঞানীরা কি অস্ত্রমান ইউরেনিয়াম তৈরি করতে ছুটবে?
আরাঘচি বলেছেন, এটি অসম্ভব। তাঁর দাবি, ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এখন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। বাস্তবে যে মতভেদ আছে, তা সত্ত্বেও ইরান বলছে—অস্ত্র তৈরির কোনো সুযোগ নেই। তবু আলোচনার ঝুঁকি থেকে যায়, এবং সেটিই দীর্ঘদিনের বাস্তবতা।

এই সময়টায় ইরানের ভেতরেও ছায়া বদলাচ্ছে। আঞ্চলিকভাবে দেশটির প্রক্সি বাহিনীগুলো দুর্বল হয়েছে, পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার বরফ গলছে—বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে। ঘরোয়া পরিসরেও নরম পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। নৈতিকতা পুলিশের হস্তক্ষেপ কমে গেছে; নারীদের পোশাক নিয়ে আগের মতো কড়াকড়ি নেই। শিয়াপন্থী রাষ্ট্রীয় প্রচার কমে গিয়ে তার জায়গায় এসেছে ইরানি জাতীয়তাবাদের প্রতীক ও ভাষা।
৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ২০১৫ সালের চুক্তিতে অংশ নিয়েছিলেন দেশের সমৃদ্ধকরণ সীমার মধ্যে রাখতে। তিনি এখনো পশ্চিমাদের সঙ্গে কথাবার্তার পথ খুলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। তবে তাঁর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার নিয়ে অভ্যন্তরীণ লড়াই শুরু হলে দিক পরিবর্তনের ঝুঁকি থেকেই যাবে। বিপ্লবী গার্ডদের প্রভাব বাড়লে তারা বিচ্ছিন্নতাকেই লাভজনক ধরে রাখবে।
এক বিরল জানালা খোলা—এখনই সিদ্ধান্তের সময়
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কে নতুন অধ্যায় শুরু করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইরানে যারা কঠোর অবস্থানে বিশ্বাসী, তারা কেবলই শক্তিশালী হবে যদি আবারও অবিশ্বাসের দেয়াল তোলা হয়। অন্যদিকে কূটনীতি এগোলে অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য নরমপন্থীদের দিকে ঝুঁকতে পারে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে বলেছেন তিনি “সম্পূর্ণভাবে খোলা মনে” আলোচনায় ফিরতে প্রস্তুত—যদিও আগের চুক্তিটি তিনিই বাতিল করেছিলেন। সম্ভবত তিনি বুঝতে শুরু করেছেন, বোমারু বিমান দিয়ে ইরানকে চিরতরে থামানো যায় না। আলোচনার পথ খোলা থাকা অবস্থায় ইসরায়েলের আরেক দফা হামলা গ্রহণযোগ্য নয়—এ কথা পরিষ্কারভাবে জানালে কূটনীতির পথ আরও প্রশস্ত হবে।
এ মুহূর্তে সুযোগের জানালা অস্বাভাবিকভাবে উন্মুক্ত। এখনই সময় তেহরানে একজন শক্তিশালী দূত পাঠিয়ে খোঁজ নেওয়ার—কেমন একটি সমঝোতা বাস্তবে সম্ভব, আর তা কি অঞ্চলের অস্থির জোয়ার থামাতে পারে। শহরের আকাশে ধোঁয়ার দাগ যদিও এখনো মুছে যায়নি, তবু আলোচনার সম্ভাবনায় একটি আলতো আশা ভেসে আছে।
#Iran #MiddleEast #Diplomacy #Sarakhon #ThePresentWorld
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















