মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার পর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় তেহরান একের পর এক আঘাত হানছে। ইসরায়েল থেকে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, সৌদি আরব, ইরাক ও ওমান—বিস্তৃত অঞ্চলে উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধের ইঙ্গিত দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে ইরান।
প্রণালি ঘিরে সামরিক তৎপরতা
ইউরোপীয় এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজগুলো উচ্চমাত্রার বেতার বার্তা পাচ্ছে, যেখানে বলা হচ্ছে—হরমুজ দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে পারবে না। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণালি বন্ধের ঘোষণা আসেনি, তবু বহু তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকার আপাতত যাত্রা স্থগিত করেছে। গ্রিসসহ কয়েকটি দেশ তাদের জাহাজকে এই পথ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
সমুদ্রপথে এই অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা তৈরি করেছে। কারণ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই সংকীর্ণ জলপথের ওপর নির্ভরশীল।

হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব
ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক পাশে এবং অন্য পাশে ইরান—এই ভূগোলের মাঝখানে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি। আরব উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এই পথ। সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশে প্রস্থ মাত্র ৩৩ কিলোমিটার, আর জাহাজ চলাচলের পথ দুই দিকেই প্রায় ৩ কিলোমিটার করে। এই সীমিত পরিসর একে সামরিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
তবু বিশ্বের বৃহত্তম তেলবাহী জাহাজগুলো নিয়মিত এই পথ ব্যবহার করে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোর জন্য এটি জীবনরেখা, আর আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ভরসা।
প্রতিদিন কত জ্বালানি পাড়ি দেয়
প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল এই প্রণালি অতিক্রম করে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের বিশাল অংশ। ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল এই পথেই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিতেও এই প্রণালির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে কাতার বড় অংশ জোগান দেয়।
এশিয়ার উপর নির্ভরতা বেশি
চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ এশিয়ার দেশগুলো এই পথ দিয়ে যাওয়া তেলের বড় ক্রেতা। তাদের শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পরিবহন ব্যবস্থা উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে হরমুজে অস্থিরতা মানেই এশিয়ার অর্থনীতিতে সরাসরি চাপ।
তেলের দামে কী প্রভাব পড়তে পারে
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালি বন্ধ হলে বৈশ্বিক বাজারে আতঙ্ক তৈরি হবে এবং তেলের দাম দ্রুত লাফিয়ে উঠতে পারে। ইতিমধ্যে বহু জাহাজ প্রণালির বাইরে নোঙর ফেলেছে। ওমান উপকূলে একটি তেলবাহী জাহাজে আঘাত হানার খবর পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বিশ্ববাজারে সরবরাহ হঠাৎ কমে গেলে শুধু তেলের দামই নয়, গ্যাস ও জ্বালানিনির্ভর অন্যান্য পণ্যের দামও বেড়ে যাবে। এতে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে এবং নাজুক অর্থনীতিগুলো মন্দার মুখে পড়তে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভাব্য অভিঘাত
দীর্ঘস্থায়ী সংকট দেখা দিলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার কমানোর নীতি থেকে সরে আসতে বাধ্য হতে পারে। বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো পণ্যদ্রব্যের দামের ওঠানামায় বেশি সংবেদনশীল।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ এখন শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। সামরিক উত্তেজনা যদি না কমে, তাহলে জ্বালানি বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















