তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে একের পর এক বিস্ফোরণে কেঁপে উঠছে ইরান। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পরও ইরানি নেতৃত্ব স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি, সাংবিধানিক পথেই নতুন নেতৃত্ব আসবে এবং প্রতিরোধ চলবে।
তেহরানে দফায় দফায় হামলা
রবিবার রাজধানীর একাধিক এলাকায় হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েলি বাহিনী দাবি করেছে, সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়েছে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ইরানি কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত তথ্য প্রকাশে সংযত রয়েছে। টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ইন্টারনেট সংযোগও প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন।

খামেনির মৃত্যুর পর নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর প্রণীত আইনে বিশেষ আলেম পরিষদ নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, নতুন নেতৃত্ব পরিষদ কাজ শুরু করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, কয়েক দিনের মধ্যেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে।
এখন পর্যন্ত তিন সদস্যের একটি অন্তর্বর্তী পরিষদ রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এবং আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি এই পরিষদের সদস্য। শক্তিশালী সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক পরিষদের সঙ্গে সমন্বয় করেই এই কাঠামো গঠন করা হয়েছে।

বিপ্লবী গার্ডের প্রতিশোধের ঘোষণা
ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস বলেছে, অধিকৃত ভূখণ্ড ও অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটির বিরুদ্ধে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আক্রমণ চালানো হয়েছে। গার্ড বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আবদোলরহিম মুসাভি, প্রতিরক্ষা পরিষদের প্রধান আলি শামখানি এবং পুলিশের গোয়েন্দা প্রধান গোলাম-রেজা রেজায়িয়ান নিহত হয়েছেন।
সেনাবাহিনীর প্রধান আমির হাতামি জানিয়েছেন, আঞ্চলিক মার্কিন ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। পুলিশের প্রধান আহমদ-রেজা রাদান বলেছেন, জননিরাপত্তা রক্ষায় বাহিনী প্রস্তুত।

আঞ্চলিক উত্তেজনা ও কূটনৈতিক বার্তা
নিরাপত্তা শীর্ষ ব্যক্তি আলি লারিজানি আরব ভাষায় বার্তা দিয়ে বলেছেন, ইরান প্রতিবেশীদের আক্রমণ করতে চায় না। তবে যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেগুলোকে আমেরিকার ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে কঠোর প্রতিশোধের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা পরিষদের প্রতিনিধি আলি আকবর আহমাদিয়ান জানিয়েছেন, শীর্ষ সদস্যরা নিহত হলেও পরিষদের কার্যক্রম চলবে। গত জুনের যুদ্ধের পর প্রতিরক্ষা কৌশল জোরদারে এই পরিষদ গঠিত হয়েছিল।

রাজনৈতিক অঙ্গনে ঐক্যের সুর
ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনি নিহত খামেনিকে ‘ইরানি জাতির বীর’ আখ্যা দিয়েছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি অন্তর্বর্তী পরিষদ ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি খামেনির হত্যাকে দেশের স্বাধীনতা ও ঐক্যের বিরুদ্ধে আঘাত বলে মন্তব্য করেছেন।
এদিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ নিহত হয়েছেন—এমন গুঞ্জন ছড়ালেও রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা তা অস্বীকার করেছে। তেহরানের নারমাক এলাকার বাহাত্তর স্কয়ারে হামলার ভিডিওতে তার বাসভবনের আশপাশে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে। একটি স্কুলে হামলায় শিশু নিহতের খবরও নিশ্চিত করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। দক্ষিণাঞ্চলের মিনাব শহরের আরেকটি স্কুলে হামলায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের অনেকেই শিশু।

শোক ও রাষ্ট্রীয় ঘোষণা
সরকার সাত দিনের সাধারণ ছুটি ও চল্লিশ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। খামেনির স্মরণে বড় বড় সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। ৩৬ বছর ধরে দেশের নেতৃত্ব দেওয়া এই নেতার মৃত্যুতে শোকাবহ পরিবেশের মধ্যেই ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে ঝুঁকবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জোর আলোচনা চলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















