মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তাপ যত বাড়ছে, ততই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা তীব্র হচ্ছে। ঠিক এমন সময়ে ওপেক প্লাস এপ্রিল মাস থেকে প্রতিদিন দুই লাখ ছয় হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত বাজারে কার্যত কোনো স্বস্তি আনতে পারেনি। কারণ বিশ্লেষকদের মতে, আসল প্রশ্ন উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং হরমুজ প্রণালির সংকট কতদিন স্থায়ী হবে সেটিই এখন বাজারের মূল উদ্বেগ।
উৎপাদন বৃদ্ধি, কিন্তু প্রতীকী প্রভাব
ওপেক প্লাসের ঘোষণায় বিশ্ব সরবরাহে মাত্র শূন্য দশমিক দুই শতাংশ যোগ হবে। এমন একটি সময়ে যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং ইরানের পাল্টা আঘাতে উপসাগরীয় অঞ্চল অস্থির, তখন এই বাড়তি সরবরাহ বাস্তব সংকট মোকাবিলায় খুবই সীমিত। বাজারে এর প্রভাব মূলত প্রতীকী, যেন প্রয়োজনে আরও তেল সরবরাহ করা সম্ভব—এই বার্তাটুকুই দেওয়া হয়েছে।
ঘোষণার পরও ব্রেন্ট তেলের দাম লাফিয়ে এক বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এতে স্পষ্ট, বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি এখন উৎপাদনের অঙ্কে নয়, বরং যুদ্ধের স্থায়িত্ব ও পরিবহন নিরাপত্তার দিকে।

হরমুজ প্রণালি: সংকটের কেন্দ্রবিন্দু
বিশ্বের প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল ও জ্বালানি পণ্য প্রতিদিন হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এটি কার্যত বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় এক পঞ্চমাংশ। বর্তমানে সরাসরি অবরোধ না থাকলেও জাহাজ মালিক ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকি এড়ানোর মনোভাবের কারণে প্রণালিটি প্রায় অচল অবস্থায় রয়েছে।
তবে ইতিবাচক দিক হলো, ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়নি। অর্থাৎ সংঘাত থামলে দ্রুত জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
চীন ও ভারতের সম্ভাব্য কৌশল
বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক চীন সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আমদানি বাড়ালেও উচ্চমূল্যের কারণে আগামী মাসগুলোতে আমদানি কমাতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মে ও জুনে সরবরাহ আসার সময় পর্যন্ত চীন প্রতিদিন প্রায় বিশ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত কমাতে পারে।
এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহৎ আমদানিকারক ভারতও সরবরাহ নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। প্রয়োজনে তারা রুশ তেলের দিকে ঝুঁকতে পারে, যদিও আগে আমদানি কমানোর প্রতিশ্রুতি ছিল। যুদ্ধকালীন বাস্তবতায় জ্বালানি নিরাপত্তাই এখন প্রধান বিবেচনা হয়ে উঠেছে।

কৌশলগত মজুত ও বিকল্প পরিকল্পনা
যদি হরমুজ প্রণালির সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে আমদানিকারক দেশগুলো কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়তে পারে। একই সঙ্গে অন্য রপ্তানিকারক দেশগুলো উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করবে। এতে কিছুটা ভারসাম্য ফিরতে পারে, তবে তা নির্ভর করবে সংঘাতের স্থায়িত্বের ওপর।
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও একই রকম চাপ তৈরি হয়েছে। কাতারের বড় অংশের গ্যাস রপ্তানিও এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। ফলে তেল ও গ্যাস—দুই বাজারেই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই, যুদ্ধ কতদিন চলবে।
রাজনৈতিক চাপ বাড়ার আশঙ্কা
যদি তেল ও গ্যাসের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নেতৃত্বের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়বে। উচ্চ জ্বালানি মূল্য সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে, যা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির দাবিকে জোরালো করতে পারে।
সব মিলিয়ে ওপেকের উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এই সংকটে সাময়িক বার্তা দিলেও বাজারের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















