মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে আগুন জ্বলে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর সরাসরি ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর বা আইআরজিসির সদস্যদের উদ্দেশে বার্তা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার ভাষায়, অস্ত্র নামিয়ে রাখলে পূর্ণ নিরাপত্তা, না হলে নিশ্চিত মৃত্যু। বার্তাটি ছিল স্পষ্ট, কড়া এবং প্রকাশ্য।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই আহ্বানের কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। বরং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পাল্টা জবাব দেয়। আঞ্চলিক বিভিন্ন দেশে, যেখানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে, সেসব লক্ষ্যবস্তুকেও আঘাত করা হয়।
এরই মধ্যে তেহরানে এক হামলায় ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ঘোষণা আসে। এই ঘটনার পর প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে—ট্রাম্প কি আইআরজিসি ও বাসিজ বাহিনীর চরিত্র এবং কাঠামো সঠিকভাবে বুঝতে পারেননি?

আইআরজিসি: শুধু সামরিক বাহিনী নয়, এক আদর্শিক কাঠামো
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর গঠিত আইআরজিসি ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি বিশেষ স্তম্ভ। এটি সাধারণ সেনাবাহিনীর মতো কেবল সীমান্ত রক্ষার বাহিনী নয়। বরং সংবিধান স্বীকৃত একটি আদর্শিক বাহিনী, যার মূল দায়িত্ব ইসলামি বিপ্লব ও ধর্মীয় নেতৃত্বের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
আইআরজিসি সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার অধীনস্থ। তাদের আদর্শিক ভিত্তি ‘ভেলায়াতে ফকিহ’, যার অর্থ ধর্মীয় নেতার অভিভাবকত্বে রাষ্ট্র পরিচালনা। প্রথমে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি এবং পরে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতি আনুগত্য এই বাহিনীর মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
স্থল, নৌ ও বিমান শাখা ছাড়াও আইআরজিসির রয়েছে কুদস ফোর্স, যা দেশের বাইরে বিশেষ সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। পাশাপাশি রয়েছে বাসিজ নামের অভ্যন্তরীণ আধাসামরিক বাহিনী, যারা মূলত সামাজিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সামরিক শক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রভাব
আইআরজিসির শক্তি শুধু অস্ত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তারা অবকাঠামো, প্রকৌশল ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেয়। সেই সময় থেকেই তাদের অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তৃত হতে শুরু করে।
বর্তমানে জ্বালানি, খনিজ, নির্মাণ, পরিবহন, টেলিযোগাযোগসহ নানা খাতে আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বড় ধরনের উপস্থিতি রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার চাপের মধ্যেও রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে ইরান সরকার যাকে ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ বলে, সেখানে আইআরজিসির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে এই বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিষয়টি শুধু আদর্শিক আনুগত্য নয়, সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
বাসিজ: রাস্তায় শক্তি প্রদর্শনের মুখ
বাসিজ বাহিনীও ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি আইআরজিসির অধীনস্থ একটি স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক সংগঠন। আদর্শিক অনুপ্রেরণায় গড়ে উঠলেও অনেক তরুণ সামাজিক সুবিধা ও উন্নত সুযোগের আশায় এতে যুক্ত হয়।
সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে বাসিজের ভূমিকা স্পষ্ট। ২০০৯ সালের সবুজ আন্দোলন, সাম্প্রতিক নারী, জীবন, স্বাধীনতা আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই তাদের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা গেছে।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় বাসিজ সদস্যদের ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে পাঠানো হতো। আত্মোৎসর্গের আদর্শ তাদের কাঠামোর গভীরে প্রোথিত।

কেন ব্যর্থ হলো ট্রাম্পের আহ্বান
ট্রাম্পের বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল ভয় দেখিয়ে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা। হয় আত্মসমর্পণ, নয়তো মৃত্যু। কিন্তু ইরানের ক্ষমতার কাঠামো এত সরল নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে একাধিক ক্ষমতার কেন্দ্র রয়েছে। ধর্মীয় নেতৃত্ব, সামরিক কাঠামো, গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইআরজিসি—সব মিলিয়ে একটি জটিল বলয় তৈরি হয়েছে। এই কাঠামোর ভেতরে গভীর আদর্শিক বন্ধন রয়েছে, যা বাইরের আহ্বানে সহজে নড়ে না।
তাছাড়া আইআরজিসির সদস্যরা জানেন, রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে তাদের অবস্থান কতটা শক্ত। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা তাদের হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে গণহারে আত্মসমর্পণের সম্ভাবনা বাস্তবে খুবই কম।
খামেনির মৃত্যুর পর ক্ষমতার সমীকরণ
খামেনির মৃত্যুর ঘোষণার পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, এতে হয়তো ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে।
আগের সংঘাতে নিহত কমান্ডারদের জায়গায় দ্রুত নতুন নেতৃত্ব বসানো হয়েছে। সামরিক কাঠামো সচল রয়েছে। এমনকি কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই পরিস্থিতি আইআরজিসির প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সম্ভাবনা আছে, প্রতীকীভাবে নতুন সর্বোচ্চ নেতা সামনে আনা হলেও কার্যকর ক্ষমতা আইআরজিসির হাতেই থেকে যাবে। অর্থনৈতিক সংকট, নিষেধাজ্ঞা ও জনঅসন্তোষ থাকলেও সংগঠিত সামরিক শক্তি এখনো দৃঢ় অবস্থানে।

সামনে কোন পথে ইরান
বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, উত্তেজনা দ্রুত প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং পাল্টাপাল্টি হামলা ও কড়া অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার—আইআরজিসি কেবল একটি সামরিক ইউনিট নয়, এটি ইরানের রাষ্ট্র কাঠামোর গভীরে প্রোথিত এক শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। ট্রাম্পের আহ্বান হয়তো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় বার্তা ছিল, কিন্তু ইরানের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতায় তা খুব বেশি প্রভাব ফেলেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















