ভারতের শ্রমবাজারে দীর্ঘদিনের জটিল নিয়মকানুন ও সীমাবদ্ধতা নতুন করে সাজানোর ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। স্বাধীনতার পর থেকে শ্রম আইন সংস্কারের উদ্যোগ বিভিন্ন সময় নেওয়া হলেও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় তা বারবার থেমে গেছে। তবে ২১ নভেম্বর মোদি সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে—নিয়োগ ও বরখাস্তের নিয়ম সহজ করা হবে, জটিল আইনগত আনুষ্ঠানিকতা কমানো হবে এবং শ্রমবাজারে আরও নমনীয়তা আনা হবে। আশা করা হচ্ছে, রাজ্যগুলো আগামী অর্থবছরেই এই পরিবর্তনগুলো কার্যকর করবে। অর্থনীতিবিদ অরবিন্দ পানগাড়িয়া এই উদ্যোগকে বলেছেন “সব সংস্কারের মা”। ভারতের শ্রমনীতির এই পরিবর্তন শিল্পখাত, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতের শ্রমনীতি দীর্ঘদিনের অস্বাভাবিক চিত্র
ভারতের বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান অস্বাভাবিকভাবে ছোট আকারে পরিচালিত হয়ে এসেছে। দেশের ৯৫ শতাংশের বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানেই কর্মীর সংখ্যা ১০ জনের কম। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান ঠিক ৯৯ জন কর্মী রেখেই সীমাবদ্ধ থাকে—যাতে বড়ো প্রতিষ্ঠানের আইনি বাধাগুলো এড়ানো যায়। অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতের পোশাক কারখানার গড় আকারও প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ছোট, যা বিশেষজ্ঞদের উদ্বিগ্ন করে। বর্তমানে উৎপাদন খাতে মোট শ্রমিকের ৪২ শতাংশ চুক্তিভিত্তিক, যারা নির্দিষ্ট কাজের জন্য সীমিত সময়ের ভিত্তিতে নিযুক্ত হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অস্বাভাবিক কাঠামোর মূল কারণ হলো শ্রম আইনের কঠোরতা ও সীমাবদ্ধতা, যা বহুদিন ধরেই বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
পুরোনো শ্রম আইনের কারণে ব্যবসার সীমাবদ্ধতা
ভারতের বিদ্যমান বহু শ্রম আইন শুধুমাত্র সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যাদের কর্মী সংখ্যা ১০ জন বা তার বেশি। গবেষক অমৃত আমিরাপু ও মাইকেল গেখটার দেখিয়েছেন, এসব নিয়ম অনুসরণ করতে গিয়ে শ্রম ব্যয় প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। ফলে এমন এক কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে খুব বড় প্রতিষ্ঠান কিংবা খুব ছোট প্রতিষ্ঠান টিকে থাকলেও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠান প্রায় নেই বললেই চলে। অর্থনীতিবিদরা এটিকে “মিসিং মিডল” বলে অভিহিত করেন।
এছাড়া ১৯৪৭ সালের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউটস অ্যাক্ট অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানে ১০০ জনের বেশি কর্মী হলে শ্রমিক ছাঁটাই করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এতে নতুন বিনিয়োগকারীরা শিল্প খাতে আসতে ভয় পান, কারখানাগুলো বড় আকারে রূপ নিতে পারে না, এবং শ্রমনির্ভর খাত পিছিয়ে পড়ে। ফলে ভারত পুঁজিনির্ভর শিল্পের দিকে ঝুঁকেছে, আর শ্রমনির্ভর খাত তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। চুক্তিভিত্তিক শ্রম বাড়ার ফলে উদ্যোক্তারা শ্রমিক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ কমিয়েছেন। পাঁচ বছর আগে মোদি সরকার শ্রম কোড সংশোধনের উদ্যোগ নিলেও প্রবল বিরোধিতার মুখে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। উৎপাদন খাতে প্রণোদনা দেওয়া হলেও প্রত্যাশিত ফল মিলেনি। বিশ্লেষকদের মতে, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় গত নির্বাচনে মোদি সরকার পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারেনি।
সংস্কার সফল হওয়ার পেছনের নতুন বাস্তবতা
সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনে মোদি জোটের সাফল্য তাঁকে আরও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ক—যেখানে ভারতীয় রপ্তানির ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত আমেরিকান শুল্ক বহাল আছে—সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়েছে। নতুন প্রস্তাবগুলোর মধ্যে বামপন্থীদেরও আকৃষ্ট করার মতো একাধিক বিষয় রয়েছে। গিগ অর্থনীতির শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি, সকল শ্রমিকের জন্য লিখিত চুক্তির অধিকার, নারীদের রাতের শিফটে কাজের সুযোগ নিশ্চিত করা ও পূর্বের নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ার উদ্যোগ এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
শ্রমিক ইউনিয়নের বিরোধিতা ও বাস্তব চিত্র
যদিও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো এই পরিকল্পনাকে “প্রতারণামূলক সংস্কার” বলে দাবি করছে এবং ২৬ নভেম্বর থেকে আন্দোলন শুরু করেছে, তবুও বিশ্লেষকদের মতে তাদের প্রভাব আগের মতো শক্তিশালী নয়—বিশেষ করে তরুণ শ্রমিকদের মধ্যে। কিছু রাজ্য উদ্বেগ প্রকাশ করলেও অধিকাংশ রাজ্য নতুন শ্রম কোড বাস্তবায়নে আগ্রহী। মহারাষ্ট্র ও উত্তর প্রদেশ ইতোমধ্যেই আরও উদারীকরণের দিকে এগোচ্ছে, যা শ্রমনীতিকে আরও নমনীয় করার ইঙ্গিত দেয়।
অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব ও ভারতের ভবিষ্যৎ
স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া মনে করে, নতুন শ্রম সংস্কার ভোগব্যয় বাড়াবে এবং আনুষ্ঠানিক চাকরির সংখ্যা ১৫ শতাংশ-পয়েন্ট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। শাহী এক্সপোর্টসের প্রধান হরিশ অহুজা আশা প্রকাশ করেছেন, এই সংস্কার আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের পোশাক শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে। ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বিশাল জনশক্তি। বহুদিনের কঠোর ও জটিল শ্রম আইনের শিথিলতার ফলে সেই জনশক্তিকে আরও কার্যকর ও দক্ষভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। মোদি সরকারের এই পদক্ষেপ ভারতের শ্রমবাজারকে এক নতুন পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
#: ভারত_শ্রমনীতি #শ্রমআইন_সংস্কার #মোদি_সরকার #কর্মসংস্থান_ভারত #শিল্পখাত_#ভারত #শ্রমবাজার_ভারত
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















