চীনের আবাসন বাজার এখন এমন এক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে, যা শুধু অর্থনীতিকেই নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তকেও চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। বাজার স্থিতিশীল করতে সরকারের ধারাবাহিক উদ্যোগ নেওয়ার পরও পরিস্থিতি আবার নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে। এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিবিদরা বলছেন—চীনের আবাসন খাতকে বাঁচাতে আরও শক্তিশালী এবং বিস্তৃত পদক্ষেপ এখন অত্যন্ত জরুরি।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও সম্পত্তি সংকট
চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য সংখ্যা ১০ কোটির বেশি হলেও দেশ পরিচালনার মূল সিদ্ধান্ত নেন মাত্র ২৩ জন পলিটব্যুরো সদস্য। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জরুরি বৈঠকে তারা সংকটাপন্ন আবাসন বাজারকে স্থিতিশীল করার সিদ্ধান্ত নিলেও বাজার সেই নির্দেশ মানেনি। ২০২৪ সালের শেষের দিকে বিক্রি কিছুটা বাড়লেও পরিস্থিতি পরে আবার অবনতি হয়।
২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে চীনের ৭০টি বড় শহরে বাড়ির দাম এক বছরে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে কমেছে। সাংহাইয়ের জুলু রোডে রেকর্ড দামে একটি ভিলা বিক্রি হলেও তা বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেনি।
কেন সরকার সক্রিয় হতে দ্বিধায়
চীনের রপ্তানি খাত প্রত্যাশার চেয়ে ভালো অবস্থায় থাকায় দেশটির ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা এখনো নাগালের মধ্যে আছে। তাই সরকার দ্রুত বড় ধরনের হস্তক্ষেপে আগ্রহী হয়নি। কিন্তু আবাসন খাতের পতন এখন ভোগব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, যা পলিটব্যুরোর আরেকটি অঙ্গীকার—দেশের ভোগব্যয় বাড়ানোকে—বিপন্ন করে তুলছে।
এর পাশাপাশি, বাড়ির দাম কমায় বহু পরিবারের সম্পদের মূল্য নেমে গেছে, আর ঋণগ্রহীতাদের জামানতের মূল্য কমায় আর্থিক খাতেও ঝুঁকি বাড়ছে। ব্যাংকগুলো যেসব সম্পত্তি জব্দ করবে, সেগুলো একসঙ্গে বিক্রি হলে বাজার আরও নিচে নেমে যেতে পারে।
মূল্য পতন, নেতিবাচক ইকুইটি ও বাড়তে থাকা ঝুঁকি
২০২১ সালের শীর্ষ দামের তুলনায় এখন পর্যন্ত বাড়ির দাম ২০ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে। ইউবিএসের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২,৫০০ জন ক্রেতার প্রায় অর্ধেকই তাদের কেনা বাড়িতে লোকসানের মুখে। অনেক ফ্ল্যাট এখন কিনে নেওয়া দামের নিচে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বকেয়া মর্টগেজ ঋণের মূল্য থেকেও কম।

২০২৫ সালের শেষে ৭ লাখ বাড়ি ‘নেতিবাচক ইকুইটিতে’ পড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, আর ২০২৬ সালে তা ১৮ লাখে পৌঁছাতে পারে। অবশ্য নেতিবাচক ইকুইটি মানেই ঋণ খেলাপি নয়—১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটেও হংকংয়ের এ ধরনের অধিকাংশ পরিবারই নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করেছিল।
কিন্তু সমস্যা শুধু গৃহঋণেই সীমাবদ্ধ নয়। আবাসন খাতকে জামানত রেখে ২৫ ট্রিলিয়ন ইউয়ান সমমূল্যের বিশাল ব্যবসায়িক ঋণ রয়েছে, বিশেষত ছোট ব্যবসা ও পরিবারভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে। এসব ঋণ খেলাপি হলে ব্যাংকগুলো সম্পত্তি জব্দ করে বিক্রি শুরু করবে, যা বাজারকে আরও বেশি চাপের মুখে ফেলবে। ইউবিএসের হিসাব অনুযায়ী ২০২৬ সালে প্রায় ১৫ লাখ বাড়ি বাজেয়াপ্ত হয়ে বাজারে আসতে পারে।
সরকারের বিবেচনায় থাকা নতুন সহায়তা—কিন্তু তা কি যথেষ্ট?
সরকার সুদের ভর্তুকি ও কর রেয়াতসহ নতুন প্রণোদনা বিবেচনা করছে। তবে সেগুলো যথেষ্ট হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
গোল্ডম্যান স্যাক্সের হিসাব বলছে, নতুন মর্টগেজ ঋণে সুদ কমালে বছরে মাত্র ৬৩ বিলিয়ন ইউয়ান সাশ্রয় হবে। পুরোনো ও নতুন সব মর্টগেজে ভর্তুকি দিলে বছরে সাশ্রয় হবে ৪৩৭ বিলিয়ন ইউয়ান, যা জিডিপির মাত্র ০.৩ শতাংশ। কর রেয়াত মিললে তা বাড়তে পারে জিডিপির ০.৫ শতাংশ পর্যন্ত।
যদি সুদ এক শতাংশের মতো কমে, তাহলে সম্পত্তি কেনার ব্যয় ভাড়ার সমমূল্য আয়(রেন্টাল ইল্ড)-এর কাছাকাছি চলে আসবে, অর্থাৎ দাম ‘ন্যায্য মূল্যায়ন’-এ পৌঁছাবে। কিন্তু বাজার ন্যায্য দামে এসে স্থির হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। দীর্ঘদিনের বুদবুদের পর দাম সাধারণত উভয় দিকেই অতিরিক্ত ওঠানামা করে। বাড়ি যখন অত্যন্ত দামি ছিল, তখন যেমন অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছিল; এখন তেমনি তা অস্বাভাবিকভাবে কমের দিকে যেতে পারে।
চীনের আবাসন বাজার বহু বছর ধরেই পলিটব্যুরোর কঠোর নীতির প্রভাবকে অগ্রাহ্য করে এসেছে। এখনো বাজার সহজে সরকারের নিয়ন্ত্রণে ফিরবে না। মৌলিক অর্থনৈতিক ভিত্তি অনুযায়ী দাম স্থির হতে আরও সময় লাগবে—আর তার আগে হয়তো আরও বড় ধাক্কা আসতেও পারে।
# চীন_আবাসন_সংকট #অর্থনীতি বাজার_বিশ্লেষণ #সারাক্ষণ_রিপোর্ট
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















