১১:২৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

ইন্দোনেশিয়ার বন্যায় টাপানুলি ওরাংওটাং আরও বিপদে

বন্যা, ভূমিধস আর নির্বিচার বন উজাড়ের যৌথ আঘাত

মারণঘাতী বন্যা ও ভূমিধসের কয়েক সপ্তাহ পরও ইন্দোনেশিয়ার উত্তর সুমাত্রার বন যেন অস্বাভাবিক নীরব। সাইক্লোনঘূর্ণি ঝড়ের আগে সিপিরোক এলাকার পাহাড়ি বনজুড়ে টাপানুলি ওরাংওটাংকে প্রায়ই ফলখেতে দেখা যেত—দুরিয়ান থেকে শুরু করে স্থানীয় কৃষকদের বাগানের নানা ফল তাদের পছন্দের তালিকায় ছিল। এখন রেঞ্জার আমরান সিয়াগিয়ান সেই একই পাহাড়ি পথে হাঁটেন, কিন্তু গাছের মাথায় ঝুলন্ত দেহের বদলে দেখতে পান উল্টো দিকে কাটা গাছের গুঁড়ি আর ন্যাড়া ঢাল। ঝড় ও বন্যায় ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় শত শত মানুষের মৃত্যু হলেও, বিরল এই বৃহৎ বানর প্রজাতির জন্য আসল বিপদ লুকিয়ে আছে তাদের বাসস্থান ধ্বংসের মধ্যে।

Orangutans at risk as Indonesia floods devastate habitat | Reuters

স্থানীয় পরিবেশবাদী ও জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, গত এক বছরে যেভাবে কাঠ এবং খনিজ উত্তোলনের জন্য বন কেটে ফেলা হয়েছে, তাতে ভারি বৃষ্টিপাতে মাটি ধরে রাখার শক্তি অনেক কমে গেছে। সিপিরোকের আকাশ থেকে তোলা ছবিতে দেখা যায়—পাহাড়ের গায়ে বড় বড় গাছ নেই, তার বদলে রয়েছে ছড়ানো গাছের গুঁড়ি আর নতুন গড়ে ওঠা প্লান্টেশন। রেঞ্জারদের ভাষায়, আগে ওরাংওটাং এক গাছের ডালে থেকে আরেক ডালে সরে গিয়ে সহজে চলাচল করত; এখন বন ফাঁক হওয়ায় মাটিতে নেমে আসতে বাধ্য হচ্ছে, যেখানে শিকারি, কুকুর বা কৃষকের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি অনেক বেশি।

জলবায়ু সংকট, ভূমি ব্যবহার ও বন্যপ্রাণী রক্ষার লড়াই

ওরাংওটাং তথ্যকেন্দ্রের হিসাবে শুধু টাপানুলি অঞ্চলে প্রায় ৭৬০টি ওরাংওটাং আছে, আর ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়া মিলিয়ে মোট সংখ্যা আনুমানিক ১ লাখ ১৯ হাজার। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এমন তাণ্ডবপূর্ণ ঝড় যদি ঘন ঘন ঘটতে থাকে এবং একই সঙ্গে বন উজাড় চলতে থাকে, তাহলে এই সংখ্যা এক প্রজন্মের মধ্যেই নাটকীয়ভাবে কমে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাত আরও অনিয়মিত ও তীব্র হচ্ছে; বন উজাড় হওয়া জায়গায় সেই বৃষ্টির পানি ধরে রাখার মতো শিকড় ও আন্ডারগ্রোথ না থাকায় পাহাড় ভেঙে পড়ছে গ্রাম ও কৃষিজমির ওপর।

Orangutans at risk as Indonesia floods devastate habitat

ইন্দোনেশিয়া সরকার কাগজে-কলমে প্রাথমিক বন ও পিটল্যান্ড রক্ষায় কঠোর আইন করেছে, কিন্তু বাস্তবে অনেক এলাকায় প্রয়োগ দুর্বল এবং প্রভাবশালী কোম্পানির সঙ্গে লড়াই করার মতো শক্তি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর হাতে নেই। সংরক্ষণবাদীরা তাই দাবি তুলেছেন—ওরাংওটাংয়ের আবাসস্থলকে শুধু ‘বন্যপ্রাণীর আবাস’ হিসেবে না দেখে, বন্যা ও ভূমিধস ঠেকানোর গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এর অংশ হিসেবে কমিউনিটি-ভিত্তিক টহল দলকে অর্থ ও প্রযুক্তি সহায়তা দিয়ে অবৈধ লগিং রিয়েল টাইমে মনিটর করার উদ্যোগ নিতে বলছেন তারা। মাঠের বাস্তবতায় আমরান সিয়াগিয়ানের মতো রেঞ্জাররা এখন ক্ষতিগ্রস্ত বন মানচিত্রে আঁকছেন, খাবারের চিহ্ন খুঁজছেন, আর গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে বাকি ফলের গাছ ও ছায়াদার গাছ রক্ষার উপায় খুঁজছেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইন্দোনেশিয়ার বন্যায় টাপানুলি ওরাংওটাং আরও বিপদে

০৬:০০:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫

বন্যা, ভূমিধস আর নির্বিচার বন উজাড়ের যৌথ আঘাত

মারণঘাতী বন্যা ও ভূমিধসের কয়েক সপ্তাহ পরও ইন্দোনেশিয়ার উত্তর সুমাত্রার বন যেন অস্বাভাবিক নীরব। সাইক্লোনঘূর্ণি ঝড়ের আগে সিপিরোক এলাকার পাহাড়ি বনজুড়ে টাপানুলি ওরাংওটাংকে প্রায়ই ফলখেতে দেখা যেত—দুরিয়ান থেকে শুরু করে স্থানীয় কৃষকদের বাগানের নানা ফল তাদের পছন্দের তালিকায় ছিল। এখন রেঞ্জার আমরান সিয়াগিয়ান সেই একই পাহাড়ি পথে হাঁটেন, কিন্তু গাছের মাথায় ঝুলন্ত দেহের বদলে দেখতে পান উল্টো দিকে কাটা গাছের গুঁড়ি আর ন্যাড়া ঢাল। ঝড় ও বন্যায় ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় শত শত মানুষের মৃত্যু হলেও, বিরল এই বৃহৎ বানর প্রজাতির জন্য আসল বিপদ লুকিয়ে আছে তাদের বাসস্থান ধ্বংসের মধ্যে।

Orangutans at risk as Indonesia floods devastate habitat | Reuters

স্থানীয় পরিবেশবাদী ও জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, গত এক বছরে যেভাবে কাঠ এবং খনিজ উত্তোলনের জন্য বন কেটে ফেলা হয়েছে, তাতে ভারি বৃষ্টিপাতে মাটি ধরে রাখার শক্তি অনেক কমে গেছে। সিপিরোকের আকাশ থেকে তোলা ছবিতে দেখা যায়—পাহাড়ের গায়ে বড় বড় গাছ নেই, তার বদলে রয়েছে ছড়ানো গাছের গুঁড়ি আর নতুন গড়ে ওঠা প্লান্টেশন। রেঞ্জারদের ভাষায়, আগে ওরাংওটাং এক গাছের ডালে থেকে আরেক ডালে সরে গিয়ে সহজে চলাচল করত; এখন বন ফাঁক হওয়ায় মাটিতে নেমে আসতে বাধ্য হচ্ছে, যেখানে শিকারি, কুকুর বা কৃষকের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি অনেক বেশি।

জলবায়ু সংকট, ভূমি ব্যবহার ও বন্যপ্রাণী রক্ষার লড়াই

ওরাংওটাং তথ্যকেন্দ্রের হিসাবে শুধু টাপানুলি অঞ্চলে প্রায় ৭৬০টি ওরাংওটাং আছে, আর ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়া মিলিয়ে মোট সংখ্যা আনুমানিক ১ লাখ ১৯ হাজার। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এমন তাণ্ডবপূর্ণ ঝড় যদি ঘন ঘন ঘটতে থাকে এবং একই সঙ্গে বন উজাড় চলতে থাকে, তাহলে এই সংখ্যা এক প্রজন্মের মধ্যেই নাটকীয়ভাবে কমে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাত আরও অনিয়মিত ও তীব্র হচ্ছে; বন উজাড় হওয়া জায়গায় সেই বৃষ্টির পানি ধরে রাখার মতো শিকড় ও আন্ডারগ্রোথ না থাকায় পাহাড় ভেঙে পড়ছে গ্রাম ও কৃষিজমির ওপর।

Orangutans at risk as Indonesia floods devastate habitat

ইন্দোনেশিয়া সরকার কাগজে-কলমে প্রাথমিক বন ও পিটল্যান্ড রক্ষায় কঠোর আইন করেছে, কিন্তু বাস্তবে অনেক এলাকায় প্রয়োগ দুর্বল এবং প্রভাবশালী কোম্পানির সঙ্গে লড়াই করার মতো শক্তি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর হাতে নেই। সংরক্ষণবাদীরা তাই দাবি তুলেছেন—ওরাংওটাংয়ের আবাসস্থলকে শুধু ‘বন্যপ্রাণীর আবাস’ হিসেবে না দেখে, বন্যা ও ভূমিধস ঠেকানোর গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এর অংশ হিসেবে কমিউনিটি-ভিত্তিক টহল দলকে অর্থ ও প্রযুক্তি সহায়তা দিয়ে অবৈধ লগিং রিয়েল টাইমে মনিটর করার উদ্যোগ নিতে বলছেন তারা। মাঠের বাস্তবতায় আমরান সিয়াগিয়ানের মতো রেঞ্জাররা এখন ক্ষতিগ্রস্ত বন মানচিত্রে আঁকছেন, খাবারের চিহ্ন খুঁজছেন, আর গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে বাকি ফলের গাছ ও ছায়াদার গাছ রক্ষার উপায় খুঁজছেন।